kalerkantho

এইখানে এক নদী ছিল...

ড. শফিক আশরাফ

১৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এইখানে এক নদী ছিল...

হাইকোর্ট নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি শিক্ষার্থীদের বাংলা ভাষার ইতিহাস নামে একটি কোর্স পড়াই। সেটা পড়াতে গিয়ে তাদের বলি মানুষের ভাষা জীবন্ত এবং নদীর মতো প্রবহমান। একে রোধ করা হলে নতুন বাঁক খুঁজে নেবে নতুবা মৃত্যু ঘটবে। আমাদের সংস্কৃত ভাষা আজ মৃত—কারণ এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে! গোথিক, লাতিন, হিট্রাইটসহ পৃথিবীর অনেক ভাষার মৃত্যুর খবর জানা যায়। নদী জীবন্ত সত্তা, কারণ একে হত্যা করা যায়, অসুস্থ করা যায়! আবার বাঁচিয়ে রাখা যায়। আমি নদী তীরবর্তী অঞ্চলে বেড়ে উঠেছি। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে লাঙ্গুলিয়া নামের একটি নদী। এটা যমুনার শাখা নদী ছিল। ছোটবেলায় দেখেছি বড় বড় নৌকা সুদূর খুলনা, বরিশাল থেকে নারকেল নিয়ে আসছে। বর্ষাকালের ঢেউ এবং স্রোতের শব্দ এখনো কানে বাজে। লাঙ্গুলিয়া এখন মৃত নদী। বাংলাদেশকে আমরা নদীমাতৃক দেশ বলি। এই নিকট-অতীতেও আমাদের বেশির ভাগ মানুষ নদীনির্ভর ছিল। বাংলাদেশের প্রায় সব বড় শহরই কোনো না কোনো নদীর ধারে গড়ে উঠেছে। পণ্য এবং পরিবহন সুবিধাই ছিল তার প্রধান কারণ। দীর্ঘ সময় এ দেশে এই নদীর পানিতেই স্নান, কাপড় কাচা আবার এই নদীর পানিই পান করা হতো। নদী নিয়ে আমাদের আবেগ-ভালোবাসা অনেক বেশি। আমাদের লোকগাথা কাহিনিগুলো প্রায়শ নদীময়। এ দেশের শিশুরা বেড়ে ওঠে সপ্তডিঙা মধুকরের গল্প কিংবা সওদাগরি নৌকা বা সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে দৈত্য রাজপুরের কাহিনি শুনে। নদী নিয়ে শুধু গান, কবিতা, গল্পই নয়, বাংলা সাহিত্যের অনেক বিখ্যাত উপন্যাসই নদী নিয়ে লেখা। অদৈত মল্ল বর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’; বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ইছামতী’; তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কালিনী’; মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ছাড়াও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ নামে বিখ্যাত উপন্যাস লিখেছেন। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মতো দূরদর্শী লেখক অনেক আগেই আমাদের নদীগুলোর মৃত্যু টের পেয়েছিলেন। উপন্যাসে আম্বিয়া প্রথমে কান্না শোনে, এরপর ধীরে ধীরে সবাই সেই কান্নার শব্দ শুনতে পায়। অনেক পরে বুঝতে পারে নদী কাঁদছে। এখন শুধু সারা দেশের মানুষ নয়, বাংলাদেশের হাইকোর্ট পর্যন্ত নদীর কান্না শুনতে পেয়েছে।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো প্রকৃতির ভারসাম্য ঠিক রেখে নগরায়ণ ঘটিয়েছে। নদীগুলোকে তারা শুধু শোভাবর্ধনই নয়, আরো বেশি চলাচল উপযোগী করেছে। আর আমরা কী করছি! কিছুদিন আগে ভুটানে গিয়ে দেখে এলাম পাহাড়ি খরস্রোতা নদী। ঝকঝকে-তকতকে-স্বচ্ছ পানির প্রবাহই নয়, নদী থেকে কোনো প্রকার মাছ ধরাও নিষেধ। ঢাকা শহরের প্রতিটি স্যুয়ারেজ লাইন, কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যের লাইন শেষ হয়েছে নদী গিয়ে। রংপুর শহরের মধ্যে বয়ে গেছে শ্যামা সুন্দরী নদী। এখন সেটা রংপুরের পয়োনিষ্কাশন ড্রেন। বিষাক্ত মিশমিশে কালো পানি আমাদের এই নদীগুলোয় মাছ কেন, কোনো প্রকার জলজ প্রাণী বাসের উপযোগী নয়! যে জেলে একসময় নদীতে মাছ ধরত, সে হয়তো এখন রিকশা চালায় কিংবা বাসের হেলপারি করে! অবসরে সন্তানদের কাছে নদী এবং মাছের গল্প করে! আর তার সন্তান অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে সেই গল্প শোনে। নদীকে পুনরুজ্জীবনের কথা শোনা যাচ্ছে। সরকার নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা চালুর বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে। যদি তা-ই করা যায় এটা হবে বাংলাদেশের যোগাযোগ ইতিহাস বদলে দেওয়ার মতো একটা কাজ।

