kalerkantho


জনগণ রাজনৈতিক নেতাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হবে কবে?

জয়া ফারহানা

১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



জনগণ রাজনৈতিক নেতাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হবে কবে?

তলস্তয়ের সেই স্মরণীয় উক্তিটি স্মরণ করছি, ‘সবাই দুনিয়া বদলানোর কথা বলে, কিন্তু কেউই নিজেকে বদলানোর কথা বলে না।’ কেন? দুনিয়াকে বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির মধ্যে ফাঁকি দেওয়াটা সোজা; কিন্তু নিজেকে বদলানো অত সোজা নয়। নিজের অনৈতিক জৈবিক প্রবৃত্তিকে পরাস্ত করা ইসলাম ধর্মে সবচেয়ে বড় জিহাদ বলা হয়েছে। যাহোক, দুনিয়া তো প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে। বদলে দেওয়ার কাজটি করছেন অগণিত বিজ্ঞানী, দার্শনিক, মহাকাশ গবেষক এবং আরো কত শত চেঞ্জমেকার। এই মাত্র সেদিন মহাকাশবিজ্ঞানীরা তথ্য দিলেন, চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ নয়, আছে আরো দুটি গুপ্তচাঁদ। সেই দুটি চাঁদও নাকি আদি চাঁদের মতো একই দূরত্বে রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ দুটি চাঁদ ছাড়া আরো প্রাকৃতিক উপগ্রহ হয়তো আছে। পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার কাজটি এককভাবে কারো হাতে হয় না। পৃথিবীকে কে কতটা বদলালেন, কাঁটা কম্পাস নিয়ে তা প্রমাণেরও সুযোগ নেই। তাই বলা সহজ। কিন্তু নিজেকে বদলানোর প্রমাণ রাখতে হয় অন্তত কিছু জীবন্ত নজির হাজিরের মাধ্যমে। ভিআইপিরা উল্টাপথে গাড়ি না চালিয়ে নজির রাখতে পারেন। হাতি-ঘোড়ার পিঠে চড়ে সৈন্য-সামন্তযোগে, ঢোল-বাদ্য বাজিয়ে সামন্ত কায়দায় রাস্তা দখল না করার মাধ্যমে নজির রাখতে পারেন। এক-এগারোর কুশীলব, যুদ্ধাপরাধী, ঋণখেলাপি এবং কালো টাকার মালিকদের মনোনয়ন না দিয়ে নৈতিক উন্নয়নের নজির রাখতে পারেন। কিন্তু কেউ নিজেকে বদলায় না বলে নির্বাচন আসে নির্বাচন যায়, কিন্তু সামন্ততান্ত্রিক নির্বাচনী সংস্কৃতি আর বদলায় না। নিজেকে বদলানো যে সোজা নয়, তার প্রমাণ চারপাশে ছড়ানো আছে নানাভাবে। দেশের আয়করব্যবস্থা ধনীবান্ধব হওয়া সত্ত্বেও কর দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে এমন ৬৮ শতাংশই কর দেন না। অর্থনীতির গবেষকরা বলছেন, এমনকি সবচেয়ে বেশি আয়ের ২৫ শতাংশ ব্যক্তির মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই আগের বছর আয়কর দেননি। দেশে ৩৫ লাখ টিআইএনধারী থাকলেও ২০ লাখের বেশি আয়কর রিটার্ন দেন না। ‘কেউ নিজেকে বদলানোর কথা বলে না’—তলস্তয়ের স্মরণীয় এই উক্তি সামান্য বদলে নিই। আমরা বলতে পারি, সবাই দেশ বদলানোর কথা বলে, কিন্তু কেউই নিজেকে বদলানোর কথা বলে না। কী এর কারণ? এক. নিজেকে ত্রুটিমুক্ত ভাবলে বদলানোর কথা কেউ ভাবেন না। দুই. বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার অথবা ঘণ্টার গলায় বিড়াল বাঁধার কাজটি