kalerkantho

ভিন্নমত

সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর আরো অনেক উপায় আছে

আবু আহমেদ

২০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর আরো অনেক উপায় আছে

শুধুই ট্যাক্সনির্ভর রাজস্ব আয় অন্য অনেক দেশের জন্য এখন অনেক পুরনো বিষয় হয়ে গেছে। অর্থনীতির বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের রাজস্ব আহরণের ধরন ও উৎস বদলে গেছে। পরিবর্তিত অন্যতম বড় দুটি উৎসব হলো—ফি এবং মুনাফা বা ডিভিডেন্ট আয় থেকে রাজস্ব আয়। ট্যাক্সকে ভাগ করা হয় দুই ভাগে। এক. যিনি ট্যাক্স দেন তিনিই ভার (burden) বহন করেন। যেমন—আয়কর, অন্যটা হলো ট্যাক্স দিচ্ছেন একজন, সেই ট্যাক্স সরকারকে দিচ্ছে আরেকজন, যেমন ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স ভ্যাট বা মূসক। এ ক্ষেত্রে ট্যাক্সের ভার বহন করছে যে সেবা বা পণ্য ক্রয় করল সে; কিন্তু সেই ট্যাক্সটা ক্রেতার থেকে সংগ্রহ করে প্রদান করছে ব্যবসায়ী বা দোকানি, যিনি সরকারি হিসাবে ভ্যাট-নামীয় ট্যাক্সটা জমা করছেন তিনি কিন্তু ট্যাক্সের কোনো ভার বহন করছেন না। এই দুই প্রকারের ট্যাক্সকে বলা হয় প্রত্যক্ষ কর (direct tax) এবং পরোক্ষ কর  (Indirect tax)| অন্য আরেকটা ট্যাক্স আছে, যেটা অতীতে অনেক দাপটের ছিল। সেটা হলো কাস্টম ডিউটি বা আমদানি শুল্ক। একসময় বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিগুলোর সরকারের জন্য ওই ট্যাক্স অতি মূল্যবান ছিল। কারণ সরকারের রাজস্ব আয়ের বেশির ভাগই সেই আমদানি শুল্ক থেকে আসত। অর্থনীতি যতই উদারীকরণ হয়ে গ্লোবাল অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে, ততই কাস্টম বা আমদানি শুল্ক কমে গেছে। অন্য দেশগুলোও এই ট্যাক্স কমাতে বাধ্য হয়েছে। আমদানি শুল্ক বেশি রাখলে ক্ষতি আছে বলে বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদ মনে করেন। তা ছাড়া বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিগুলো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) শর্ত পালন করতে গিয়েই এই শুল্ককে কমাতে বাধ্য হয়েছে।

সরকারের জন্য রাজস্ব আয়ের অন্য উৎস হলো করের ওপর কর, নানাবিধ অতিরিক্ত বা সম্পূরক শুল্ক বা ট্যাক্স ইত্যাদি। সারচার্জ নামের অতিরিক্ত ট্যাক্সও সরকার আরোপ করতে পারে। কিছু শিল্প-ব্যবসাকে নিরুৎসাহ করতে সাধারণত সারচার্জ আরোপ করা হয়। ভ্যাট বা মূসকের ক্ষেত্রে কিছু পণ্য এবং সেবা ছাড় পাচ্ছে। অন্যগুলোকে বিভিন্ন হারে ভ্যাট দিতে হয়। তবে অনেক রেট থাকলে অসুবিধাও হয়। তাই ভ্যাট রেটকে ১০ শতাংশের মতো একটা ফ্ল্যাট রেটে আনা যায় কি না চিন্তা করা যেতে পারে। হোটেল-রেস্টুরেন্টের নানরুটির ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আছে। আবার বোতলজাত পানির ওপর কোনো ভ্যাট নেই। আমি এক রেস্টুরেন্ট থেকে নাশতার বিলটা নিয়ে তা-ই দেখলাম। আমার মনে প্রশ্ন জাগল, রুটির ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট থাকতে পারলে বোতলের পানির ওপর কেন থাকবে না? কোনো যুক্তি হয়তো উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে থাকতে পারে। এখন ভ্যাট কালেকশনের জন্য ইলেকট্রনিক্যাল রেজিস্ট্রারার (ইসিআর) নামের একটা মেশিন আছে, যে মেশিন পেমেন্টগুলো রেকর্ড করে। তবে দোকানদার থেকে শুনলাম, কালেকটেড অর্থটা তাদেরই রাজস্ব বোর্ডের ব্যাংক হিসাবে জমা করতে হয়। এখানে সততার প্রশ্ন আছে। সব দোকানি সত্ভাবে ইসিআরে রেকর্ডকৃত অর্থ জমা করছে কি না কে জানে? অন্য প্রশ্ন হলো এমন অনেক মধ্যমমান থেকে অপেক্ষাকৃত দামি হোটেল-রেস্তোরাঁ আছে, সেগুলোতে ইসিআর নামের কোনো মেশিনই নেই। আর এই মেশিন থাকলেই কি, অনেক দোকান মালিক তাঁদের বিক্রয়কে রেকর্ডে আনতে চান না। তাঁরা মুখে মুখে দরদাম করে বিক্রি করছেন। বড়জোর হাতে লিখে একটা রসিদ দিচ্ছেন। এঁদের থেকে ভ্যাট পাওয়ার উপায় কী? উপায় হয়তো একটা আছে। সেটা হলো গ্রাহকদের ভ্যাট দেওয়ার ক্ষেত্রে ইচ্ছা এবং দোকানদারদের থেকে ইসিআরে লিখিত রসিদ নেওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো বেশির ভাগ গ্রাহক বেশি মূল্য দিতে হবে সে জন্য এ কাজটা করে না।

