kalerkantho


জন্মদিন

মমতাজ স্যারেরপ্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

ড. আতিউর রহমান

১৮ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



মমতাজ স্যারেরপ্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

তিনি আমাদের সবারই শিক্ষক। অথচ আমি তাঁর ক্লাস করিনি। আমার মতো এমন অসংখ্য গুণগ্রাহী আছেন, যাঁরা তাঁকে শিক্ষক হিসেবেই মানেন, জানেন। তিনি আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির শিক্ষক। এই সময়ের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। শুধু লিখেই শেষ করেননি তিনি তাঁর দায়িত্ব। অভিনয় করে, বক্তৃতা করে তিনি আমাদের সচেতন করে গড়ে তোলার বিরাট দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ‘অধ্যাপক’ পরিচয়টিকেই স্বজ্ঞানে বেছে নিয়েছেন। সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে বেড়ে ওঠা এক অকুতোভয় ধারাভাষ্যকার। কখনো কখনো আবার শব্দসৈনিক। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন—সর্বত্রই তাঁর অবাধ বিচরণ। বাংলা ও বাঙালির পক্ষের এক নিবেদিতপ্রাণ কর্মী তিনি। সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পের প্রত্যক্ষ শিকার মমতাজ স্যার দেশভাগের দুঃসহ যন্ত্রণা বুকে নিয়ে সীমান্তের এপারে এসে থিতু হওয়ার চেষ্টা করেন। সেই যন্ত্রণা ফুটে উঠেছে তাঁর আত্মজীবনীমূলক লেখায়। শুরুতে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের আকর্ষণে স্বভূমি ছাড়লেও অন্য দশজন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মুসলমান তরুণের মতোই খুব শিগগির সাম্প্রদায়িকতার ধূম্রজাল ভেদ করে সম্পূর্ণ বাঙালি হওয়ার নয়া চেতনায় নিজেকে রূপান্তর করে ফেলেন। একজন মমতাজউদদীন কেমন করে আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় ‘মমতাজ স্যার’ হয়ে গেলেন সেই গল্পই তিনি তাঁর ‘এইতো জীবন’-এ খুব সরল ও সরসভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজ, চট্টগ্রাম কলেজ, জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্ত্ব বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক, শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক এবং জাতিসংঘের বাংলাদেশ মিশনে সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হিসেবে তিনি যে কর্মমুখর জীবন যাপন করেছেন, তাতে বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ এবং মুক্তিযুদ্ধ বরাবরই তাঁর মানসতটের কেন্দ্রে অবস্থান করেছে। আর সে কারণেই এই ‘মৃত্তিকাপুত্র’ দাবি করতে পারেন ‘মৃত্তিকাই তো আমার শেষ পরিচয়।’ মাটিঘেঁষা তাঁর সেই পরিচয় তিনি খুবই স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ। চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে লক্ষাধিক মানুষ বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ডাকে পাগলপ্রায়। ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা বিশিষ্ট সাহিত্যিক আবুল ফজলের সভাপতিত্বে নাগরিক সমাবেশে তাঁর লেখা ‘এবারের সংগ্রাম’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। সে ছিল এক হিরণ্ময় অভিজ্ঞতা। মুক্তির চেতনায় উদ্বেলিত লাখো মানুষ এই নাটক দেখে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বারবার গর্জে ওঠে। পরবর্তী সময়েও তিনি তাঁর উদার রাজনৈতিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন নানা আন্দোলনে। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালে ‘জনতার মঞ্চ’ গঠন ও পরিচালনায় অসাধারণ ভূমিকা রাখেন তিনি। এরপর তিনি ব্যঙ্গাত্মক ‘কলাম’ লিখতে শুরু করেন গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। নিরন্তর গাইতে থাকেন বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু ও বাঙালির জয়গান। সে কী ভাষা। সে কী রসবোধ।

আমার সঙ্গে স্যারের সংযোগ এই আদর্শের জগতেই। যখনই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কোনো সমাবেশে, জনতার মঞ্চে কিংবা বাংলা একাডেমিতে দেখা হয়েছে, স্যার আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। আমার লেখালেখি ও বলা তিনি গভীরভাবে লক্ষ করেন। তাই পছন্দের কোনো লেখা পড়লেই ফোন করতেন। আমার স্ত্রী সাহানাও তাঁর খুব পছন্দের। তার সঙ্গেও মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও বাঙালির সংস্কৃতি নিয়েই স্যারের কথা হয় বেশি। স্যারের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলার সুযোগ হয়েছিল নিউ ইয়র্কে। তখন তিনি আমাদের জাতিসংঘের প্রতিনিধি অফিসে সাংস্কৃতিক কূটনীতি করছেন। বিদেশে-বিভুঁইয়ে আমাকে পেয়ে কী যে তাঁর আনন্দ! স্যারের স্বাস্থ্যটা তখন ভালো যাচ্ছিল না। তবু দীর্ঘক্ষণ আড্ডা দিয়েছিলাম আমরা।

সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে তাঁর অনন্য অবদানের জন্য অসংখ্য পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, দেওয়ান গোলাম মর্তুজা সাহিত্য পুরস্কার, জেবুন্নেসা মাহবুবউল্লাহ পুরস্কার, শিশু একাডেমি অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার, চট্টগ্রাম ত্রিতরঙ্গ সাহিত্য পুরস্কার, ফরিদপুর আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, কলকাতা সমলয় সম্মাননা, মার্কেন্টাইল ব্যাংক সম্মাননা, শেলটেক সম্মাননা, বঙ্গবন্ধু সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক আজীবন নাট্যকর্মের জন্য সম্মাননা, প্রয়াত আনিসুল হকের উদ্যোগে ৮০তম জন্মদিনে নাগরিক সংবর্ধনা ও সম্মাননা এবং বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক।

মমতাজ স্যার যা বলেন, স্পষ্ট করেই বলেন। স্যারের ভাগ্নে প্রিন্স তাঁর দুটি অন্তিম ইচ্ছার কথাও আমাকে জানিয়েছে। মৃত্যুর পরে তিনি ঢাকা নয়, গ্রামেই সমাহিত হতে চান। আর তাঁর জানাজায় জামায়াতের কেউ যেন অংশগ্রহণ না করতে পারে। স্যারের এসব আকাঙ্ক্ষা থেকেই বোঝা যায় তিনি কতটা বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ প্রেমী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাঁর ধমনিতে নিত্য প্রবহমান। চিরদিন বেঁচে থাকুন মমতাজ স্যার আমাদের ভরসার বাতিঘর হিসেবে।

 

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

dratiur@gmail.com



মন্তব্য