kalerkantho


ভিন্নমত

বিদেশি বিনিয়োগে আরো গতি আনা প্রয়োজন

আবু আহমেদ

১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বিদেশি বিনিয়োগে আরো গতি আনা প্রয়োজন

প্রথমে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, তারপর আগে-পরে ইত্তেহাদ, ব্যাংকক এয়ার এবং আরো কয়েকটি এয়ারলাইনস বাংলাদেশ ত্যাগ করেছে। তারা বলেছে, তাদের পোষাচ্ছে না। তবে আমাদের কেউ তাদের ডেকে জিজ্ঞেস করেনি, কেন তারা চলে যাচ্ছে। আমরা একটা বিদেশি ব্যবসাকে আনার জন্য উৎসাহ দেখাই। কিন্তু কী কারণে সেই বিদেশি ব্যবসা চলে যাচ্ছে তা জানতে চেষ্টা করি না। বিদেশি ব্যবসার সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আসে। আর আমরাই তো বলছি, দেশের উন্নয়নের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ অতি আবশ্যক। আমার জানা মতে, এখন কোনো ইউরোপীয় এয়ারলাইনস বাংলাদেশে তাদের কোনো ব্যবসা পরিচালনা করে না, অথচ বাংলাদেশ ১৬ কোটি মানুষের দেশ, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও মন্দ নয়। এবং এ দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ বিদেশে থাকে। কেন এসব এয়ারলাইনস বাংলাদেশ ত্যাগ করল? শুধু কি ব্যবসা কম বলে? মনে তো হয় না।

তারা আমাদের অনেক কিছু পছন্দ করে না। প্রথম যেটা পছন্দ করেনি বা এখনো করে না তা হলো ঢাকা বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা। আমাদের বিমানবন্দটির কি কোনো মান আছে? বিশ্বের, এমনকি এই অঞ্চলের অন্য বিমানবন্দরগুলোর তুলনায় আমাদের বিমানবন্দরের অবস্থান কোথায়? বিদেশ থেকে এলে মনে হবে আমরা সর্বত্রই ব্যর্থ। মনটা দুঃখে ভরে যায়, যখন দেখি বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনার সংস্কৃতি এখনো সেই পুরনো আমলের। যখন লোকে ৯০ শতাংশ কাজই গায়ে খেটে হাত দিয়ে করত। কেন যাত্রীদের দুই ঘণ্টা তাঁদের লাগেজ কালেকশনের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হবে? কেন একটা এয়ারক্রাফটকে গ্রাউন্ড সার্ভিস দিয়ে উড্ডয়নের জন্য তৈরি করে দিতে দুই ঘণ্টা সময় লাগবে? এ অঞ্চলের অন্য বিমানবন্দরগুলোতে এই ধীরগতির ব্যবস্থাপনা কি আজও আছে? আমাদের বিমানবন্দর থেকে দৈনিক কয়টি এয়ারক্রাফট নামে-ওঠে? আর সে তুলনায় থাইল্যান্ডের সুবর্ণ ভূমি এয়ারপোর্টে কী পরিমাণ এয়ারক্রাফট ওঠা-নাাম করে? যাঁরা বাইরে গেছেন বা যান, তাঁরা তো দেখেই আসেন। বাইরে যাওয়া লোকদের মধ্যে বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত লোকরাও যান। তাঁরা কি দেখেন না বিশ্বের এয়ারপোর্টগুলো কিভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে? দেখেও কিছু না শিখলে সেটা অন্য কথা। আমরা যদি প্রতিজ্ঞা করে বসে থাকি যে আমরা কিছু দেখব না, কিছু শিখব না, তাহলে আমাদের কেউ ওপরে নিতে পারবে না। মনে হয়, আমরা নিচে থাকার জন্য প্রতিজ্ঞা করে বসে আছি।

