kalerkantho


অভিবাসী স্রোত এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রশ্ন

জন ওয়াইট

১৮ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মধ্য আমেরিকা থেকে অভিবাসীদের যে স্রোত যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে তাতে বোঝা যাচ্ছে, পুরনো বিশ্বের পতন ঘটছে আর জন্ম নিচ্ছে নতুন সংগ্রাম। প্রাচীন বিশ্ব আমাদের অনেক কিছু শেখাতে পারে। এসবের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো সংঘাত,  সামাজিক ধস আর চরম দারিদ্র্যের জেরে সৃষ্ট অভিবাসীদের স্রোত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর সাম্রাজ্যেরও পতন ঘটাতে পারে।

রোমের কথাই ধরুন। রোমান সেনাদল হাজার বছর ধরে প্রাচীন বিশ্বকে অধিকার করে রেখেছিল। সিজার, পম্পেই, অগাস্তাস, নিরোর মতো প্রসিদ্ধ রোমান সম্রাটদের নাম শত শত বছর পরও এখনো ভয়মিশ্রিত সমীহ আর বিস্ময় জাগায়।

ইতালীয় উপদ্বীপ থেকে পশ্চিম ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিস্তৃত রোমান সাম্রাজ্য ইতিহাসের পাতা থেকে একেবারে মুছে যাবে—সে সময় এ কথা বলা বোধ হয় বড্ড বেশি পাগলামি হয়ে যেত; যদিও তেমনটিই ঘটেছে। ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে জার্মান উপজাতিদের বর্বর হামলা পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়েছিল। আর তাতে একটা বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল, বিত্তে ও বাহুবলে পরাক্রমশালী হয়েও কোনো সাম্রাজ্য চিরকাল টিকে থাকতে পারে না।

দাসত্ব, খাজনা আর লুটতরাজ ছিল রোমের ভিত্তি; যেভাবে চলছিল তাতে মনে হওয়াই স্বাভাবিক ছিল যে তারা অনতিক্রম্য। কিন্তু রোমের ধ্বংস ছিল অনিবার্য। রোমের অধীনে লাখো মানুষ দারিদ্র্য আর চরম পঙ্কিলতার মধ্যে বাস করত। বিপরীতে অভিজাতদের সম্পদ আর জাঁকজমক কদর্য ও অসহনীয় হয়ে উঠেছিল।

 

যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি জুলুম, খবরদারি আর শোষণ, সেটার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠবেই। প্রতিরোধ দমনের জন্য শক্তি প্রয়োগ করা হলে তা আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন জন্ম নেয় অস্থিতিশীলতা। এ হলো সেই অস্থিতিশীলতা, যা গণ-আন্দোলনের জন্ম দেয়।

রোমের পতন এভাবেই ঘটেছিল। আজকের দিনেও এর লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। অভিবাসী সংকট ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং একটু একটু করে পশ্চিমা আধিপত্যবাদের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে। ২০১৫ সালে ইউরোপে যে অভিবাসী সংকট দেখা দিয়েছে তার সুরাহা এখনো হয়নি। অভিবাসীর স্রোত কী ঘটাতে পারে, এটা তার উদাহরণ। মধ্য আমেরিকা থেকে তেমনই এক অভিবাসী স্রোত এখন যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তের দিকে ছুটছে।

এবার আমরা বরং অভিবাসীবিষয়ক যড়যন্ত্র তত্ত্বের দিকে মনোযোগ দিই। সংখ্যায় ক্রমেই বাড়তে থাকা এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্ব শুধু উন্মত্ততা বাড়াচ্ছে, সচেতনতা নয়। অভিবাসীদের এ স্রোত জর্জ সরোসের কারসাজি বা ডেমোক্রেটিক পার্টির চাতুরী—এমন ধারণা ভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিকায়ন আর অর্থনৈতিক আধিপত্যের কারণে মধ্য আমেরিকার জনগণ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে অস্বাভাবিক দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। তাদের এ দুর্ভোগ অস্বীকার করার মানে হলো গোটা বিষয়ের গুরুত্ব অস্বীকার করা।

হণ্ডুরাসে এই অভিবাসী স্রোতের উৎপত্তি, ২০০৯ সালে সেখানে অভ্যুত্থান হয়েছিল। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বামপন্থী সরকারের পতন হয়েছিল ওই অভ্যুত্থানে। নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল রোমিও ভাসকুয়েজ ভেলাসকুয়েজ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার ফোর্ট বেনিংয়ের কুখ্যাত স্কুল অব আমেরিকাস (বর্তমানে ওয়েস্টার্ন হেমিস্ফিয়ার ইনস্টিটিউট ফর সিকিউরিটি কো-অপারেশন)-এর স্নাতক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার হাজার হাজার সামরিক ও নিরাপত্তা সদস্যকে এ প্রতিষ্ঠানে নির্যাতন, গুপ্তহত্যা আর নিপীড়নের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জ্ঞাতসারে ঘটা সেই অভ্যুত্থানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ স্টিফেন জুনস বলেন, ওই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ভয়াবহ নিপীড়ন আর হত্যাকাণ্ডের সূচনা হয়েছিল, যা থেকে বাঁচতে পালিয়েছিল হাজার হাজার লোক।

জুনস অবশ্য ওই ঘটনার জন্য সরাসারি ওয়াশিংটনকে দায়ী করার সাহস দেখাননি। হণ্ডুরাসের বৈধ প্রেসিডেন্টকে পুনর্বহাল করার আহ্বান জানাতে ওয়াশিংটনের গড়িমসি দেখে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, এটা হলো অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন জাতিকে পদানত রাখার জন্য শতকের পর শতক ধরে পরিচালিত এজেন্ডা।

উত্তরের পথে ওয়াশিংটন অভিমুখে যে অভিবাসী স্রোত বইছে, সেটাকে বহিরাক্রমণ অ্যাখ্যা দিয়ে সীমান্তে পাঁচ হাজার সেনা মোতায়েন করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্মরণাতীতকাল থেকেই হোয়াইট হাউসের প্রত্যেক কর্তা অবিচারের উদাহরণ স্থাপন করেছেন, তবে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে রোমান দার্শনিক সেনেকার উদ্ধৃতি যেন বাস্তব হয়ে উঠেছে—‘লোভের কাছে সবকিছু বড্ড তুচ্ছ।’

সম্পদ, ক্ষমতা, মর্যাদা আর খ্যাতির লোভে ট্রাম্প যা করে চলেছেন, তা অসুস্থ একটি সমাজ ও তার সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিচায়ক। ট্রাম্প সমাজের প্রতিভূ। এ মূল্যবোধই অভিবাসী স্রোত সৃষ্টির জন্য দায়ী, এর কারণেই রোমের মতো দখলদার সাম্রাজ্যের বিনাশ ঘটবে সময়ের পরিক্রমায়।

যত বড় পরিসরেই প্রচারণা চালানো হোক না কেন এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, অভিবাসী স্রোতে যারা আছে তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দরিদ্র ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর মিল অনেক বেশি; নিজ দেশের শাসক শ্রেণির সঙ্গেও তাদের এতটা মিল নেই। আমেরিকা মহাদেশ এমনকি গোটা বিশ্বের ক্ষেত্রেই এটা সত্য।

লেখক : কলাম লেখক, রাজনীতি বিশ্লেষক

সূত্র : আরটি অনলাইন

ভাষান্তর : শামসুন নাহার



মন্তব্য