kalerkantho


বেঁচে থাক সব নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা

ড. হারুন রশীদ

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



বেঁচে থাক সব নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা

ভাষা বহমান নদীর স্রোতের মতো। স্রোত থেমে গেলে নদী মরে যায়। তেমনি ভাষার ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেলে সে ভাষাও অবলুপ্তির স্রোতে হারিয়ে যায়। বাংলাদেশ তো বটেই, গোটা পৃথিবীব্যাপীই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে সেসব গোষ্ঠীর ভাষার ব্যবহার না হওয়া। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর লিখিত কোনো রূপ না থাকাও ভাষা হারিয়ে যাওয়ার কারণ। বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর ভাষাও হুমকির মুখে। অথচ একুশের চেতনাই হচ্ছে কোনো জনগোষ্ঠীরই মাতৃভাষা হারিয়ে যেতে না দেওয়া।  বহুত্ববাদ ও বহুমাত্রিক সংস্কৃতি রক্ষার জন্যই এটি জরুরি। 

বাংলাদেশের নৃগোষ্ঠীগুলোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে তাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। দুঃখজনক হচ্ছে, নৃগোষ্ঠীগুলোর সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও সাহিত্যের সামগ্রিক রূপটি বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে অনেকটাই অপরিচিত রয়ে গেছে। এর রয়েছে নানা কারণ। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করে। এর পেছনেও সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। সুদূর অতীতকালে তারা যখন এই অঞ্চলে অভিবাসন শুরু করে তখন পূর্ববাসস্থলের ভৌগোলিক আবহের সঙ্গে যে অঞ্চলের মিল পেয়েছে সেখানেই তৈরি করেছে আবাসন। অর্থাৎ আগের ঐতিহ্য অনুযায়ী তারা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আবাস গড়ে তোলে। ফলে ভৌগোলিকভাবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাঙালিদের সঙ্গে তাদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এভাবে মূল জনস্রোতের জীবন, সংস্কৃতি ও ভাষা বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ক্রমেই তাদের দূরত্ব স্থায়ী হয়।

এ ছাড়া অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আগ্রাসনে নৃগোষ্ঠীর নর-নারী ও তাদের সংস্কৃতি ক্রমেই বৃহত্তর জনজীবনধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বাঙালিদের সঙ্গে নৃগোষ্ঠীর ভাষা, বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক প্রথা, রীতিনীতি, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, খাদ্য, সাংস্কৃতিক ও কৃষিপদ্ধতির কারণেও দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া ভৌগোলিক পরিমণ্ডল অভিন্ন না হওয়ায় এক অঞ্চলের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের জনগণের মধ্যে ভাষাগত পার্থক্য সূচিত হয়। তাই বাংলাদেশের এক অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা অন্য অঞ্চলের মানুষের কাছে দুর্বোধ্য। নৃগোষ্ঠীগুলোর প্রাচীন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভাষারীতি কালের স্রোতে বাহিত হয়ে চলেছে তাদের সমাজে। নিজেদের গুটিয়ে রাখতে, তাদের আচরিত জীবনযাপন পদ্ধতি ও ভাষারীতি যতটা সম্ভব আঁকড়ে থাকতে তারা সদা তৎপর। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত নৃগোষ্ঠীর সঙ্গে ভৌগোলিক, ভাষাতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণেও দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। আর এ দূরত্বই সামগ্রিকভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল স্রোতধারা থেকে করেছে বিচ্যুত। অথচ তাদের ঔজ্জ্বল্যটুকু ধরে রাখতে পারলে, সর্বসাধারণ্যে তুলে ধরতে পারলে শুধু সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীই নয়, সামগ্রিকভাবে উপকৃত হবে সবাই। এ জন্যই বৈচিত্র্যপূর্ণ ও সারল্যে ভরা জীবনাচারের অধিকারী ক্ষুদ্র এসব নৃগোষ্ঠী সম্পর্কে সবাইকে কৌতূহলী করে তোলা একান্ত অপরিহার্য।

বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নানা কারণে গুটিয়ে গেছে নিজেদের মধ্যে। কখনো বা বিসর্জন দিয়েছে আত্মপরিচয়, নাম, গোত্র, এমনকি ধর্মবিশ্বাস পর্যন্ত। অধিকারবঞ্চিত এসব নৃগোষ্ঠীর অনেকে বর্ণহীন বলেই তাদের জীবনের সুমহান বাণী লিপিবদ্ধ হয়নি মাতৃভাষায়। তাই তারা আজ বিলুপ্তির চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। কিন্তু লিখিত বর্ণমালা না থাকা সত্ত্বেও নিসর্গকেন্দ্রিক জীবনে অনেক নৃগোষ্ঠীর উৎসব, পার্বণ,  নৃত্য, গীতিনাট্য, গীতিকা, পালা ইত্যাদি শিল্প ও নানা রকম ক্রীড়া-কসরত ইত্যাদি গড়ে ওঠে জুমকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। ঘন-গম্ভীর শালবনের পাতায় পাতায় ঠোঁটের স্নিগ্ধ স্পর্শ বুলিয়ে শিশুরোদের কণা ছড়িয়ে পড়ত জুম চাষে রত গারো রমণীর বাদামি অথবা শ্যামলা কালো গ্রীবার ওপর। শ্রমক্লান্ত স্বেদসিক্ত, প্রাকৃত সুন্দরী তার ছোট ছোট চোখে সেই সদাহাস্য রৌদ্রকণার দিকে তাকিয়ে সংযুক্ত দুই কর কপালে ঠেকিয়ে নমস্কার জানাত তার ফসলের দেবতা ‘সালজংকে’। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর মধ্যেই রয়েছে এ রকম নিজস্ব সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যের বিপুল সম্ভার। রয়েছে নিজস্ব ভাষাও।

বাংলাদেশে বসবাসরত প্রতিটি নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা থাকলেও তাদের মধ্যে বেশির ভাগ ভাষারই নেই নিজস্ব বর্ণমালা। লিখিত রূপ না থাকায় তাদের ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে তাদের অবলুপ্তিও যেন ত্বরান্বিত হচ্ছে। অথচ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের চেতনাই হচ্ছে কোনো জনগোষ্ঠীর ভাষা হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। আর এ দায়িত্ব শুধু বাঙালির নয়, পৃথিবীর সব মানুষের। আমরা যেন শুধু আবেগতাড়িত হয়ে অমর একুশের কথা না বলি। ভাষা আন্দোলনের চেতনা তখনই সার্থক হবে যখন প্রতিটি জনগোষ্ঠী তার নিজের মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারবে, মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভ করতে পারবে, শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারবে।

শিক্ষার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যে বিষয়টি যুক্ত, তা হলো নিজস্ব ভাষা। ভাষা মানুষের আত্মবিকাশের পথ সম্প্রসারিত করে। এ জন্য একজন মানুষ তার ভাষা প্রয়োগে যতটা দক্ষতা অর্জন করবে, জীবনের নানা ক্ষেত্রে সে ততটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে। এ জন্য বাস্তবিক কারণেই একজন আধুনিক মানুষকে আরো দক্ষ ও যোগ্য হয়ে ওঠার জন্য ভাষার ওপর পূর্ণ দখল থাকা চাই। সেটি অবশ্যই তার মাতৃভাষা। এর সঙ্গে অন্য ভাষা যত শেখা যায় ততই মঙ্গল।

বস্তুত একুশের পথ ধরেই এসেছে আমাদের স্বাধীনতা। কিন্তু যে চেতনা ধারণ করে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল, তার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে? স্বাধীনতা লাভের মাধ্যমেই প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পূর্ণতা পায়। এ কারণে আশা করা হয়েছিল রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে। দেশের সব মানুষ নিজের ভাষায় লিখতে-পড়তে পারবে; কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এ দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো অক্ষরজ্ঞানহীন। তাই ভাষা আন্দোলন এখনো শেষ হয়ে যায়নি। প্রত্যেক মানুষকে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করে তুলতে না পারলে, তাদের শিক্ষিত করে তোলা না গেলে একুশের চেতনা বাস্তবায়নও হবে অসম্ভব। 