একটা এয়ারপোর্ট এত নোংরা থাকবে কেন! কেন সেই এয়ারপোর্টে বাতির এত অভাব হবে? কেন এয়ারপোর্টের টয়লেটগুলো এত নোংরা থাকবে। কেন বিদেশিদের আমাদের ইমিগ্র্যান্ট অফিসারদের সামনে আধাঘণ্টা করে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। শুনেছি, এয়ারক্রাফটগুলোর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজগুলো বিমান কর্তৃপক্ষ করে। তাদের কাজ যে মানসম্পন্ন হচ্ছে না সেটা তো আমরা অনেক দিন থেকেই জানি? তার পরও ওই কাজগুলো কেন বিমানের লোকদের দ্বারা করাতে হবে? সোজা বলে দেওয়া যেতে পারে যে এয়ারপোর্টের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজগুলো অন্য কোনো প্রাইভেট কম্পানিকে দেওয়া হবে। যেখানে বাংলাদেশ বিমান নিজেই নিজকে ম্যানেজ করতে পারে না, সেখানে তাদের কর্মীদের দিয়ে কেন এসব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করানো হয়? সার্ভিস আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সেবার মান অনেক উন্নত করা যায়। বিদেশিরা তো প্রথমে আমাদের বিমানবন্দরে নামে। তাঁদের মনটা যদি তখন থেকেই খারাপ হতে থাকে, তাহলে তাঁরা কি দ্বিতীয়বার এই দেশে আসবে? অবস্থা এমনই যে দ্বিতীয়বার ঘুরতে-বেড়াতে কোনো বিদেশি পারতপক্ষে বাংলাদেশে আসে না।

আমাদের যে নিম্ন ব্যবস্থাপনার সংস্কৃতি, এই দিয়ে এ দেশে বড় পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটবে, সেটা আশা করা যায় না। থাইল্যান্ড শুধু পর্যটনশিল্প থেকেই বছরে ৫৮ বিলিয়ন ডলার আয় করে। লাওস-কম্বডিয়াও আমাদের থেকে এই খাতে অনেক বেশি আয় করে। বিমানে আসার সময়ে যেসব বিদেশি বাংলাদেশে আসছেন তাঁদের জিজ্ঞেস করলে তাঁরা বলেন, ওই ব্যবসার জন্য বা ওই অফিশিয়াল কাজের জন্য তাঁরা আসছেন। দুই দিন থেকে চলে যাবেন। এই বিদেশিরা থাকেন সিঙ্গাপুরে-ব্যাংককে-কুয়ালালামপুরে। ঢাকাকে তাঁরা থাকার জায়গা হিসেবে পছন্দ করতে পারেননি। অথচ বিমানবন্দর হওয়া উচিত ছিল বাংলাদেশের জন্যই সর্বোত্তম শো-কেইস   (Show case), আমরা সেটা করতে পারিনি।

বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে অনেক কম বিদেশি বিনিয়োগ পাচ্ছে। অথচ কাগজে-কলমে বাংলাদেশের বিদেশি বিনিয়োগ লাভের ক্ষেত্রে নীতি মন্দ নয়। তবে এ-ও আমাদের জানতে হবে যে এ অঞ্চলে অন্য দেশগুলো একই সুবিধা বিদেশিদের দিচ্ছে। আমরা সুবিধা প্রদানের কোনো কোনো ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি। যেমন—আমাদের অর্থনীতিতে গড়ে ব্যাবসায়িক ট্যাক্স হার বেশি। আমাদের আশপাশের অর্থনীতিগুলো এরই মধ্যে ব্যবসার মুনাফার ওপর ট্যাক্স হার অনেক কমিয়েছে। ট্যাক্স হার বেশি না কম সেটাও বিদেশিদের কাছে ব্যবসার ক্ষেত্রে অত বড় বিবেচ্য বিষয় নয়। তাঁরা দেখেন সহজে এবং ঝামেলাবিহীনভাবে ব্যবসা করা যায় কি না। বাংলাদেশ সেই হিসেবে পরিবেশ দিতে পারেনি। এখানে ব্যবসা করতে হয় সংগ্রাম করে। অনৈতিক অনেক লেনদেন করতে হয়, যা করতে বিদেশিরা অভ্যস্ত নন। আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজার বড়। কিন্তু এই বাজার ধরার জন্য বড় বড় বিদেশি কম্পানিগুলোর সেই প্রচেষ্টা নেই কেন? তাঁরা দেখে ব্যবসার পরিবেশ। অনেক বিদেশিই ঘুষ দিয়ে ব্যবসা করতে চান না। এখানে কাজ পেতে, উৎপাদিত পণ্যের বিপণনে, জাহাজীকরণে ঘুষ দিতে হয়। এ অবস্থায় এই অলিখিত ব্যয়কে তাঁরা কোথায় দেখাবেন? তাঁদের হেড অফিস বলে দেয়, দরকার নেই ঘুষ দিয়ে ব্যবসা করার।

