kalerkantho


অর্ধ শতাব্দীতে ৬০ শতাংশ প্রাণী নিশ্চিহ্ন

শহিদুল ইসলাম

১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



অর্ধ শতাব্দীতে ৬০ শতাংশ প্রাণী নিশ্চিহ্ন

১৯৭০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত মানুষ পৃথিবীর ৬০ শতাংশ প্রাণী নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। সাম্প্রতিকতম গবেষণা এটা প্রমাণ করেছে। পৃথিবীর সম্মুখসারির বিজ্ঞানীরা একে বিশাল ক্ষতি বলেই ক্ষান্ত হননি, তাঁরা ‘সভ্যতার’ অস্তিত্ব নিয়েই সংশয় প্রকাশ করেছেন। বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের এই বিশাল ধ্বংস সাধনের ওপর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ৫৯ জন বিজ্ঞানী দীর্ঘদিন গবেষণা করে বলেছেন, ‘১৯৭০ সাল থেকে মানুষ পৃথিবীর ৬০ শতাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, মাছ ও সরীসৃপ ধ্বংস করেছে। তা বর্তমান সভ্যতার জন্য হুমকিস্বরূপ। ওয়ার্ল্ড ওয়াল্ডলাইফ ফান্ডের (WWF) হয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করেন এবং রিপোর্ট  WWF প্রকাশ করে গত ৩০ অক্টোবর ২০১৮। তাঁরা লক্ষ করেন বিগত মিলিয়ন বছর ধরে যেসব প্রাণের (উদ্ভিদ ও প্রাণী) সৃষ্টি হয়েছে, বিশুদ্ধ বায়ু, পানি ও অন্য সব কিছুর জন্য মানুষকে তাদের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। তাঁরা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির বিপদ সম্পর্কে সবাইকে সাবধান করে দেন। এই বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্য জোগানোর দায় প্রকৃতির। মানুষ প্রকৃতিরই এক ক্ষুদ্র অংশ। অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদের ওপরই মানুষের বেঁচে থাকা।

১৯৭০ সালের পর সমগ্র বিশ্বে ৬০ শতাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা সুপেয় পানিতে বসবাসকারী প্রাণী ও উদ্ভিদের। তাদের ৮৩ শতাংশ বিলীন হয়ে গেছে। দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। জার্মানির ‘পোস্টডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের’ বৈশ্বিক টেকসই বিশেষজ্ঞ প্রফেসর জোহান রকস্ট্রোম বলেন, ‘আমাদের হাত থেকে দ্রুত সময় পার হয়ে যাচ্ছে। বাস্তুসংস্থান(Ecosystem) ও জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই আমরা পৃথিবীকে ভবিষ্যৎ মানুষের জন্য নিরাপদ একটি পৃথিবীতে পরিণত করতে পারি।’ অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন যে এরই মধ্যেই ষষ্ঠ প্রাণবিধ্বংসী যুগ শুরু হয়ে গেছে। এটাই হবে হোমো স্যাপিয়েন্স অর্থাৎ মানুষের দ্বারা সংঘটিত প্রথম প্রাণবিধ্বংসী যুগ। আগের পাঁচটা ছিল প্রাকৃতিক, যেখানে মানুষের কোনো হাত ছিল না। অন্য আরেকটি গবেষণা প্রমাণ করেছে যে বর্তমান সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত মানুষ স্তন্যপায়ী প্রাণীর ৮৩ শতাংশ ও উদ্ভিদের অর্ধেক ধ্বংস করেছে এবং যদি এই মুহূর্ত থেকে এই ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করা হয়, তাহলেও আগের প্রকৃতিকে ফিরে পেতে আমাদের পাঁচ থেকে সাত  মিলিয়ন বছর সময়ের প্রয়োজন হবে।