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। তাই প্রথমেই এ বাংলা ভাষার গাঁথুনি শক্ত করতে হবে। আমাদের দেশে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভাষা সচেতনতার অভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে। সমস্যা হচ্ছে নতুন প্রজন্ম না বাংলা, না ইংরেজি—কোনো ভাষাই ভালোভাবে শিখছে না। ভাষার বিকৃতি ঘটছে চরমভাবে।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে তথ্য-প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। ফেসবুক-ইন্টারনেটে যোগাযোগের ক্ষেত্রে জন্ম নিচ্ছে এক অদ্ভুত ভাষা। রোমান হরফে বাংলা লেখা হচ্ছে। সেই বাংলার ধরনও আবার বড়ই বিচিত্র। এফএম রেডিওর বিরুদ্ধে ভাষা বিকৃতির অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। এ জন্য গণমাধ্যমের ভাষার ব্যাপারে একটি নীতিমালা করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার, বিশেষ করে যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু তাই বলে নিজস্ব সত্তা বিসর্জন দিয়ে স্রোতে গা ভাসিয়ে দিতে হবে? এই আত্মবিনাশের পথ থেকে আমাদের ফিরে আসতে হবে। লেখায়, বলায়, পঠন-পাঠনে, সর্বত্র বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে মর্যাদার আসনে। মনে রাখতে হবে, একুশে ফেব্রুয়ারি এখন শুধু আমাদের নিজস্ব ব্যাপার নয়, এটি এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবেও। এমনকি জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলাকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠেছে।

আমাদের দেশে অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে। তাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা। শিক্ষার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যে বিষয়টি যুক্ত, তা হলো নিজস্ব ভাষা। বিশেষজ্ঞের মতে, ‘ভাষার অসামান্য গঠনের কারণে একটি গোষ্ঠী তৈরি হয় সেসব ব্যক্তিকে দিয়ে, যারা এভাবে যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম। আদিম অবস্থায় প্রতিটি গোষ্ঠীরই তা যতই ছোট হোক না কেন, নিজস্ব ভাষা বা উপভাষা ছিল।’

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন এ দেশেরই নাগরিক, অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মতো তাদেরও এ দেশের জল-হাওয়া সমানভাবে স্পর্শ করে। এসব নৃগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতি। রয়েছে নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠানও। ঐতিহাসিক কাল থেকেই তারা এ দেশে বসবাস করছে। এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে তারা আমাদের সংস্কৃতিকে করছে বৈচিত্র্যপূর্ণ ও পরিপুষ্ট। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, তারা যেন নিজভূমে পরবাসী। হারিয়ে যাচ্ছে তাদের ভাষা-সংস্কৃতি। অথচ মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভ করা প্রতিটি জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার। যেকোনো মূল্যে সেই অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। যে চেতনায় আমরা সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর কথা বলি, একই চেতনায় বাংলাদেশের সব জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা রক্ষার কথাও বলতে হবে। কারণ যার যার মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্যই সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বাররা তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। সেই চেতনা ধারণ করলে কোনো ভাষাগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য করার কোনো সুযোগ নেই। বহুমাত্রিক সংস্কৃতি ও বহুত্ববাদ প্রতিষ্ঠায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। আর এটি করতে হলে সবার আগে তাদের ভাষা রক্ষার দিকে নজর দিতে হবে। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ফেব্রুয়ারিতে আমাদের শপথ নিতে হবে সব গোষ্ঠীর মাতৃভাষা রক্ষা করার। তবেই সার্থক হবে ভাষাশহীদদের আত্মদান।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

harun_press@yahoo.com



মন্তব্য