বিদেশি বিনিয়োগ আসবে, যাবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো কোনো বিনিয়োগ চলে গেলে তা আমাদের মতো লোকদের ভাবিয়ে তোলে। অতি সম্প্রতি অতি পুরনো গ্লাসগোস্মিথক্লাইন বাংলাদেশ তাদের ওষুধ তৈরির কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। ফৌজদারহাটের সেই গ্লাসগো কম্পানির ওষুধ ফ্যাক্টরির ওপর থেকে তাদের সাইনবোর্ড নেমে গেছে। আমরা তখন কলেজের ছাত্র। আমি চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র ছিলাম। বাসে-ট্রেনে চট্টগ্রাম যাওয়া-আসার পথে গ্লাসগোর, সেই সঙ্গে রঙের কারখানা মন ভরে দেখতাম। ভালো লাগত, তাই দেখতাম? সবার চোখে পড়ত। সবাই দেখত। তখন বিদেশি বিনিয়োগ বা গ্লাসগো কী করে এসব বুঝতাম না। কিন্তু যখন বুঝলাম তখন প্রশ্ন করতে শুরু করলাম বাংলাদেশে শুধু গ্লাসগো আছে কেন, ফাইজার-সিবা গেইগি এসব কম্পানির ওষুধও আমরা সেবন করতাম। ওই সব কম্পানি গেল কোথায়? ওরা বেচে চলে গেছে অনেক আগেই। যায়নি গ্লাসগো। আজকে গ্লাসগোও সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারা এই দেশে আর ওষুধ প্রস্তুত করবে না। তাদের ব্যবসার মধ্যে অবশিষ্ট আছে হরলিকস নামের পাউডার বিক্রি করা, আর দাঁতের মাজন পেপসোডাইন টুথপেস্ট বিক্রি করা। এই বাণিজ্যও তারা এই দেশে কত দিন করে, তা দেখার বিষয়।

আরো কয়েকটি বিদেশি ওষুধ কম্পানি বর্তমানে বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এগুলোর কোনোটিই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। একমাত্র গ্লাসগোস্মিথক্লাইনই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ছিল। গ্লাসগোস্মিথক্লাইনের শেয়ার এই দেশের অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী ধারণ করতেন। যখন খবরটি এলো যে গ্লাসগো তার ওষুধ প্রস্তুতের ব্যবসাটা বাংলাদেশে বন্ধ করে দিচ্ছে, তখন এসব বিনিয়োগকারীরা বড় আঘাত পেলেন, গ্লাসগো কম্পানির শেয়ারমূল্য ঢাকার শেয়ারবাজারে অনেক পড়ে গেল। একসময় এই শেয়ার বিক্রি হতো এক হাজার ৬০০ টাকায়, আর আজকে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ১০০ টাকার নিচে। যাঁরা এক হাজার ১০০ টাকায় কিনছেন তাঁরাও আশা-নিরাশার মধ্যে আছেন। তাঁরা ভাবেন, কখন এই কম্পানি পুরো ব্যবসা গুটিয়ে বাংলাদেশ থেকে চলে যায়।

আমরা বিদেশি বিনিয়োগ আনার জন্য কতই না আহ্বান-অনুরোধ জানাই। কিন্তু পুরনো বিদেশি বিনিয়োগ কেন বাংলাদেশ থেকে চলে যাচ্ছে, সে ব্যাপারে মাথা ঘামাই না। আমাদের অর্থনীতি ভালো মুনাফা দেয় সত্য, তবে এই অর্থনীতিতে সত্ভাবে ব্যবসা করা সত্যি কঠিন। ব্যবসা সহজীকরণের সূচকে আমরা তলানিতে। প্রতি পদে পদে বাধা। কিছু বাড়তি ব্যয় না করলে কোনো কিছুই যেন এগোয় না। ব্যবসা সম্পর্কিত বিরোধগুলো এ দেশে সহজে শেষ হয় না। অনেক বছর লেগে যায়। কিন্তু যেখানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক, সেখানে আমরা একের পর এক বাধা সৃষ্টি করে ব্যবসার পরিবেশকে সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন করে তুলছি।

 

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



মন্তব্য