kalerkantho

স্মরণ

চেতনায় ভাসানী

মযহারুল ইসলাম বাবলা

১৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



চেতনায় ভাসানী

আজ ১৭ নভেম্বর। ১৯৭৬ সালের এই দিনে এ দেশের অগণিত মানুষকে শোকবিহ্বল করে চিরবিদায় নেন মেহনতি, শ্রমজীবী, নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের কাণ্ডারি, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে আমৃত্যু আপসহীন সংগ্রামী নেতা মওলানা ভাসানী। তাঁর মৃত্যুর ৪২ বছর পূর্ণ হলো। সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে নিম্নবিত্ত কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। শৈশবেই পিতৃ-মাতৃ স্নেহ বঞ্চিত—অনাথ চেগা মিয়া চাচার আশ্রিত এবং চাচাই তাঁকে প্রতিপালন করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে তিনি বেশিদূর এগোতে পারেননি। পরে ভর্তি হন মাদরাসা শিক্ষায়। ভারতের দেওবন্দ থেকে শিক্ষা শেষ করার পর হতে পারতেন মাদরাসা শিক্ষক, মসজিদের পেশ ইমাম-মুয়াজ্জিন, ফতোয়াবাজ মাওলানা কিংবা ধর্মভিত্তিক দল ও মতের সাম্প্রদায়িক নেতা। অথচ তিনি এর কোনোটি হননি। তাঁর শিক্ষার বৃত্ত ও সময়কে অতিক্রম করে মানবমুক্তির সংগ্রামে যুক্ত হয়েছিলেন।

ব্রিটিশ ভারতে ইংরেজ শাসকদের অনুগত, আজ্ঞাবহ সামন্ত জমিদারবিরোধী নানা কর্মকাণ্ডের কারণে নিজ পৈতৃক ভূমি থেকে বিতাড়িত চেগা মিয়ার নতুন আশ্রয় আসামের ধুবড়ির নিকটবর্তী ভাসানচর। সেখানেও সামন্তবিরোধী লড়াই থেমে যায়নি। ভাসানচরের দারিদ্র্যপীড়িত কৃষক-শ্রমজীবী মানুষদের সংগঠিত করে জোতদার-সামন্তদের বিরুদ্ধে সফল আন্দোলনে চেগা মিয়া হয়ে ওঠেন আবদুল হামিদ খান ভাসানী। সেই থেকে চেগা মিয়া নামটি ছাপিয়ে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী নামে পরিচিতি লাভ করেন। আসাম প্রদেশ মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর পূর্ব বাংলায় ফিরে আসেন এবং দ্রুত মোহ ভঙ্গে মুসলিম লীগ ত্যাগ করে তাঁরই নেতৃত্বে গঠিত হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের অপশাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে আওয়ামী মুসলিম লীগের লড়াই-সংগ্রামে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানীই নেতৃত্ব দিয়েছেন। জেল-জুলুমসহ নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেছেন, তবে আপস-সমঝোতার নজির রেখে যাননি। আন্দোলনেই মুক্তি সম্ভব, অন্য কোনো উপায়ে নয়—এই সত্যটি তিনি সারা জীবন ধারণ করেছেন।

১৯৫৭ সালেই বক্তৃতা মঞ্চ থেকে পাকিস্তানি পক্ষ ত্যাগে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম।’ ১৯৭১-এর সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামো থেকে পৃথক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম। কিন্তু এই স্বাধীনতা সব মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সে কারণে স্বাধীন দেশেও তাঁর সংগ্রাম থেমে যায়নি।

মওলানা ভাসানীর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে মেহনতি মানুষের প্রকৃত শত্রুকে তিনি যথার্থই চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদবিরোধী তাঁর অনড় অবস্থান সে প্রমাণই দেয়। বৈষম্যপূর্ণ সমাজ ও রাষ্ট্রের অবসানে সারা জীবন লড়েছেন। আত্মসমর্পণ করেননি।

সামরিক শাসনামলে মানুষের সব গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হয়েছিল। জনমত সংগঠিত করার উদ্দেশ্যেই ভাসানী ফারাক্কা লংমার্চের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অনেকেরই ধারণা, সামরিক শাসকের স্বার্থরক্ষায় ফারাক্কা মিছিল করেছিলেন তিনি। এটা মোটেও সত্য নয়। ফারাক্কা মিছিলকে উপলক্ষ করে জনসম্পৃক্তি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। সামরিক শাসনামলে জনগণের কাছে যাওয়ার এ ছাড়া বিকল্প উপায় তখন ছিল না। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর দেশকে পুঁজিবাদী ধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার চক্রান্ত বাস্তবায়নের একমাত্র অন্তরায় ছিলেন মওলানা ভাসানী। তাই ভাসানীর দল ভাঙার কৌশল অবলম্বন করে, ভাসানীকে একা এবং একঘরে করার কুমতলব আঁটা হয়েছিল।

