kalerkantho


শুভ জন্মদিন

অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রামের প্রতীক সুফিয়া কামাল

দিল মনোয়ারা মনু

২০ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রামের প্রতীক সুফিয়া কামাল

কবি সুফিয়া কামালকে আমরা অজস্র বিশেষণে বিশেষিত করে থাকি কিন্তু কোন পরিচয়টি তাঁকে বেশি বড় করে তুলবে, মহিমান্বিত করবে আমরা জানি না। বাঙালি জাতির বিবেক, জননী সাহসিকা, অকুতোভয় সংগ্রামী, মানবতার কবি—কোনটি। তবে জানি সব বিশেষণ যুক্ত করার পরও তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয় উঠে আসবে না যদি না তাঁর সমগ্র জীবনের কর্মকাণ্ডের মূলসূত্র, চিন্তা-চেতনা ও রাজনৈতিক ধারাটি পরিপূর্ণভাবে অনুধাবন, চিহ্নিত ও বিশ্লেষণ না করি।

শুধু তা-ই নয়, খানদানি উর্দুভাষী পরিবারের মেয়ে হয়েও সেই সময়ে সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে টুপি, আচকান, পায়জামা পরে পেয়ারী লাল মাস্টারের কাছে পড়তে যাওয়া, সবার অগোচরে কবিতা লিখে পত্রিকায় প্রকাশ করা, বরিশালের অশ্বিনীকুমার দত্তের ভাইয়ের মেয়ে সাবিত্রী দেবীর প্রতিষ্ঠিত মাতৃমঙ্গল সমিতিতে একমাত্র মুসলমান সদস্য হিসেবে কাজ করা—এ সবই তাঁর চরিত্রের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ১৯২৫ সালে বরিশালে মহাত্মা গান্ধী এলে খাদি পরে প্রকাশ্যে তাঁর সঙ্গে দেখা করা এবং নিজ হাতে কাটা চরকার সুতা তাঁর হাতে তুলে দেওয়া, সওগাত সম্পাদকের সঙ্গে স্টুডিওতে গিয়ে পুরুষ ফটোগ্রাফারের হাত থেকে ছবি তুলে লেখক হিসেবে সেই ছবি মহিলা সওগাতের প্রথম সংখ্যায় ছাপার সম্মতি দেওয়া, রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে স্বামী নেহাল হোসেনের সঙ্গে ঠাকুরবাড়িতে নাটক দেখতে যাওয়া অথবা গড়ের মাঠে কবি খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দিনের এবং সওগাত সম্পাদকের স্ত্রীর সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর মতো প্রতিবাদী ও সাহসী ঘটনাগুলো নারী মুক্তি ও সমাজ প্রগতির ধারাকে সেই সময় যে কতখানি বেগবান করেছিল, সেই তাৎপর্য আজ আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পারি।

আজ মনে পড়ছে সুফিয়া কামালের সঙ্গে প্রথম দেখার সেই শুভক্ষণটি, সময়টা ১৯৭৫ সালের শেষদিকে। আমি তখন বেগম পত্রিকায় নূরজাহান আপার সঙ্গে সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। আপা আমাকে নিয়ে গেলেন খালাম্মা কবি সুফিয়া কামালের ধানমণ্ডির বাসায়। প্রথম দেখায় মনে হলো শুচি-স্নিগ্ধ-শুভ্র সমুজ্জ্বল এক আলোর প্রতিমা যেন। ওপর থেকে বোঝাই যায় না ভেতরের শক্তি কত তীব্র, ন্যায় ও সত্যের স্বার্থে তিনি কত কঠোর হতে পারেন। বিস্ময় ও মুগ্ধতা নিয়ে প্রথম দেখা এই মানুষটি আমার কর্মজীবনে সাহস ও প্রেরণার উৎস হয়ে আলো ছড়িয়েছেন। ভালোবাসা, সততার সঙ্গে কাজ করা, সাহস নিয়ে এগিয়ে যাওয়া, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছি।

দাদাভাইয়ের কাছে শুনেছি, ১৯৫৬ সালের ৫ অক্টোবর কবির তারাবাগের বাসায় কচিকাঁচার মেলার জন্ম হয়। সেদিনের সেই ক্ষুদ্র পরিসরের সভায় আজকের এই বৃহত্তম শিশু-কিশোর সংগঠনের জন্ম নেওয়াটা এক অসাধারণ ঘটনা। এই স্বপ্নদ্রষ্টারা সেদিন সিদ্ধান্ত নিতে যে ভুল করেননি কচিকাঁচার মেলার ৬২ বছর ধরে চলা বিশাল বর্ণাঢ্য কর্মকাণ্ড আজ তাই প্রমাণ করে চলেছে।