অন্য উপায় হলো রাজস্ব বোর্ডের পরিদর্শকদের  মাধ্যমে ইসিআরের ব্যবহারকে নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রেও যেটা প্রয়োজন হবে সেটা হলো পরিদর্শকদের সততা, যেটার নাকি অনেক ঘাটতি আছে বলে দোকানিরাই বলে। ভ্যাট নামের রাজস্ব আয় সরকার পাবে যখন লেনদেন রেকর্ডেই হবে। যারা কোনো রকমের রসিদ ছাড়া মালপত্র বিক্রি করছে তাদের ভ্যাটের আওতায় আনার উপায় কী? এ ধরনের লেনদেন যত বেশি বন্ধ করা যাবে, তত বেশি রাজস্ব আয় সরকার পাবে। অন্য অনেক দেশ ক্যাশ বা নগদে লেনদেন করাকে অনেক কমিয়ে এনেছে। বাংলাদেশ কি সেই পথে হাঁটবে। ভ্যাট বা মূসক যদি ঠিকমতো আদায় করা যায়, তাহলে সরকারের রাজস্ব আয় অনেক বেড়ে যাবে। সবার ক্ষেত্রে একই ট্যাক্স হওয়া উচিত নয়। যাঁরা ফার্স্ট ক্লাসে ভ্রমণ করেন তাঁদের বেশি ট্যাক্স দিতে বলুন। অন্য বিষয়টা হলো, যেসব প্রতিষ্ঠান ভ্যাট কালেক্ট করে সরকারের হিসাবে জমা করে না সেই কাজকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হোক। স্বর্ণের অলংকারের একটা বড় বাজার আছে। এ ক্ষেত্রে স্বর্ণকার এবং দোকানিরা ঠিকমতো ভ্যাট দিচ্ছেন তো? আমার তো মনে হয় বেশির ভাগ স্বর্ণ দোকানদার এই ট্যাক্স দেওয়ার ধারেকাছেও যান না। রাজস্ব বোর্ডের  উচিত হবে কোন খাত থেকে কত ভ্যাট পাচ্ছে তার একটি তালিকা প্রকাশ করা। যেসব রেস্তোরাঁ-হোটেল ইসিআর মেশিন ব্যবহার করে না তাদেরকেও দণ্ডের আওতায় আনা উচিত।