১৭ নভেম্বর ১৯৭৬ সম্ভবত রাত সোয়া ৮টায় ভাসানীর মৃত্যুসংবাদ শোনামাত্র ছুটে যাই ঢাকা মেডিক্যালের তিনতলার পরিচিত কেবিনে। করিডরে উত্সুক মানুষ আর ভাসানীর অনুসারীদের ভিড়। ভিড় ঠেলে কেবিনের দরজায় ধাক্কা দিই। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। দরজা খোলামাত্র ভেতরে ঢুকে দেখি চিরশয়ানে নিথর ভাসানী। গণমাধ্যমের ফটো সাংবাদিকদের ছবি তোলার হিড়িক। রাত ১০টায় ঢাকা মেডিক্যাল চত্বর লোকে লোকারণ্য। সামরিক শাসনের সেই ক্রান্তিকালে অত রাতে কেউ ঘরের বাইরে থাকার সাহস করত না। কিন্তু সেদিনের রাতটি হাজারো মানুষের সরব উপস্থিতি-আহাজারিতে ভিন্ন মাত্রা পেয়েছিল। ভোরের আগে ট্রাক এলো। মরদেহ এবং বরফের চাঁই তুলে রওনা হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে। ভাসানীর মরদেহ রাখা হলো টিএসসির অডিটরিয়ামের পূর্ব-উত্তর কোণে। অন্ধকার কেটে ভোরের আকাশে আলো ফোটামাত্র নেমে আসে অগণিত মানুষের ঢল। শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের লাইন দ্রুত দীর্ঘতর হয়ে যায়। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে; কিন্তু দর্শনার্থী কমছে না। ক্রমেই মানুষের ঢল বাড়ছে। সকাল সাড়ে ৯টায় প্রয়াত চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবিরের সঙ্গে এলেন প্রয়াত উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকা। আলমগীর কবিরের সীমানা পেরিয়ে ছবির সংগীতের কাজে তখন তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। ভূপেন হাজারিকা টিএসসির উত্তর-দক্ষিণের লম্বা বারান্দার মাঝামাঝিতে অনেকক্ষণ থাকায় তাঁর সঙ্গে আগ বাড়িয়ে কথা বলেছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম ভাসানী সম্পর্কে। তিনি আসামের অধিবাসী। মওলানা ভাসানী দীর্ঘকাল আসামে ছিলেন। ভাসানী ও তাঁর রাজনীতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ভূপেনের ছিল বলেই অকপটে বলেছিলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভাসানীর অনড় অবস্থানের কারণে তাঁর প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধার কথা। ভারতবর্ষের বড়মাপের শীর্ষস্থানীয় জাতীয়তাবাদী নেতাদের থেকে ভাসানীকে সহজে চেনা যায় তাঁর রাজনীতির কারণেই। মেহনতি-শোষিত মানুষের মুক্তিসংগ্রামে আজীবন লড়েছেন। বিচ্যুত হননি কখনো। মওলানা ভাসানী সম্পর্কে ভূপেনের মূল্যায়ন উপমহাদেশের প্রখ্যাত জাতীয়তাবাদী নেতাদেরও ছাড়িয়ে যায়।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল জনসমুদ্রে জানাজা শেষে ট্রাকযোগে লাশ হেলিপোর্টে রওনা হলে আমরা গাড়িতে রওনা হলাম সন্তোষ অভিমুখে। সন্তোষে দাফন শেষে শেষ বিকেলে আবার ঢাকার পথে পাড়ি দিই। মওলানা ভাসানী শুধু সাম্রাজ্যবাদবিরোধীই ছিলেন না, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ়তায় কিভাবে লড়তে হয় সে শিক্ষাও দিয়ে গেছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরি। কেননা আগামী প্রজন্মের পক্ষেই সম্ভব ভাসানীর আজন্ম আকাঙ্ক্ষিত শ্রেণিহীন-বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়া। তরুণরাই যে আমাদের ভরসার কেন্দ্রবিন্দু।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

 



মন্তব্য