বন্য প্রাণী ধ্বংসের প্রধান কারণ হলো, প্রাণী ও উদ্ভিদের স্বাভাবিক আবাসভূমি ধ্বংস করে সেখানে কৃষি ফার্ম তৈরি করা। পৃথিবীর সমগ্র জমির তিন-চতুর্থাংশ মানুষের কর্মতৎপরতার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত। খাদ্যের জন্য পশু হত্যা দ্বিতীয় কারণ। মানুষ এরই মধ্যে ৩০০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।

দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় ৮৯ শতাংশ মেরুদণ্ডী প্রাণী নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কারণ সেখানে বন্য গাছপালা ও প্রাণীর বাসভূমি গভীর বনাঞ্চলের বিরাট অংশ ধ্বংস করা হয়েছে। বৃহত্তর লন্ডনের আয়তনের সমান গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সাভানা অঞ্চল প্রতি দুই মাস অন্তর পরিষ্কার করা হয়, বলেন ব্যারেট। এটি একটি শ্রেষ্ঠ উদাহরণ যে আমাদের আহার্য বস্তু সরবরাহের কারণেই বন্য প্রাণীর এই অন্তর্ধান। জঙ্গল পরিষ্কার করে কৃষিজমি সৃষ্টি করে সেখানে সয়াবিন চাষ করা হয় এবং সেই সয়াবিন থেকে একধরনের চাটনি তৈরি করে ইংল্যান্ডের শূকর ও মুরগির খাদ্য হিসেবে রপ্তানি করা হয়। স্বয়ং ইংল্যান্ডই তার বন্য প্রাণীর বিরাট অংশ ধ্বংস করেছে। জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাওয়া ২১৮টি দেশের মধ্যে ইল্যান্ডের স্থান ১৮৯তম।

বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক বাসস্থান বনভূমি ধ্বংসের জন্য বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নদ-নদী ও হ্রদগুলো। সেখানে বন্য প্রাণীর ৮৩ শতাংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কৃষিকাজের চাপ ও নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ তার প্রধান কারণ।

 WWF-এর ডিরেক্টর জেনারেল ম্যাক্রো লাম্বার, তিনি বলেন যে আসল কথা হলো ‘আমাদের খাদ্যাভ্যাস। আজ আমরা আর আমাদের বর্তমানের ভঙ্গুর উৎপাদন ব্যবস্থা এবং বিলাসী জীবনযাপন প্রণালি অস্বীকার করতে পারি না।’ ২০২০ সালে জাতিসংঘের

 ‘Convention on Biological Diversity’ অনুষ্ঠিত হবে। পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের উপস্থিতিতে প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সেটাই শেষ সুযোগ। ‘আমাদের প্রয়োজন প্রকৃতি সংরক্ষণের একটি সর্বজনস্বীকৃত সিদ্ধান্ত। কিন্তু আমাদের হাতে মাত্র দুই বছর সময় আছে। সত্যিকার অর্থে এটাই শেষ সুযোগ। এই সময়ের মধ্যে আমাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতেই হবে’, বলেন ব্যারেট।

WWF-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া স্টাল (Tanya stule) বলেন, ‘আমরাই প্রথম প্রজন্ম যারা বুঝতে পারছি যে আমরা আমাদের গ্রহকে ধ্বংস করছি এবং আমরাই শেষ প্রজন্ম, যারা আমাদের প্রিয় গ্রহকে রক্ষা করার জন্য কিছু একটা করতে পারি।’ অর্থাৎ আমাদের আগে কেউ বোঝেনি যে বিগত ১০ হাজার বছরের সভ্যতার অগ্রযাত্রার অন্তরালে পৃথিবী ধ্বংসের বীজ লুকিয়ে ছিল। আমরা আজ সেটা বুঝতে পারছি এবং পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে অতীতের কোনো প্রজন্মই কিছু করতে পারবে না। কিছু করতে হলে আমাদেরই তা করতে হবে। জীবনের জন্য অপ্রয়োজনীয় জিনিসের উৎপাদন ও ব্যবহার কমিয়ে প্রকৃতির ওপর চাপ কমিয়ে আনতে হবে।

লেখক : সাবেক অধ্যাপক

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়



মন্তব্য