ঝুঁকিপূর্ণ। এই ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে ঝাঁকের কই হয়ে ঝাঁকে মিশে যাওয়া নিরাপদ। এত দিন ভাবতাম, আমরা জনগণই শুধু ঝাঁকের কই বুঝি। এখন দেখছি, জনপ্রতিনিধিরাও ঝাঁকের কই। এই উপমা ব্যবহারে আমাদের দোষ দেওয়ার সুযোগ নেই। একটি আসনের জন্য ৫২ প্রার্থী (বরগুনা-১) মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে নিজেরাই নিজেদের ঝাঁকের কই প্রমাণ করেছেন। তবে বিষয়টিকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখছি। ধরে নিচ্ছি, জনগণের সেবা দেওয়ার জন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা যারপরনাই ব্যাকুল, ব্যগ্র, উদগ্রীব। একটি আসনের বিপরীতে এত বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া দেখে আমাদের প্রজাজীবন ধন্য হয়েছে। আল্লাহ মালুম, না জানি বরগুনা-১ (পাথরঘাটা-বামনা-বেতাগী) আসনটিতে কোন সোনার খনি আবিষ্কার হয়েছে। অর্থনীতি বিষয়ে যাঁরা বোদ্ধা, বিশেষজ্ঞ, তাঁরা তো বলছেন—গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোটি আগে ছিল কৃষিভিত্তিক। এখন হয়েছে ইজারা ও ভাড়াভিত্তিক। নতুন এই নিয়ন্ত্রণ কাঠামোটি তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায়। ক্ষমতাসীন স্থানীয় নেতাদের সুপারিশ ছাড়া গ্রামে কাজ পাওয়া মুশকিল। মনোনয়ন পেতে ব্যগ্র-ব্যাকুল এমপি সাহেবরা তবে গ্রামীণ অর্থনীতির কী পরিবর্তন করলেন? গবেষণা প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে, ধনীদের আয় যেখানে ৮ থেকে ১০ শতাংশ বাড়ছে, গরিবদের আয় সেখানে বাড়ছে ২ থেকে ৩ শতাংশ হারে। নিতান্ত উম্মি জনতা হওয়া সত্ত্বেও আমরা বুঝতে পারছি, কেন এবং কী কারণে একমাত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়াকেই জনপ্রতিনিধিরা জনসেবার মাধ্যম বলে ভাবছেন। গ্রামে মানসম্পন্ন শিক্ষায় ব্যাপক বৈষম্য। সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সে শিক্ষা কতটুকু মানসম্পন্ন? আমরা কি আশা করতে পারি, বরগুনার পাথরঘাটা-বামনা-বেতাগী থেকে একজন ফজলে হাসান আবেদ বেরিয়ে আসবেন? একজন কেন, শত শতই তো বেরিয়ে আসার কথা। কিন্তু কেন তা হয় না? যে মূল্যস্ফীতিকে প্রান্তিক মানুষের অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা মনে করা হতো, তা কমে এখন ৫ শতাংশের সামান্য ওপরে। তবে কি তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতির যেটুকু পরিবর্তন হয়েছে, তার ফসল গ্রামীণ ধনীরাই ভোগ করছেন? আমরা বোকাস্য বোকা বলেই মহাত্মা গান্ধীর কথা মনে পড়ে। জনপ্রতিনিধি হওয়ার আগে ট্রামে যাতায়াতের জন্য তাঁর কাছে সামান্য পয়সা যদি বা থাকত, পরে সেটুকুও থাকত না। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে ঘটে উল্টোটা। এ যুগের বুদ্ধিমান জনপ্রতিনিধিরা কেউ নিশ্চয়ই কৌপীন পরিহিত কপর্দকহীন মহাত্মা গান্ধী হতে চাইবেন না। তাঁরা বদলের কথা বলেন; কিন্তু নিজেরা বদলান না।

