kalerkantho


যুক্তরাষ্ট্রের সম্মেলন প্রহসন

অনলাইন থেকে

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশে হয়ে গেল মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক ‘শান্তি ও নিরাপত্তা’ সম্মেলন। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এ সম্মেলন আর যাই হোক সংঘাত জর্জরিত ওই অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নয়—   এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল ইরানবিরোধী সম্মেলন।

কয়েক মাস ধরেই ‘মন্ত্রী পর্যায়ে’ দুই দিনের এ সম্মেলন আয়োজনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল ট্রাম্প প্রশাসন। তবে এতে বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর উপস্থিতি ছিল না। তারা বুঝতে পেরেছিল, ইরানকে শায়েস্তা করতেই এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাকি বিশ্বকে কতটা বোকা মনে করে? তারা নির্লজ্জ দাম্ভিক। অন্য প্রধান শক্তিগুলোর অনুপস্থিতি ওয়াশিংটনের ক্ষয়িষ্ণু দশার সবচেয়ে  বড় প্রমাণ।

রাশিয়া ও অন্যদের এ সম্মেলনে উপস্থিত না হওয়ার প্রধান কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল, আরো অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে ইরানকে কোণঠাসা করাই এ সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য। একে ‘শান্তি ও নিরাপত্তা’ সম্মেলন অভিহিত করা হলেও বেশির ভাগ দেশ মনে করে, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যেই এ আয়োজন করা হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক শক্তির এ সম্মেলনে অনুপস্থিতি প্রমাণ করে যে বিশ্ব মোড়ল বলে যে দাবি ওয়াশিংটন করে, তা ক্ষীয়মাণ। ওয়াশিংটন বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে।

এ প্রহসনের কথা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। গত কয়েক দশক যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে বা শাসক পরিবর্তন করে কাটিয়েছে। ফলে তারা যখন ওই অঞ্চলের ‘শান্তি ও নিরাপত্তা’ নিয়ে সম্মেলনের আয়োজন করে, তখন তার প্রতি প্রায় কেউই আস্থা রাখতে পারেনি।

অহংকার ও বিভ্রমের বেড়াজালে আটকে পড়া ওয়াশিংটন ধরে নিয়েছিল, এ ধরনের সম্মেলন তারা সফলভাবে আয়োজন করতে পারবে এবং তাতে অন্য সব দেশ অংশ নেবে। বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে ধ্বংসের খেলা খেলছে ওয়াশিংটন। আফগানিস্তান থেকে ইরাক, লিবিয়া থেকে সিরিয়া—বহু জাতিকে ধ্বংস করেছে তারা। লাখ লাখ বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে। তার পরও শান্তি ও নিরাপত্তার আহ্বান জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?

গত বছর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এককভাবে ‘ইরান পরমাণু চুক্তি’ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছেন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শঠ মনোভাবই স্পষ্ট হয়েছে। আবার তারা ইরানকে দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র প্রমাণের উদ্দেশ্যে এ সপ্তাহে সম্মেলনের আয়োজন করে।

একটি বিষয় লক্ষণীয়, যুক্তরাষ্ট্র ওয়ারশে সম্মেলন আয়োজন করে স্পষ্টতই ব্যর্থ; অন্যদিকে রাশিয়া, তুরস্ক ও ইরান সোচিতে (রাশিয়া) বসে সিরিয়া যুদ্ধ নিষ্পত্তির বিষয়ে কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে। ওয়াশিংটনের নৈতিক দেউলিয়াত্বের এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর হয় না। ইরান নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে আয়োজিত ওয়ারশ সম্মেলন বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ দেশই অগ্রাহ্য করেছে। অন্যদিকে সিরিয়া সংকটের সমাধানে বাস্তবিক চেষ্টা চালাচ্ছে রাশিয়া এবং অন্য দেশগুলো। সিরিয়ায় আট বছর ধরে লড়াই চলছে। বিরোধী পক্ষকে গোপনে যে অর্থ দেওয়া হয় তার বেশির ভাগই যুক্তরাষ্ট্রের।

পোল্যান্ড এখন যুদ্ধাস্ত্রের জন্য ওয়াশিংটনের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। শুধু তা-ই নয়, তারা চায় তাদের ভূখণ্ডে একটি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করুক যুক্তরাষ্ট্র। দেশের ভেতরে ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিরোধীরা তাঁকে ‘রাশিয়ার পুতুল’ বলে সমালোচনা করে। অথচ ওয়ারশ চাইছে, সেই রাশিয়াকে ঠেকাতে পোল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করুক যুক্তরাষ্ট্র তথা ট্রাম্প প্রশাসন।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক এ হাস্যকর সম্মেলন ইউরোপের আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কোনো দেশে আয়োজন করা সম্ভব হতো না। তেহরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি অক্ষুণ্ন রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। ট্রাম্পের একগুঁয়েমির কারণে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জার্মানি, ফ্রান্স বা পরমাণু চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল কোনো দেশ এ সম্মেলন আয়োজনে রাজি হতো না।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মুখ থেকে এ সম্মেলন আয়োজনের প্রকৃত সত্যটি বের হয়ে এসেছে। ওয়ারশে যাওয়ার পথে তিনি জানান, ইরানের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুত করার লক্ষ্যেই এ সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে। অর্থাৎ ওয়ারশ সম্মেলন ইরানের বিষয়ে একটি ‘যুদ্ধ সম্মেলন’ ছিল। তবে রাশিয়া ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর অনুপস্থিতিতে এটি ব্যর্থ হয়েছে। ওয়াশিংটন কখনো প্রকাশ্যে বলেনি যে তারা মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চায়। যদিও এবার স্পষ্ট হয়েছে, তারা এ ধরনের একটি লড়াই চাইছে। ওয়াশিংটনের শয়তানি, দ্বিমুখী প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে এ সম্মেলনে। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও স্থিতির বিষয়ে এখন আর কেউ মার্কিন শাসকদের মুখের কথায় বিশ্বাস করবে না; বরং কৌতুক হিসেবে নেবে।

 

সূত্র : স্ট্র্যাটেজিক কালচার জার্নালের (অনলাইন) সম্পাদকীয়

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ



মন্তব্য