kalerkantho


সুন্দরবনকে সুন্দর রাখা প্রয়োজন

বিধান চন্দ্র দাস

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



সুন্দরবনকে সুন্দর রাখা প্রয়োজন

কয়েক দিন আগে আমার এক তরুণ জার্মান বন্ধুকে নিয়ে সুন্দরবন গিয়েছিলাম। বন্ধুটি জার্মান বন বিভাগে কাজ করে। ল্যান্ডস্কেপ কনজারভেশনে ডিগ্রি করার পর জার্মান বন বিভাগের কনজারভেশন শাখায়ই তাকে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। সে জন্য তার মধ্যে একধরনের চাকরিকেন্দ্রিক প্রশান্তি লক্ষ করেছি। তবে সত্যি কথা বলতে কী যে কয় দিন তার সঙ্গে সুন্দরবনে ছিলাম—বিশেষ করে ট্যুরিস্ট স্পটগুলোতে, সে কয় দিন আমার বেশ অস্বস্তির মধ্যে সময় কেটেছে। তার কারণ সুন্দরবনের ট্যুরিস্ট স্পটগুলোতে অপচনশীল নানা ধরনের জিনিসের উপস্থিতি। ট্যুরিস্ট স্পটের বাইরেও এসব যে ছিল না তা নয়। সুন্দরবনের পরিবেশকে সুন্দর রাখার জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এত যে সাইনবোর্ড, পোস্টার, ডাস্টবিন দেওয়া হয়েছে—বেশ কিছু পর্যটকের সে ব্যাপারে ভ্রুক্ষেপ আছে বলে মনে হয়নি। যে যার খুশিমতো প্লাস্টিক বোতল থেকে শুরু করে নানা ধরনের অপচনশীল জিনিসপত্র সুন্দরবনের নদীতে, খালে, চরে কিংবা গাছের ঝোপে ছুড়ে মারছে। আমার কাছে এটি অতি পরিচিত দৃশ্য হলেও জার্মান বন্ধুটির তা ছিল না। এ ব্যাপারে সে মুখে কোনো মন্তব্য না করলেও তার মুখ দেখে বুঝতে পারছিলাম সে অবাক হচ্ছে।

আসলে ওদের সংস্কৃতিতে এ ধরনের দৃশ্য অনেকটা বিরল। বন, পাহাড়, নদী তথা প্রাকৃতিক পরিবেশকে নোংরা করার বিষয়টি ওদের সংস্কৃতিতে এখন প্রায় নেই বললেই চলে। বেশ কয়েক বছর আগে যুক্তরাজ্যের ওয়েলস রাজ্যের একটি পাহাড়ে ব্যাঙ্গুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক ছাত্রীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের ব্যাপারে এক চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ছাত্রীটির সঙ্গে নেওয়া বিশাল এক কুকুর তৃণভরা সেই পাহাড়ের উপত্যকায় মল ত্যাগ করলে ছাত্রীটি ওই মল তার ব্যাগে থাকা টিস্যু পেপারের সাহায্যে ভালো করে তুলে নিয়ে একটি কৌটায় ভরে তার ব্যাগেই সেই কৌটাটি রেখে দিয়েছিল। ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশে কোনো কোনো পাহাড়, বন, নদী, বিশেষ করে মানববসতিবিহীন জায়গাগুলোতে অনেককেই নোংরা-আবর্জনা না ফেলে তা নিজেদের ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে নিতে দেখেছি। আমাদের দেশে এ দৃশ্য প্রায় বিরল।

