kalerkantho

সাদাকালো

সামাজিক অপরাধ, নৃশংসতা বেড়েই চলেছে

আহমদ রফিক

১১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সামাজিক অপরাধ, নৃশংসতা বেড়েই চলেছে

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সুনাম নানা মাত্রায়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি ইত্যাদি ইতিবাচক ঘটনার পাশাপাশি সামাজিক অপরাধ, অনৈতিকতা, সন্ত্রাস ও অবক্ষয়ের মতো নেতিবাচক দিকগুলোও যথেষ্ট ব্যাপক—নষ্ট করে দিচ্ছে ইতিবাচক অর্জন। শিক্ষায়তন থেকে পেশাগত কর্মস্থল পর্যন্ত সর্বত্র এই ব্যাধির বিস্তার।

এমনকি ছাত্ররাজনীতির বৃহৎ অংশও দূষণে আক্রান্ত—আদর্শ সততার মতো সব কিছু বিকিয়ে দিয়ে। অথচ এই ছাত্ররাজনীতিই দল-নির্বিশেষে একসময় গৌরবময় ভূমিকা পালন করেছিল, তাদের অর্জনও ছিল মহিমামণ্ডিত। পঞ্চাশ থেকে ষাটের দশকের ছাত্র রাজনৈতিক ঘটনাবলি ইতিহাস তৈরি করে তার প্রমাণ রেখেছে। ক্বচিৎ ব্যতিক্রমের মধ্যেই।

বছর পার করে, দশক পার করে বিপুল আত্মত্যাগে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান সামাজিক-রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও অবক্ষয়ধর্মী পরিণাম ঘটেই চলেছে। দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ তুলনামূলক বিচারে গৌণ। হয়তো তাই অশুভ পরিণাম ক্রমবর্ধমান। কখনো ঘটনা বর্বরতা ও নৃশংসতায় চিহ্নিত। তখন ঘটনা বিশেষে সর্বোচ্চ প্রশাসন থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তার প্রভাব পড়ে না ঘটনার সামগ্রিকতার ওপর।

আগেই বলেছি, সমাজ থেকে শিক্ষায়তন পর্যন্ত সর্বত্র কথিত অপরাধচিত্রের বিস্তার। আমাদের ত্রিমুখী শিক্ষাব্যবস্থায় সবচেয়ে রক্ষণশীল অংশ হিসেবে পরিচিত ধর্মীয় শিক্ষায়তন নানামুখী মাদরাসাগুলো। নীতি ও নৈতিকতার নামে এখানে বোরকায় দেহ আচ্ছাদিত করাসহ বহুবিধ নিয়ম এ ক্ষেত্রে প্রচলিত। কিন্তু ওই যে বলে সরষের মধ্যে ভূত। নীতি, আদর্শ, সততার মতো গুণাবলির সঠিক চর্চা চলিত না হলে বাইরের আবরণে বা অনুরূপ নিয়মে মনের কলুষ দূর হয় না—শিক্ষক বা শিক্ষার্থী সবার ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন নয়।

দুই.

সংবাদপত্রে প্রকাশিত ও আলোচিত একটি ঘটনার আলোচনা উপলক্ষে উল্লিখিত ভূমিকা। শুধু মাদরাসা শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীই নয়, সর্বাধুনিক উচ্চ মাধ্যমের শিক্ষায়তনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেও অনৈতিক ঘটনা বা অপরাধের উদাহরণ ও দৃষ্টান্ত নেহাত কম নয়, যা বিভিন্ন সময়ে দৈনিক পত্রিকার কলামে প্রকাশিত হয়েছে।

আলোচ্য ঘটনা ফেনীর সোনাগাজীতে মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির শরীরে আগুন লাগানো নিয়ে। একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত শিরোনাম : ‘রাফির শরীরে আগুন পূর্বপরিকল্পনায়’। আনুষঙ্গিক শিরোনাম ‘গুণধর অধ্যক্ষ’, ‘বোরকাপরা চারজনকে চিহ্নিত করা যায়নি।’ ঘটনার বর্বরতার কারণে অগ্নিদগ্ধ রাফির সার্বিক দায়িত্ব নিলেন প্রধানমন্ত্রী।’ সেই সঙ্গে ‘জড়িতদের ধরার নির্দেশ’।

