kalerkantho


জনবান্ধব পুলিশ দেখতে চাই

ফরিদুর রহমান

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



জনবান্ধব পুলিশ দেখতে চাই

‘চতুর্থ হাজতবাসের সংগত কারণ’ গল্পের নায়ক বাদল অকারণে তৃতীয়বার হাজত খেটে বের হওয়ার পরে বাড়ি ফেরার জন্য হেঁটে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাওয়ার পথে পুলিশ বক্সের কাছের দেয়ালে একটা লেখা দেখে থমকে দাঁড়ায়। ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু, তাকে অধিকতর সেবার সুযোগ দিন’ লেখাটি দেখেই সে উচ্চ শব্দে হাসতে শুরু করে এবং একসময় সে প্যান্টের জিপার খুলে দেয়াল বরাবর দাঁড়িয়ে যায়। তার নিঃসরণ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরে পুলিশ বক্সে দাঁড়ানো কনস্টেবল যখন তাকে গ্রেপ্তার করে, তখন তার মধ্যে কোনো ভাবান্তর লক্ষ করা যায় না। কারণ সে বুঝতে পারে, এবারেই প্রথম কোনো অপরাধের জন্য তাকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে।

গল্পটি লেখা হয়েছিল এখন থেকে ১৫ বছর আগে। পুলিশের হয়রানিতে ত্যক্তবিরক্ত বাদলের মতো একজন নিরীহ তরুণের পক্ষে এর চেয়ে বড় প্রতিবাদ করা হয়তো সম্ভব ছিল না। কিন্তু গত ১৫ বছরে এই পরিস্থিতি কি সামান্যতম বদলেছে? গত এক সপ্তাহের পত্রিকা এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো দেখলে পুলিশি হয়রানির যে চিত্র চোখের সামনে দেখতে পাওয়া যায় তা আমাদের পুলিশ বাহিনীর নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের দিকগুলোই সামনে নিয়ে আসে। একটি ইংরেজি দৈনিকের খবর অনুযায়ী ঘুষ, চাঁদাবাজি, ক্রসফায়ারের হুমকি, আটকে রেখে টাকা আদায় এবং নারী নির্যাতনসহ পুলিশের নানা হয়রানি সম্পর্কে প্রতিদিন অন্তত ৩০০টি অভিযোগ ‘আইজিপি কমপ্লেইন মনিটরিং সেলে’ জমা হয়। আমরা যদি ধরেও নিই, এসব অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা করেছে অথবা করছে তাতেও সাধারণ মানুষ আশ্বস্ত হতে পারে না। কারণ পুলিশ সদস্যদের ‘ক্লোজ করা’ ছাড়া অপরাধ বা কৃতকর্মের জন্য আদৌ কোনো শাস্তির ব্যবস্থা হয়েছে কি না সে সম্পর্কে কোনো সংবাদই নিগৃহীত মানুষের কাছে পৌঁছায় না। ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন ‘পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা’। কাজেই অনেকে পুলিশের অপরাধ লঘু করে দেখেন এবং কখনো কোনো মামলা করলেও ফলোআপের ঝামেলায় যেতে চান না। ফলে পুলিশি হয়রানির ক্রমবর্ধমান হার রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের নানামুখী সাফল্য ও অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার সব প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত ৪ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সপ্তাহ ২০১৯-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘জনবান্ধব পুলিশ দেখতে চাই’ বলে জনগণের সমস্যাকে একান্ত আন্তরিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে এই বক্তব্যকে পুলিশ সদস্যদের একটা অংশ কতটা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছেন, সে সম্পর্কে সন্দেহ থেকেই যায়। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ফলে বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পেলেও একটা বড় অংশের চরিত্র যে বদলায়নি তা বোঝা যায় অভিযোগ বাক্সে প্রতিদিনের জমার দিকে তাকালে। পুলিশ সপ্তাহের পরবর্তী কয়েক দিনের ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলেই এর সত্যতা পাওয়া যায়।

শরফুল আলম পুলিশি হয়রানির বিবরণ দিয়েছেন এভাবে—‘আমি ২৫ বছরের একজন তরুণ, পড়ালেখা করেছি দেশের বাইরে। নিজের দেশে ফিরে এসেই যদি এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়, তবে মনে করছি দেশ থেকে বিদেশই উত্তম। আমার দাদু একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা একজন প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা। আমরা আমাদের প্রতিটি দিন কোনো না কোনোভাবে দেশের সেবায় ব্যয় করি। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই আমার দেশে ফেরত আসা। কিন্তু এ কেমন দেশ আমার?’ শরফুল আলম যে প্রশ্ন তুলেছেন তা বোধ করি পুলিশ কর্তৃক নিগৃহীত সব মানুষের প্রশ্ন।

সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি ঘটনায় পুলিশের ইতিবাচক তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ, ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মানবিক কর্মকাণ্ড মানুষের মনে যে আস্থার জন্ম দিয়েছে পুলিশ নামের কিছু দুর্বৃত্তের আচরণে তা নস্যাৎ হতে দেওয়া যায় না। অর্থ-বিত্ত, বাসস্থান, পদোন্নতি এবং সামাজিক মর্যাদাসহ সব দিক থেকে বিগত চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থেকেও কেন এই আত্মঘাতী তৎপরতা? একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য অসম্মানজনক এসব অপকর্মের দায়ভার বেশির ভাগ কর্মকর্তা কেন মেনে নেবেন!

অপতৎপরতায় লিপ্ত পুলিশ বাহিনীর এই স্বল্পসংখ্যক সদস্যের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণসহ তাদের অসদাচরণের কারণগুলোও খুঁজে বের করা দরকার। সীমাহীন অর্থলিপ্সা, ক্ষমতার দম্ভ ও অপব্যবহার, জবাবদিহির অভাব, অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার অসংখ্য উদাহরণ, নাকি মানসিক অসুস্থতা—এসব ঘটনার জন্য কে দায়ী, তা সুনির্দিষ্ট করে জানা এবং প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ এখন অত্যন্ত জরুরি। আমরা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের দ্রুত বাস্তবায়ন অর্থাৎ শুধু স্লোগানে, ব্যানারে, ফেস্টুনে নয়, বাস্তব ক্ষেত্রে ‘জনবান্ধব পুলিশ দেখতে চাই’।

লেখক : সাবেক মহাপরিচালক

বাংলাদেশ টেলিভিশন

 



মন্তব্য