kalerkantho


দেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অগ্নিনিরাপত্তা

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান, পিএসসি (অব.)

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



দেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অগ্নিনিরাপত্তা

আগুন মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ; তেমনি এর ফলে সৃষ্ট দুর্ঘটনাও মানুষের কাছে অতি পরিচিত। এ কারণে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি সর্বসাধারণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পারিবারিক, সামাজিক আর রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বত্র অগ্নিনিরাপত্তা এখন আলোচিত বিষয়। জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অগ্নিনিরাপত্তার কোনো বিকল্প নেই।

বিশ্বের উন্নত কোনো দেশের পক্ষেও এটি বলা সম্ভব নয় যে অগ্নিদুর্ঘটনা আর ঘটবে না। তবে দুর্ঘটনার সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সীমিত রাখার মাধ্যমে সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। সময়ের এই দাবিকে অগ্রাধিকারে রেখে উন্নয়নের পাশাপাশি সেবা-সামর্থ্য বৃদ্ধি করার মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর জাতির সামনে একটি সুরক্ষিত বাংলাদেশ উপহার দিতে বদ্ধপরিকর। 

অগ্নিনিরাপত্তার কিছু অন্তরায় রয়েছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ না করলে বড় ধরনের অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটার বা দুর্ঘটনাকে ভয়াবহ পর্যায়ে অবনতি ঘটানোর আশঙ্কা টিকে থাকে। অন্তরায়গুলো হলো—জনসংখ্যার ঘনত্ব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অনুমোদনবিহীন ও নিয়মবহির্ভূত স্থাপনা, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, অপরিকল্পিত ওয়্যারহাউস ও ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান, বিদ্যমান ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, পানির উেসর অভাব, যানজট, অপ্রশস্ত রাস্তা, সচেতনতার অভাব, জলবায়ুর পরিবর্তন-ঝুঁকি, অপরিকল্পিত কেমিক্যাল গুদাম, আবাসিক এলাকার বাণিজ্যিক ব্যবহার, দুর্ঘটনাস্থলে মাত্রাতিরিক্ত জনসমাগম, সজ্জিতকরণে উচ্চ দাহ্য পদার্থের ব্যবহার ইত্যাদি। এসব অন্তরায় দূর করার ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের বাইরেও বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠীর দায়িত্ব পালন জরুরি। সবার সম্মিলিত প্রয়াস এ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করতে পারে। 

এ ছাড়া বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) এবং অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইনসহ সংশ্লিষ্ট অপরাপর আইন-কানুন না মানা; ঝুঁকিপূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ ও দীর্ঘদিনের পুরনো বৈদ্যুতিক তার ও সরঞ্জাম ব্যবহার; অতিদাহ্য তরল জ্বালানির অনিরাপদ ব্যবহার; নিরাপত্তাহীন বা অপর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থায় দাহ্যবস্তু মজুদ বা সংরক্ষণ; এলপিজি, সিএনজি ও এলএনজির অনিরাপদ ও নিম্নমানের সিলিন্ডার ব্যবহার; প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া স্টিল ফ্যাব্রিকেটেড ভবন ব্যবহার; অপরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি পানির উেসর ঘাটতি; বাণিজ্যিক ভবনের ডেকোরেশনের কাজে উচ্চ দাহ্য পদার্থের বহুল ব্যবহার; একই ভবনকে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার; জরুরি বহির্গমন রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে সঠিক মান বজায় না রাখা; অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি, অ্যাম্বুল্যান্স ও অন্যান্য জরুরি সেবাপ্রতিষ্ঠানের চলাচলের জন্য রাস্তায় নির্ধারিত জায়গা না থাকা; সঠিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই বহুতল ভবন নির্মাণ; রেসপন্স টাইম কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে যানজটের প্রতিবন্ধকতা; প্রিমিসেস এবং বহুতল ও বাণিজ্যিক ভবন এলাকায় অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি প্রবেশের ক্ষেত্রে অপ্রশস্ত তোরণ; ইউটিলিটি সার্ভিস যেমন—গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য পাওয়ার লাইনের নিম্নমানের রক্ষণাবেক্ষণ; পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করে মার্কেট, শপিং মল ও হাসপাতাল স্থাপন; অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জামের মান নির্ণয় ও ল্যাবরেটরির অভাব; বিপুল এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত আবাসিক এলাকার মতো মেগা প্রকল্পগুলোতে ফায়ার স্টেশনের ব্যবস্থা না করা; শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকায় অকুপেশনাল হেলথ অ্যান্ড সেফটি অনুশীলনের অভাব; ভবনের অননুমোদিত নকশার পরিবর্তন ও অননুমোদিত ব্যবহার ইত্যাদি।