সন্দেহ নেই এ জন্য প্রধানমন্ত্রী ধন্যবাদার্হ। কিন্তু মূল কথা হলো বিষয়টি ব্যক্তিক সহানুভূতির নয়। কয়জন রাফিকে প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত উদ্যোগে সহায়তা দেবেন? এটা সার্বিক পর্যায়ের সামাজিক-রাজনৈতিক চরিত্রের বিষয়, যা শাসনব্যবস্থার অন্তর্গত। নষ্টভ্রষ্ট সমাজকে সুস্থ করে তুলে সমাজবদল ঘটানোই প্রধান দায়িত্ব। অন্যভাবে বলতে গেলে সমাজকে নষ্টভ্রষ্ট হতে না দেওয়াই শাসনব্যবস্থার মূল দায়িত্ব। এবং তা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সমাজের সর্বক্ষেত্রে। সেখানে ঘাটতির দায় শাসনযন্ত্রের ওপরই পড়ে।

এর আগে অভিজাত স্কুলের ছাত্রীকে নিয়ে শিক্ষকের অনৈতিক ন্যক্কারজনক ঘটনা সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে ব্যাপকভাবে। দীর্ঘ সময় পরে হলেও অপরাধী শিক্ষকের শাস্তি হয়েছে, তার গতি হয়েছে জেলখানায়। কিন্তু যৌন অনাচারে পীড়িত ছাত্রীটির ভবিষ্যৎ কি তাতে রক্ষা পাবে? তরুণীটি কি পাবে মানসিক পীড়ন থেকে মুক্তি?

এর পরও ঘটেছে অনুরূপ একাধিক ঘটনা। ধনী-অতিধনী পরিবারের বখাটে সন্তানের দুর্মূল্য বিলাসবহুল বিএমডাব্লিউ গাড়িতে বান্ধবীদের নিয়ে অভিসার—এবং যথারীতি যৌন নির্যাতনের ঘটনা, যা বেশ কিছুদিন ধরে দৈনিকের পাতায় ফলাও করে ছাপা হয়েছে। আমরা জানি না ওই দুর্বৃত্তদের শাস্তি হয়েছে, আদৌ হয়েছে কি না।

ধর্মীয় শিক্ষায়তন মাদরাসাগুলো সম্পর্কে সমাজে ভিন্ন ধরনের চিন্তা-ভাবনা প্রচলিত—আর সেখানকার শিক্ষকদের সম্পর্কে তো বটেই। বিভাগপূর্ব ভারতবর্ষে দেওবন্দ থেকে একাধিক তরিকার মাদরাসা সম্পর্কে মর্যাদাবোধের ধারাবাহিক প্রকাশ বিভাগোত্তর পূর্ববঙ্গ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্ব পর্যন্ত প্রসারিত। এ ধারাবাহিকতায় কালিমালেপনের ঘটনা মাঝেমধ্যে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতে দেখা গেছে।

আলোচ্য ঘটনাটি তুলনামূলক বিচারে বর্বরতা ও নৃশংসতার মিশ্রণ। সোনাগাজী মাদরাসার দুর্বৃত্ত অধ্যক্ষ মাদরাসাছাত্রী রাফির শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেই ক্ষান্ত হননি, তাঁর ধর্মীয় বোধ তাঁকে সর্বোচ্চ পাপ থেকে নিবৃত্ত হওয়ার পথে নিয়ে যেতে পারেনি। লাঞ্ছিতা রাফির পক্ষ থেকে মামলা তুলে না নেওয়ার কারণে পরিকল্পিতভাবে নুসরাত জাহান রাফির গায়ে কেরোসিনজাতীয় দাহ্য পদার্থ ঢেলে তাকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হয়।

এর আগে ওই ‘অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে এক শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।’ এখানেই শেষ নয়, সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে প্রকাশ যে ওই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অশোভন যৌন আচরণের একাধিক ঘটনার উদাহরণ থাকা সত্ত্বেও মাদরাসার গভর্নিং বডি কেন তাঁর বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি সেটাই বড় প্রশ্ন, বিস্ময়কর ঘটনাও বটে।

প্রতিবেদনে আরো প্রকাশ যে মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি রুহুল আমিন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বটে, অর্থাৎ রাজনৈতিক দিক থেকে যথেষ্ট শক্তিমান ব্যক্তিত্ব। এতদসত্ত্বেও ওই দুর্বৃত্ত অধ্যক্ষ দীর্ঘ সময় তাঁর অনৈতিক আচরণ সত্ত্বেও কিভাবে তাঁর পদে বহাল থাকেন এটাই বড় সামাজিক-রাজনৈতিক প্রশ্ন।

তিন.