একদল প্রশিক্ষিত এবং সৎ ট্যাক্স কর্মকর্তা উদ্যোগ নিলে সরকারের রাজস্ব আয় অনেক বাড়াতে পারেন। যেসব ব্যাংক সরকারের হয়ে ফি এবং ট্যাক্স কালেক্ট করছে তারা ঠিক সময়ে রাজস্ব বোর্ডের ব্যাংক হিসাবে ওই সব আয় জমা করে কি? না করলে ওই সব ব্যাংকের নামও প্রকাশ করা যেতে পারে। বড় বড় কনভেনশন হল আছে, সেগুলোতে ৫০০ থেকে এক হাজার মেহমানকে অতি উত্তমরূপে আপ্যায়ন করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে  মেহমানপ্রতি ভ্যাট দেওয়া হচ্ছে কি? মেহমানপ্রতি এক হাজার টাকা ব্যয় হলে এক হাজার মেহমানের জন্য ব্যয় হবে ১০ লাখ টাকা। আর ১৫ শতাংশ হিসাবে ভ্যাট দিতে হলে যিনি আপ্যায়ন করছেন তাঁকে দিতে হবে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা। রাজস্ব বোর্ড এসব অনুষ্ঠান থেকে এই রাজস্ব পাচ্ছে কি? অনেকে এক থেকে দুই কোটি টাকার মূল্যের গাড়ি ব্যবহার করেন। এসব গাড়ির যাঁরা মালিক তাঁদের ট্যাক্স ফাইলের অবস্থা কী? আর তাঁরা যদি বলেন, গাড়ি তো তাঁদের নয়, তাঁদের  মালিকানাকৃত প্রতিষ্ঠানের। তাহলে  দেখতে হবে ওই সব প্রতিষ্ঠান কী পরিমাণ ট্যাক্স দিচ্ছে। কোনো লোকসানি প্রতিষ্ঠানকে তো এক-দুই কোটি টাকা মূল্যমানের গাড়িই কিনতে দেওয়া উচিত নয়। কোনো বিশেষ ব্যবস্থায়ও শুল্কবিহীন গাড়ি কিনতে কাউকেই অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। সরকারের উচ্চপর্যায়ে যাঁরা আছেন, তাঁরা আশা করি বিশেষ সুবিধা নেওয়ার আবর্ত থেকে বের হয়ে আসবেন। ওপরের নীতিনির্ধারকরা যদি নিজেদের আয়-ব্যয়গুলো পরিষ্কার রাখেন, তাহলে সমাজে যারা বিভিন্নভাবে ফাঁকি দিচ্ছে তাদের ধরতে সুবিধা হবে।

অন্য বিষয়টি হলো—সরকার শুধু বেশি বেশি রাজস্ব আয় করল, তাতেও সমাজ আনুপাতিক হারে উপকার পাবে না যদি সরকারি ব্যয়গুলো জবাবদিহির মধ্যে না আসে। আপনি শত শত কোটি টাকা রাজস্ব আয় করলেন, কিন্তু সেই আয় যেখানে খরচ করলেন, সেখান থেকে যদি কোনো ফল না পান, তাহলে ওই রাজস্ব আয় বাড়ানো বরং অর্থনীতির জন্য ক্ষতিই বেশি। আপনি ট্যাক্সের অর্থ কোথায় ব্যয় করছেন? স্কুলের শিক্ষকদের বেতন দেওয়ার জন্য, সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার সাহেবদের বেতন দেওয়ার জন্য। কিন্তু যাঁকে বেতন দিচ্ছেন, তিনি যদি ক্লাসরুমে পাঠদান না করে শুধু প্রাইভেট পড়ানোয় ব্যস্ত থাকেন, তাহলে জনগণের ট্যাক্সের অর্থ সমাজের জন্য কী উপকার বয়ে আনল। আর যে ডাক্তার সাহেবকে আরো বর্ধিত বেতন-ভাতা দিচ্ছেন, তিনি যদি কর্মস্থলেই না যান, তাহলে সেই ব্যয় থেকে সমাজ কি কোনো উপকার পাবে? বাস্তবতা সে রকমই। রাষ্ট্রের ব্যয় করা শত শত কোটি টাকার বেশির ভাগই আমরা পানিতে ফেলছি। একটা অদক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে আপনি জনগণ থেকে ট্যাক্স নিয়ে যত আয়ই  দেন না কেন, ওই অদক্ষ ব্যবস্থাপনার ধরন হবে সে আরো অর্থ চায়। বরং সত্য হলো, অতিসহজে সরকার থেকে অর্থ পেলে সেই অদক্ষ ব্যবস্থাপনা আরো অদক্ষ হবে। আমাদের চোখের সামনে তো এর অনেক উদাহরণ আছে। প্রতিবছর বাজেট বরাদ্দ থেকে তো সরকারি ব্যাংকগুলোকে ক্যাপিটাল পুনর্ভরণ বাবদ কয়েক হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়। ওই অর্থ প্রদানের মাধ্যমে তাদের (ব্যাংকগুলোর) চাহিদাকে কি শেষ করা গেছে? না, সহজে অর্থ পেয়ে তারা আরো অদক্ষ হয়েছে। আমরা যদি কিছুই জানতে-শিখতে না চাই, তাহলে কেউই আমাদের  শেখাতে পারবে না। কেউই আমাদের জানাতে পারবে না।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য