সম্প্রতি ভারতের পশ্চিম বাংলায় অবস্থিত বিখ্যাত উদ্ভিদ উদ্যানে (বর্তমান নাম আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু উদ্ভিদ উদ্যান) বেড়াতে গিয়েছিলাম। অপচনশীল জিনিসপত্র, বিশেষ করে প্লাস্টিকজাতীয় পদার্থ নিয়ে যাতে কেউ উদ্যানে প্রবেশ করতে না পারে, তার জন্য উদ্যান কর্তৃপক্ষের নেওয়া ব্যবস্থা দেখে ভালো লাগল। আমাদের কাছে থাকা ক্ষুদ্র দুটি ব্যাগ উদ্যানের প্রধান প্রবেশদ্বারে নিরাপত্তাকর্মীরা যেভাবে পরীক্ষা করল, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।

সুন্দরবনে বেড়াতে যাওয়া মানুষজনের জন্য বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এ কথা ঠিক যে বিপুল পরিমাণ পর্যটক এখন সুন্দরবনের বিভিন্ন স্পট পরিদর্শনে যাচ্ছেন—তাঁদের প্রত্যেককে এ ধরনের চেক করা সম্ভব নয়। তবে কাজটি ভিন্নভাবে করা যেতে পারে। যেসব জালিবোট, লঞ্চ, ট্রলার বা স্টিমার সুন্দরবনে ঢুকছে—তাদের গাইড বা ট্যুর অপারেটরকে এ ব্যাপারে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। কোনো যাত্রী যাতে প্লাস্টিকসহ অপচনশীল কোনো দ্রব্য সুন্দরবনে না ফেলেন তার জন্য প্রতিটি গ্রুপে এক বা একাধিক আবর্জনা সংগ্রহ ব্যাগ ট্যুর অপারেটর/গাইড সঙ্গে রাখবেন। পর্যটকদের তিনি সেভাবেই অনুরোধ করবেন, প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট বা যেকোনো আবর্জনা যেখানে-সেখানে না ফেলে তার কাছে রক্ষিত আবর্জনা সংগ্রহ ব্যাগে যেন তা ফেলা হয়। খুলনা, মোংলা, মুন্সীগঞ্জসহ যেসব জায়গা থেকে সুন্দরবন ট্যুর শুরু করা হয়—সেসব জায়গার ট্যুর অপারেটরকে নিয়ে এ বিষয়ে সভা করা যেতে পারে। সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া মানুষজন থেকে শুরু করে বাওয়ালি, মৌয়ালি ও অন্যদেরও বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন করা যেতে পারে। ট্যুর অপারেটররা এ বিষয়টি সঠিকভাবে কার্যকর করছেন কি না সে ব্যাপারে বন বিভাগের নিরাপত্তাকর্মীরা নজরদারি করতে পারেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের বাস্তুতত্ত্ব শাখার ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে একবার সুন্দরবনের কয়েকটি জায়গায় পড়ে থাকা অপচনশীল দ্রব্যগুলোর ওপর একটি জরিপ করি। সেই জরিপে প্লাস্টিক বোতল, পলিব্যাগ, চিপসজাতীয় প্যাকেট, শ্যাম্পু প্যাকেট, প্লাস্টিক স্যান্ডেল, নাইলন নেট ও কর্কশিটের ভাঙা অংশ ইত্যাদি পাওয়া গিয়েছিল। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে এসব অপচনশীল দ্রব্য সুন্দরবনের প্রাণী, উদ্ভিদ ও অণুজীব তথা ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। সুন্দরবনে আরেকটি জিনিস দিন দিন প্রকট হতে চলেছে। সেটি হচ্ছে সুন্দরবনের কোনো কোনো জায়গায়, বিশেষ করে ফরেস্ট অফিসগুলোর আশপাশে আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা প্রভৃতি গাছ লাগানো হয়েছে। জামতৈল থেকে কটকা পর্যন্ত পথের দুই ধারে অনেকটা জায়গাজুড়ে খুদে জামের বাগান সৃষ্টি হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সুন্দরবনে সুন্দরী, গরান, কেওড়া, গেওয়া, কাকড়া, বাইন ইত্যাদি সব গাছের মধ্যে আম, জাম, কাঁঠালগাছ কী সুন্দর দেখায়? ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে বিষয়টি কী মানানসই? তা ছাড়া বাস্তুতত্ত্ব বা নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণবিদ্যায় ‘পরক প্রজাতি’ বা ‘ইনভেসিভ প্রজাতি’ বলে একটি কথা আছে। সেখানে পরিষ্কারভাবে বলা আছে যে কোনো একটি বাস্তুতন্ত্রের কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী বা অণুজীব যদি কোনো কারণে ভিন্ন একটি বাস্তুতন্ত্রে গিয়ে তাদের বংশবৃদ্ধি ঘটাতে শুরু করে, তাহলে তা অনেক সময় ভিন্ন সেই বাস্তুতন্ত্রের অন্যান্য উদ্ভিদ/প্রাণী/অণুজীবের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কনভেনশন অব বায়োলজিক্যাল ডাইভার্সিটির (সিবিডি) ঘোষণায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে যে পরক প্রজাতি জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর। সুন্দরবনে এ বিষয়টি নিয়ে গবেষণা কম হয়েছে। সুন্দরবনের পরক প্রজাতির ওপর নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন। তা না হলে আগামী দিনে পরক প্রজাতি সুন্দরবনে সংকট তৈরি করবে। সুন্দরবনের অন্যতম সুন্দর গাছ হচ্ছে সুন্দরী। বলা হয়ে থাকে যে সুন্দরী গাছের নাম থেকেই সুন্দরবন নামের সৃষ্টি হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে এই গাছের সংখ্যা কমে আসছে। ‘আগামরা’ রোগেই সুন্দরীগাছের মৃত্যু হচ্ছে বলে বলা হচ্ছে। একাধিক গবেষণাপত্রে এই আগামরা রোগের জন্য সুন্দরবনে লবণাক্ততা মিষ্টি পানির প্রবাহ বৃদ্ধির ওপর। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই—যে পরিমাণ মিষ্টি পানি সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ চরিত্র বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন, সেই পরিমাণ মিষ্টি পানি সুন্দরবন পাচ্ছে না। এর কারণ সুন্দরবনে মিষ্টি পানির উৎস নদীতে পানির প্রবাহ কমে গেছে।