দুর্ঘটনা ও দুর্যোগ-ঝুঁকি মোকাবেলার বিষয়টি মাথায় রেখে বিদ্যমান জনবল থেকে সারা দেশে ৯টি বিশেষায়িত সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ টিম গঠন করা হয়েছে। বিশেষ ধরনের অপারেশনাল কাজ পরিচালনা করার জন্য এসব টিমের সদস্যরা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। সব দুর্ঘটনায় কমিউনিটির অধিবাসীরাই প্রকৃতপক্ষে প্রথম সাড়া দিয়ে থাকে। এ কারণে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস সারা দেশে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে ৪২ হাজার ভলান্টিয়ার প্রস্তুত করেছে, যারা যেকোনো বড় ও ব্যাপক-বিস্তৃত দুর্যোগে ফায়ার সার্ভিসের হেল্পিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে। ইতিমধ্যে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন, এনজিওসমূহ, মিডিয়ায় কর্মরত সংবাদকর্মী, পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল প্রভৃতি), হাসপাতালসমূহ, বস্তির অধিবাসী ও কমিউনিটির লোকদের একটি বিপুল অংশকে এই প্রশিক্ষণ সুবিধায় নিয়ে আসা হয়েছে। ২০১৭ সালে সারা দেশে এই কর্মসূচির আওতায় দুই লাখ ৫২ হাজার ৫৫৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। চার হাজার ১৫২টি ভবন সার্ভেসহ ৯ হাজার ৪৬৬টি মহড়া/ড্রিল সম্পন্ন করা হয়েছে।

পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরাপত্তা বৃদ্ধি ও দুর্যোগ-ঝুঁকি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বিশেষ প্যাকেজ প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দুই দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ, অগ্নিনির্বাপণ ও বহির্গমন মহড়া অনুশীলন, শিল্প-কারখানা পরিদর্শন ও পরামর্শ প্রদান ইত্যাদি। ২০১৭ সালে পোশাক শিল্প খাতের এক লাখ ১২০ জনকে দুই দিনের প্যাকেজ প্রশিক্ষণের আওতায় অগ্নিনিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকাজের জন্য অত্যাধুনিক গাড়ি-পাম্প ক্রয় এবং ফায়ার স্টেশনের রেট্রোফিটিংয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।

সারা দেশে অগ্নিনিরাপাত্তার জোরদারে নেতৃস্থানীয় দক্ষ জনবল তৈরির উদ্দেশ্যে দুটি ডিপ্লোমা কোর্স চালু করা হয়েছে। ‘ফায়ার সেফটি ম্যানেজার কোর্স’ এবং ‘ফায়ার সায়েন্স অ্যান্ড অকুপেশানল সেফটি কোর্স’ নামের এই প্রশিক্ষণ কোর্স দুটিতে এ পর্যন্ত ৪৬৩ জনকে ডিপ্লোমা সনদ প্রদান করা হয়েছে। পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ফায়ার সার্ভিস, জিআইজেড ও ডিবিএল গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে একটি মিনি ফায়ার ব্রিগেড চালু করা হয়েছে। এ ধরনের আরো অনেক মিনি ফায়ার ব্রিগেড স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ও দাতা সংস্থার উদ্যোগে ফায়ার সার্ভিসের বেশ কিছু প্রকল্প ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—বার্ন ট্রিটমেন্ট হাসপাতাল স্থাপন, শিল্প এলাকার জন্য ১১টি মডার্ন ফায়ার স্টেশন স্থাপন প্রকল্প, ফায়ার ফাইটিং ট্রেনিং গ্যালারি প্রকল্প, ডুবুরি সম্প্রসারণ প্রকল্প ইত্যাদি। দুর্ঘটনায় রেসপন্স টাইম কমিয়ে আনতে সারা দেশের ৯০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও হাইওয়েতে র‌্যাপিড রেসকিউ ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে।  

অগ্নি প্রতিরোধ ব্যবস্থা অগ্নিনির্বাপণের চেয়ে উত্তম। দেশকে সুরক্ষিত করার জন্য দুর্ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে দুর্ঘটনার আগেই নিজেকে নিরাপদ রাখার প্রস্তুতি গ্রহণ বেশি জরুরি। প্রতিরোধব্যবস্থা জোরদার হলে দেশে দুর্ঘটনার সংখ্যা যেমন কমে আসবে, তেমনি সংঘটিত দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও আশানুরূপ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বত্র আমাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই এ দেশকে একটি উন্নত, সুরক্ষিত ও স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

 

লেখক : মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর



মন্তব্য