একসময় রংপুর থেকে ঢাকা এমনকি কলকাতা পর্যন্ত চমৎকার নৌযোগাযোগব্যবস্থা ছিল। মালামাল এবং যাত্রী পরিবহনে জাহাজও চলত। এখন নৌযোগাযোগব্যবস্থা নেই, আছে সড়ক ও রেলপথ। আর সেই রেলে রংপুর থেকে ঢাকা যেতে সময় লাগে ১৭-১৮ ঘণ্টা, সড়কপথেও কাছাকাছি সময়, বাড়তি পাওনা মৃত্যুর মিছিল! রংপুর অঞ্চলে নদী নিয়ে কাজ করছেন তুহিন ওয়াদুদ। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাগজপত্রে, মানচিত্রে এমন অনেক নদীর কথা জানা যায়, বাস্তবিক সে নদী এখন দখলদারদের কবলে পড়ে চাষের জমি কিংবা আবাসভূমিতে পরিণত হয়েছে! কোনো চিহ্ন পর্যন্ত নেই। এই নদী দখল একটা জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সরকারকে মাঝেমধ্যে ঢাকঢোল পিটিয়ে নদী দখলমুক্ত করার কথা শোনা যায় এবং কোথাও কোথাও টেলিভিশন ক্যামেরা ও মিডিয়াকর্মীদের সরব উপস্থিতিতে দু-একটা স্থাপনা ভাঙা হয়, এরপর আর কেউ কিছু জানে না। এর কারণ কি, এই দখলের সঙ্গে সরকারদলীয় লোক কিংবা প্রশাসনের কোনো অংশ জড়িত! সরকারদলীয় লোক কিংবা প্রশাসন নদী দখলকারী যে-ই হোক না কেন, তাঁর ক্ষমা পাওয়ার কোনো কারণ নেই। চাইলেই নদীকে প্রাণ দান করা সম্ভব, চাইলেই নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থার পুনর্জাগরণ করা সম্ভব। আর সেটা হলে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা দেশের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। নদীতে পণ্যের পরিবহন ব্যয় যেমন কম হবে, তেমনি দূষণ ও দুর্ঘটনা কমবে।

আমরা নদীকে মাতা বলি। অথচ এই নদীমাতার সঙ্গে অনাচার ও ব্যভিচার করি, করি ভোগ দখল এমনকি হত্যা করতেও হাত কাঁপে না। আইনস্টাইন বলেছিলেন, মানুষের মূর্খামির মতো অসীম ক্ষতিকর কিছু নেই। আমরা অবলীলায় গাছ কেটে আমাদের অক্সিজেনের জোগান কমিয়ে দিচ্ছি। নদী ভরাট, দখল, দূষণ করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছি! আমরা ভুলে যাচ্ছি নদীগুলোর মৃত্যু হচ্ছে কিন্তু নতুন করে নদীর জন্ম হচ্ছে না, বড় ধরনের প্রাকৃতিক ঘটনা ছাড়া নদীর জন্ম হবে না! একটু আন্তরিক হলেই বিদ্যমান নদীগুলোকে আমরা রক্ষা করতে পারি, এর প্রবহমানতা বৃদ্ধি করে পারি প্রকৃতি ও মানুষের অনুকূলে নিয়ে আসতে। এটাতে সরকার ও ব্যক্তি উভয়কেই উদ্যোগী হতে হবে। আমরা যদি আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর ব্যাপারে সচেতন থাকি, তার সুস্থতার প্রতি লক্ষ রাখি, তাহলেই নদী রক্ষার বড় একটা ধাপ সম্পন্ন হয়। এরপর তার খনন, কারখানা ও ড্রেনেজ বর্জ্যকে বিকল্প স্থানে ডাম্পিং সরকারের কাজ। এটা করতে পারলেই আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে শুনতে হবে না—এখানে একদা একটা নদী ছিল।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

shafiqibs@yahoo.com

 

মন্তব্য