দুই.

দেশের মাথাপিছু আয় এখন ৮৯ ডলার। মাতৃমৃত্যুর হার হাজারে ০.৪ শতাংশ। নারীদের গড় আয়ু ৭৫। পাকিস্তান ও ভারত—এই দুই দেশের চেয়ে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নারীর সংখ্যা বেশি। বাংলাদেশে এই হার যেখানে ৬২ শতাংশ, ভারতে সেখানে ৫৭ শতাংশ। পাকিস্তান যথানিয়মে এখানেও ফেল করেছে, মাত্র ১৩ শতাংশ। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সঙ্গে প্রতিদিন নতুন করে যুক্ত হচ্ছে দেড় লাখেরও বেশি। এলএনজি টার্মিনাল, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, স্যাটেলাইট, বুলেট ট্রেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ওয়াই ব্রিজ, অগণিত হাইটেক পার্ক, পুলিশের জন্য বিশেষায়িত ব্যাংক—উন্নয়নের কত উদাহরণ আর দেব? ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের প্রধান ২০টি অর্থনীতির দেশের একটি। কিন্তু সকলি গরল ভেল। আমরা দেখতে পাচ্ছি, ঐশ্বর্য ও ভোগ হয়ে উঠেছে একান্ত সংকীর্ণ এবং ব্যক্তিগত পরিধির বিষয়। হাতি-ঘোড়ায় চড়ে নমিনেশন জমা দেওয়া তার একটি দৃষ্টান্ত। গুগল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, স্মার্টফোন, ইন্টারনেটের মতো প্রযুক্তিসুবিধা ছাড়া যাদের এক মুহূর্ত চলে না, তারাই আবার মনোনয়নপত্র জমা দিতে যান প্রস্তর যুগের যানবাহনে চড়ে। প্রযুক্তির কারণে দৈনন্দিন রুটিন বদলে গেছে আদ্যোপান্ত। প্রায় সব কিছুই বদলেছে। বদলায়নি শুধু নেতাদের সামন্ততান্ত্রিক আচরণ।

তিন.

আমরা যারা সামান্য নাগরিক, ক্ষমতার কোনো স্তরের লাগাম যাদের হাতে নেই, আমাদের ত্রুটিবিচ্যুতি, লোভ, হিংস্রতা, হিংসা বা প্রতিহিংসা কিংবা ভুলের খেসারত বড়জোর আমাদের পরিবারের সদস্যদের দিতে হয়। পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কখনো কখনো বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ক্ষমতা আমাদের নেই। আমাদের মধ্যে যারা নগর গরিব, তারা রাস্তার পাশে থুথু ফেলে, ডাস্টবিনের বাইরে ময়লা ফেলে, বেসুরো গলায় ‘হাজির বিরিয়ানি’ গেয়ে নগরের সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত করার চেয়ে বেশি ক্ষতিকারক আমরা নই। যারা নগর মধ্যবিত্ত, তারা হয়তো সিগন্যাল না মেনে, যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্ক করে, রিকন্ডিশনড গাড়ির দূষিত ধোঁয়ায় পরিবেশদূষণে ভূমিকা রেখে নগরের আরো কিছু বেশি ক্ষতি করেন। কিন্তু যেসব রাজনীতিবিদ ‘ম্যাকিয়াভেলির অনৈতিক দর্শনধারী’, যাঁরা জনগণের প্রতিনিধি বলে নিজেদের দাবি করেন, অথচ প্রতি মুহূর্তে কোনো না কোনো নেতিবাদী জনসংস্কৃতি তৈরি করেন, তাঁরা যদি নিজেদের না বদলান, তাহলে মুশকিল। তাঁরা যদি অপরিবর্তিতই থাকেন, তাহলে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ হয় না। সে ক্ষেত্রে জনগণের অস্বস্তি অসহায়ত্বে মোড় নেয়।

চার.

ক্ষমতাবানরা ঘণ্টায় ঘণ্টায় দুনিয়াকে বদলে দেওয়ার কথা বলছেন, অথচ গ্যালাপ পরিচালিত জরিপে দেখা যাচ্ছে, গত এক দশকের মধ্যে বিশ্বে সুখের মাত্রা সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। মানসিক চাপ ও উদ্বেগ বেড়েই চলেছে। বলা দরকার, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই চাপ ও উদ্বেগ যে কয়েক গুণ বেড়ে যায় নির্বাচন ঘনিয়ে এলে, তা অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। রাজনৈতিক নেতারা কি জনগণের মনের এই ভয় পাঠ করতে সক্ষম? কী ভালোই না হতো নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধির আনুষ্ঠানিক পাঠ ছাড়াই আমাদের রাজনৈতিক নেতারা যদি জনগণের এই মানসিক চাপ সহানুভূতির সঙ্গে অনুভব করে তাঁদের আচরণ বদলে ফেলতেন!

 

লেখক : কথাশিল্পী



মন্তব্য