একটি বনের অবনয়ন নির্ভর করে প্রধানত তিনটি বিষয়ের ওপর। প্রথমটি হচ্ছে—বনের আয়তন, দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রজাতি বৈচিত্র্য ও তৃতীয়টি হচ্ছে বাস্তুতান্ত্রিক সেবার ওপর। অস্বীকার করার উপায় নেই যে বিগত শতাধিক বছর ধরে সুন্দরবনে এই তিনটি জিনিস ক্রমহ্রাসমান।

একসময় ফসলের ক্ষেত বা বসতবাড়ি তৈরির জন্য সুন্দরবনের গাছ কেটে জায়গা বের করা হতো। অবাধে শিকার করা হতো পশু-পাখি। এখন অবশ্য তা আর হয় না। সময়ের ব্যবধানে সুন্দরবন থেকে হারিয়ে গেছে বহু প্রাণী। কিন্তু হাতি, গণ্ডার, বুনোমোষসহ কয়েকটি বড় বড় প্রাণী ছাড়া আমরা জানি না প্রকৃতপক্ষে এই বন থেকে কোন কোন প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আসলে সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্যের অতি ক্ষুদ্রাংশ আমরা রেকর্ড করতে পেরেছি। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ চরিত্র বজায় রাখার জন্য অমেরুদণ্ডী জাতীয় প্রাণী খুবই প্রয়োজন। সে কারণে এদের চেনা, তাদের জীবনচক্র ও প্রাচুর্য জানা অত্যন্ত জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতও সুন্দরবনে স্পষ্ট হতে চলেছে। এসব বিবেচনায় নিয়ে সুন্দরবনকে সুন্দরভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বাস্তবসম্মত সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।

লেখক : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়



মন্তব্য