kalerkantho


অনলাইন থেকে

টোরি ও ব্রেক্সিট কল্পনার সমাপ্তি

২১ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



হাউস অব কমনসে ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে সম্প্রতি টানা তিন ঘণ্টা প্রশ্নবাণে জর্জরিত হন টেরেসা মে। এ প্রশ্নোত্তর পর্বের মাঝামাঝি সময় সাবেক মন্ত্রিসভা সদস্য স্টেফেন ক্রাব সহানুভূতি জানিয়ে বেশ বিরল একটি মন্তব্য করেন—সরকার এখন ‘কঠিন পরিস্থিতি ও সমঝোতার শীতল সমঝোতা’র মুখোমুখি। মের জবাবটি ছিল বেশ অকপট। তিনি বলেন, ‘বিশ্বকে আমরা যেমন দেখতে চাই তেমনটা পাওয়া সম্ভব নয়। বাস্তব বিশ্বকে আমরা যেমন পাচ্ছি তাকেই যৌক্তিক এবং ব্রিটিশ জনগণের স্বার্থোপযোগী করে তুলতে হবে। এটাই এখন এই হাউসের আমাদের সবার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’

ব্রেক্সিটের ইতিহাস হলো বাস্তবতাকে প্রত্যাখ্যান করার ইতিহাস। টেরেসা মে যেমনটি বলছিলেন। তিনি নিজেও যে সব সময় এর মোকাবেলা করেছেন তা নয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর শুরুর মাসগুলোর জন্য এ কথাটি বিশেষভাবে সত্যি। ব্রেক্সিট নিয়ে মানুষ তখন দ্বিধাবিভক্ত। ওই সময় দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে এমন কিছু নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনার জন্য তৈরি ছিলেন না তিনি। ধীরে ধীরে, বিশেষ করে তিনি ২০১৭ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর থেকে পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। নমনীয় হতে শুরু করেন মে। সমঝোতা করতে করতে এ সপ্তাহে এসে অসম্মানজনক ও জগাখিচুড়ি চুক্তিতে রাজি হয়েছেন তাঁর কর্মকর্তারা।

টোরি দলের ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী ব্রেক্সিটবাদীরাও এ ধরনের মনোভাব গ্রহণ করবেন না। তাঁদের কাছে ব্রেক্সিট ছিল কতগুলো অবাস্তব আইডিয়ার একটা আকর্ষণ মাত্র। যার মধ্যে বাস্তবতার ছাপ ছিল না। বাস্তবভিত্তিক প্রস্তাব তৈরি কখনো কোনো চেষ্টা বা চর্চাই তাঁদের মধ্যে ছিল না। বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার পর তাঁরা পদত্যাগ করে মঞ্চ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। তাঁরাই মেকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এটা রাজনৈতিক প্রগল্ভতা ছাড়া আর কিছুই নয়। ব্রেক্সিট-প্রক্রিয়া নিয়ে জনগণের মধ্যে যে উদ্বেগ রয়েছে, তার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। মের ন্যূনতম প্রশংসা করার চেষ্টা তাদের মধ্যে কখনো ছিল না। ডেইলি মেইল বা ডেইলি এক্সপ্রেসের মধ্যেও এই প্রবণতার ছায়া দেখা যায়। ব্রেক্সিটপন্থীরা যদি মের স্থলে তাঁদের পছন্দনীয় অন্য কোনো ব্যক্তিকে যদি বসিয়ে দেন, তাহলে তিনিই হবেন ব্রিটিশ ইতিহাসে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সময় ধরে থাকা প্রধানমন্ত্রী। পার্লামেন্টে ব্রেক্সিটপন্থী বা বিরোধীদের সংখ্যায়ও কোনো হেরফের হবে না। ব্রেক্সিটপন্থীরা হয়তো কোনো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা জানাবেন, যা ভোটাভুটিতে নাকচ হয়ে যাবে। মাইকেল গ্রোভ বিচক্ষণ বলেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এখন পর্যন্ত মে ব্রেক্সিট বাস্তবতাবে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেননি। সম্প্রতি তিনি ডাউনিং স্ট্রিটে বলেন, ব্রিটেনের জন্য তিনটি পথ রয়েছে। প্রথমটি ইইউর সঙ্গে তাঁর চুক্তি মেনে নেওয়া। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে ইইউর সঙ্গে আবারও সংঘাতে জড়ানো। এবং তৃতীয়টি হচ্ছে, পুরো ব্রেক্সিটই বাতিল করে দেওয়া। স্বাভাবিক কারণেই এই বক্তব্য ইউরোপপন্থীদের উৎসাহিত করেছে। কারণ এর মাধ্যমে দ্বিতীয় গণভোটের জন্য জনমত গড়ে তোলা সহজ হয়। এবং ইইউতে থেকে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়।

তবে এই বিবৃতিতে একটি সত্য অস্বীকার করা হয়েছে, তা হলো—এই তিনটি পথ ছাড়াও এখনো ব্রিটেনের সামনে আরো কিছু পথ রয়েছে। গ্রোভসহ আরো কয়েকজন নেতা মনে করেন, তাঁরা মের চুক্তির মধ্যে আরো কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে পারবেন। যেমন শক্তিকেন্দ্র। হাউস অব কমনসের ব্রেক্সিট-পরবর্তী ইইউর একক বাজারে থাকতে চায় দুই পক্ষের (দুই দলের) এমন সব সদস্যই তথাকথিত ‘নরওয়ে ফর নাও’ নামে পথে হাঁটতে আগ্রহী। যদিও তাঁরা জানেন না এই পথ তাঁদের কোথায় নিয়ে যাবে। এই দলে গ্রোভ ছাড়াও আছেন পেনশন-বিষয়ক মন্ত্রী আমবার রাড। হতে পারে মে হয়তো তাঁর সামনে থাকা রাজনৈতিক উপায়গুলোর ব্যাপারে সেভাবে বিবেচনা না করে কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন।

মে যদি তাঁর আশু কর্তব্য অর্থাৎ আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে টোরি দলের নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারেন, তাহলে আগামী ডিসেম্বরের শুরুতেই পার্লামেন্টে বড় খেল দেখা যাবে। ওই সব বিতর্কে ঝুঁকিতে পড়বে ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ। রাজনীতির এই সংকট কাটিয়ে উঠতে হবে। কমনসে চুক্তির পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে মের পক্ষে যা যা সম্ভব তার সবই তিনি করবেন। আর একে প্রতিহত করতে এমপিরাও জোর চেষ্টা চালাবেন।

এমপিরা যদি মুক্তভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান এবং তাঁরা তাঁদের বিবেকের প্রতি বিশ্বস্ত থাকেন, তাহলে এটাই হবে তেমন একটি ইস্যু। পার্লামেন্টের কার্যপ্রণালী বেশ জটিল। কমনসের পদ্ধতি কমিটি এ সপ্তাহে জানিয়েছে, বিতর্ক, ভোটের জন্য পর্যাপ্ত সময় রাখা অপরিহার্য। কার্যপ্রণালী থেকে কৌশলে কোনো ইস্যুকে যেন বাদ না দেওয়া হয় তা-ও নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে মের ব্রেক্সিট প্যাকেজের পক্ষে পার্লামেন্ট বা দেশের সমর্থন নেই। দ্বিতীয়বার গণভোটসহ যে যে পথে হাঁটা সম্ভব সব নিয়েই বিবেচনা চলছে। তবে ব্রিটেনকে ব্রেক্সিটপন্থী বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের কাছ থেকে উদ্ধারের কাজ এখনো শুরু হয়নি।

 

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ



মন্তব্য