স্বাধীন বাংলাদেশের সমাজ যে নৈতিকতার দিক থেকে কতটা দূষিত হয়েছে, এজাতীয় ঘটনা তার গভীর প্রমাণ। একই সঙ্গে দেখা যায় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতিরও ব্যাপক বিস্তার। এমন একটি সাধারণ নিয়মের মধ্য দিয়ে চলছে সমাজ ও রাজনীতি। এখানেও তার ব্যতিক্রম নেই। একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয় ভাষ্যেও দেখা যাচ্ছে, এর আগে এই ন্যক্কারজনক ঘটনা নিয়ে মাদরাসাতেই শুধু নয় স্থানীয় সমাজব্যবস্থায় পক্ষ-প্রতিপক্ষের দুই বিভাজিত রূপ তৈরি হয়ে গেছে।

অর্থ ও সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তির স্বার্থ ঘিরে অন্যায়কে ধামাচাপা দেওয়ার বহুলদৃষ্ট চেষ্টা এখানে দেখা যাচ্ছে। আমরা জানি না এ প্রভাব কত দূর পর্যন্ত গড়াবে, তদন্ত সঠিকভাবে সম্পন্ন হবে কি না, চার্জশিট বাস্তব সত্যকে তুলে ধরবে কি না। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে অগ্নিদগ্ধ যন্ত্রণাকাতর রাফির জবানবন্দি আদৌ আমলে আনা হবে কি না, যাতে অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তির বিধান হয়।

অপরাধের দায় শুধু অধ্যক্ষ সিরাজেরই নয়, তার অনুসারীদেরও বটে, যারা পরীক্ষা কেন্দ্রে কেরোসিনজাতীয় দাহ্য পদার্থ নিয়ে এসেছিল, যারা তা আনতে সাহায্য করেছিল, এমনকি যারা রাফির গায়ে দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন লাগাতে সাহায্য করেছিল। তারাও শাস্তিযোগ্য অপরাধের দায় বহন করছে। মাদরাসা কর্তৃপক্ষকেও এ বর্বর ঘটনার জন্য জবাবদিহি করতে হবে।

বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রাফি মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, তার যন্ত্রণার লাঘব তখনই হবে যখন ওই ‘গুণধর’ অধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের যথাযথ শাস্তির রায় বিচারে ঘোষিত হবে। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদনের দুর্বলতা বা আইনি মারপ্যাঁচ বা ফাঁকফোকর দিয়ে ভয়ংকর অপরাধীও পার পেয়ে যায়—‘বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে।’

নুসরাত জাহান রাফির ক্ষেত্রে কি তা-ই ঘটবে? যেমনটি ঘটেছে কুমিল্লার মেধাবী ছাত্রী ধর্ষিত তনুর ক্ষেত্রে? আমাদের সমাজের দুষ্টক্ষতগুলো এ জন্য দায়ী, দায়ী রাজনৈতিক দুর্বলতা ও স্বার্থপরতাও। সে জন্যই আমরা বারবার সমাজ বদলের কথা বলি, বিষয়টির ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করি।

সবশেষ কথা, প্রধানমন্ত্রী যখন রাফির সার্বিক চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন, তখন তার ওপর সংঘটিত অপরাধের বিচার ও অপরাধীদের শাস্তির পক্ষে যুক্তিসংগত ভূমিকা নিতে হবে প্রধানমন্ত্রীকেই। তা না হলে পক্ষ-প্রতিপক্ষের টানাপড়েনে সব কিছু অবাঞ্ছিত পথ ধরতে পারে। এ বাস্তবতা তার অনুধাবনের বাইরে নয়। একজন রাফি নয়, সব রাফির দায়ই কিন্তু শাসনযন্ত্রের। বিষয়টি সমষ্টিগত, যতটা ব্যক্তিগত তার চেয়ে অনেক বেশি সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতের।

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

মন্তব্য