মানবতার প্রতি ছিল তাঁর দৃঢ় প্রত্যয়। তিনি একজন কবি, রাজনীতিবিদ ও নারী আন্দোলনকারী শুধু নন, তিনি সংস্কৃতিজগতে নেতৃত্বদানকারী একজন পুরোধা ব্যক্তিত্বও। কোথায় দৃষ্টি ছিল না তাঁর? কবি হিসেবে যেমন অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন, তেমনি মানবতার প্রতি ছিল দৃঢ় প্রত্যয়, নারী মুক্তি চেতনার পথিকৃৎ সুফিয়া কামাল আজীবন শাসক গোষ্ঠীর অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, পথে নেমেছেন। সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অচলায়তন ভেঙে গণমানুষকে আলোর সন্ধান দিতে চেষ্টা করেছেন যে আলো তাঁর একান্তভাবেই নিজস্ব, নিজ চিন্তা-চেতনার অভিজ্ঞতার আলোকে পরিপুষ্ট।

তিনি যেমন দেশের শিশুদের দেশপ্রেমিক, সুযোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সারা জীবন একান্তভাবে কাজ করেছেন, তেমনি চোখ রেখেছেন নারীসমাজের উন্নয়নের লক্ষ্যেও। প্রতিষ্ঠা করেছেন ১৯৭০ সালে মহিলা পরিষদ। মহিলা পরিষদের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকার কারণে আমি তাঁর আন্তরিক চেষ্টা, একাগ্রতা খুব কাছে থেকে দেখেছি। প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী হিসেবে আজীবন লড়েছেন এ দেশের সুযোগ ও অধিকার বঞ্চিত অসহায়-নির্যাতিত নারীসমাজের জন্য। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল এক শক্তিশালী নারী আন্দোলন। বেগম রোকেয়ার মতো তিনি তাঁর সব কাজ পরিচালনা করেছেন মুক্তবুদ্ধি প্রসারের জন্য। সমাজের কূপমণ্ডূকতা দূর করে উদার ও যুক্তিপূর্ণ সমাজ ও মানব জীবন প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলস সাহিত্য সৃষ্টির পাশাপাশি তিনি সমাজ-মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে গেছেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সহযাত্রী অন্য নারীদের সঙ্গে আঁচলের আড়ালে একটি একটি করে ইট লুকিয়ে নিয়ে হেঁটে গেছেন শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য। বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য লড়াই করেছিলেন।

আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম এবং ১৯৩১ সালে Indian Women Association-এর সদস্য নিযুক্ত হন। ১৯৪৬ সালে কলকাতার দাঙ্গায় অসহায় হিন্দু-মুসলিম নারী-পুরুষের সাহায্যার্থে তাঁর ভূমিকা ছিল দৃঢ় প্রত্যয়ী ও মানবিক। প্রখ্যাত নারী সংগঠক লীলা রায়ের প্রতিষ্ঠিত শান্তি কমিটির একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে নিরলস কাজ করেছেন তিনি। বাঁচিয়েছেন বহু অসহায় নারী ও বিধ্বস্ত সংসারকে।

দেশের প্রগতিশীল শিল্পী-সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদকে নিয়ে পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক শাসকদের বৈরিতার মুখে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রশতবার্ষিকী উদ্যাপন কমিটি গঠিত হয়, যার কেন্দ্রে ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। তাঁরা প্রত্যেকে ছিলেন অসাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রভক্ত এবং বাঙালি চেতনাবোধে উজ্জীবিত। সেই সময়ে রবীন্দ্রশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, রাজনৈতিকভাবে তা পরবর্তী সময়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপ নেয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় পরে প্রতিষ্ঠিত হয় আজকের অনন্য প্রতিষ্ঠান ছায়ানট। আমাদের সব গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা সৈনিক ছিলেন জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামাল।

সাহিত্যচর্চা করতে গিয়ে তিনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিদ্রোহী কবি নজরুলের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। সমাজকর্মে উজ্জীবিত হয়েছেন মহীয়সী বেগম রোকেয়ার প্রত্যক্ষ প্রেরণা থেকে। তাঁর সংগ্রাম শুধু নারী আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ এ দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে। মৌলবাদীদের হুমকি, তিরস্কার উপেক্ষা করে নিজ আদর্শে থেকেছেন অটল, অনড়।

সাহিত্যচর্চায় তিনি ছিলেন নিরলস। ১৯১১ সালে জন্ম নেওয়া কবি সুফিয়া কামালের ১২ বছর বয়সে বরিশালের তরুণ পত্রিকায় ‘সৈনিক বধূ’ গল্প প্রকাশের মধ্য দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা জীবনের শেষ দিন অবধি ছিল। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ ‘কেয়ার কাঁটা’ প্রকাশিত হয় তাঁর ২৪ বছর বয়সে। এই গ্রন্থের গল্পগুলোতে তাঁর জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবন দর্শন, সমাজ পর্যবেক্ষণের কারণে গল্পগুলো হয়ে উঠেছিল সময়কালের নিরিখে উল্লেখযোগ্য।

তাঁর ১৭টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। গল্প, উপন্যাস, আত্মজীবনী লিখলেও তিনি মূলত কবি। তাঁর লেখা কবিতা ও অন্যান্য গ্রন্থ রাশিয়া ও আমেরিকায় রুশ ও ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে।

তাঁর এই সুবিশাল কর্মজীবন আমাদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

লেখক : সাংবাদিক, লেখক ও গণমাধ্যম সম্পাদক, মহিলা পরিষদ

 

 



মন্তব্য