kalerkantho


মনের কোণে হীরে-মুক্তো

সংখ্যার আধিক্যে প্রকল্পের অর্থায়নপ্রক্রিয়া কাতরাচ্ছে

ড. সা’দত হুসাইন

১৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সংখ্যার আধিক্যে প্রকল্পের অর্থায়নপ্রক্রিয়া কাতরাচ্ছে

দেশের প্রবৃদ্ধি তথা উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। বিনিয়োগ সরকারি ও বেসরকারি—এই দুই খাতে হয়ে থাকে। আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমি সরকারি খাতে অন্তর্ভুক্ত করেছি। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে সরকারের প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা নিজেদের বুদ্ধি-বিবেচনা অনুযায়ী লাভ করার উদ্দেশ্যে সম্পদ বিনিয়োগ করেন। যে ব্যবসায়ে বা প্রকল্পে আয়-উপার্জন তথা লাভের সম্ভাবনা নেই, সে প্রকল্পে সরাসরি তাঁরা বিনিয়োগ করেন না। ব্যাবসায়িক বা আর্থিক প্রকল্পে ক্ষতি হলে বিনিয়োগকারীকে এর খেসারত দিতে হয়। তাঁর সম্পদহানি হয়, আয়-উপার্জন কমে যায়; এমনকি তাঁর পক্ষে জীবনধারণও কষ্টকর হয়ে পড়তে পারে। দেউলিয়াত্ব বরণ করে পথে বসে যাওয়ার আশঙ্কাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ভুলে এমন ঘটনা ঘটে যাওয়ার সংখ্যা খুব কম হলেও তা শূন্যের কোঠায় নয়।

এমন ব্যবস্থা সরকারি প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সরকারের অর্থনৈতিক বা বিনিয়োগ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য লাভ অর্জন নয়। জনসাধারণের কল্যাণ, সামাজিক উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিধান সরকারি কর্মকাণ্ডের মূল উপজীব্য। সরকারের আয় ব্যক্তি খাতের মতো সীমিত নয়, সরকারি আয়ের উৎস সম্প্রসারণযোগ্য। সেহেতু সরকারের দেউলিয়া হয়ে পড়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। তবে আর্থিক দিক থেকে টানাটানি বা বিপাকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তেমন অবস্থা ঘটলে সরকার জনগণের ওপর করের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এতে সরকারের জনপ্রিয়তা কমে যায়, তবে বাড়তি আয়ের সংস্থান হয়। একই সঙ্গে সরকার তার খরচ কমানোর জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এতেও কাজ না হলে সরকার বিভিন্ন দাতা দেশ, আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা অথবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মহাজনী প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করে। এভাবে অন্তত কয়েক বছর, এমনকি ১০ থেকে ১৫ বছর সরকার তার কর্মকাণ্ড চালিয়ে নিতে পারে। এরই মধ্যে হয় দেশের মানুষের প্রতিরোধ ও আন্দোলনের মুখে সরকারের পরিবর্তন ঘটে। অথবা বিদেশি তথা আন্তর্জাতিক মুরব্বিদের চাপে সরকার তার আচার-আচরণ, সিদ্ধান্ত বদলিয়ে সমস্যা-সংকট উত্তরণের প্রচেষ্টা চালায়। সাধারণত সাময়িকভাবে হলেও তারা সফল হয়। আজ পর্যন্ত ভুল বিনিয়োগ বা ভুল প্রকল্পে সম্পদের অপব্যবহার করে কোনো দেশ বিলুপ্ত হয়নি, যদিও সরকার বদলের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে।

বাংলাদেশে সরকারি প্রকল্পে বিনিয়োগের অর্থ জাতীয় বাজেট থেকে নির্বাহ করা হয়। প্রতিবছর পার্লামেন্ট দেশের জন্য যে বাজেট পাস করে, তার দুটি অংশ থাকে—রাজস্ব বাজেট  (Revenue Budget) ও উন্নয়ন বাজেট (Development Budget)| রাজস্ব বাজেটের বরাদ্দ থেকে সরকার নিত্যদিনের (মাসের) আবর্তক-অনাবর্তক খরচ বহন করে। এ খরচকে বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করা হয় না। ভবিষ্যতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উৎপাদন বা আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিনিয়োগ করা হয়। সরকারি খাতে বিনিয়োগ সাধারণত প্রকল্পের মাধ্যমে করা হয়। কী উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করা হবে, জনসাধারণ সে বিনিয়োগের ফলে কিভাবে উপকৃত হবে, বিনিয়োগে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয়িত হবে, সে অর্থের সংস্থান কিভাবে হবে, কত বছরে বিনিয়োগ কর্মসূচি হবে—এ সব কিছু প্রকল্প দলিলে বিধৃত থাকে। আরো উল্লেখ করা হয় যে এই বিনিয়োগের ফলে পরিবেশের ওপর কী প্রভাব পড়বে, কোনো গোষ্ঠী এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না, এমনকি জীববৈচিত্র্য এবং বিশেষ কোনো প্রাণিকুল ক্ষতিগ্রস্ত বা বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না, তা-ও প্রকল্পে উল্লেখ করতে হয়। এককথায় বিনিয়োগসংক্রান্ত সব প্রাসঙ্গিক তথ্য, বিশেষ করে আয়-ব্যয়, লাভ-ক্ষতির হিসাব প্রকল্প দলিলে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে।

আবর্তক-অনাবর্তক কর্মকাণ্ডে বিবেচ্য বছরে মোট কত টাকা ব্যয়িত হবে, তা যেমন রাজস্ব বাজেটে বর্ণিত থাকে, তেমনি সরকারি খাতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ওই বছরে মোট কত টাকা ব্যয়িত হবে, তা উন্নয়ন বাজেটে নির্দিষ্ট করা থাকে। স্বাভাবিকভাবে এসব কর্মকাণ্ড সেক্টরওয়ারি, মন্ত্রণালয়ওয়ারি বিন্যস্ত থাকে। বছরের সব উন্নয়ন প্রকল্পের তালিকা এবং এসব প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দকৃত অর্থের নির্দেশিকাকে বলা হয় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা

 Annual Development Program (ADP)| সাধারণত দেশের উন্নয়নের জন্য পাঁচ বছর, ১০ বছর বা ২০ বছর ব্যাপ্ত, রূপকল্প প্রণয়ন করা অনেক দেশে অনুসরণীয় প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে পাঁচ বছর স্থায়ী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, ২০ বছর মেয়াদি পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। সম্প্রতি শতবর্ষের উন্নয়নের আভাসধারণকারী ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা’ উপস্থাপন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় বা সংস্থা কর্তৃক প্রণীত প্রকল্পকে নিদেনপক্ষে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার উদ্দেশ্যে এবং কাঠামোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হয়। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দলিলে দেশের উন্নয়নের দর্শন, জনসাধারণের প্রয়োজন ও প্রত্যাশা, বর্তমান এবং পরবর্তী প্রজন্মের স্বার্থ সংরক্ষণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে অনুসৃতব্য কৌশলগুলো বিধৃত রয়েছে। তাই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার নির্দেশনা উপেক্ষা করে বা এর পরিপন্থী কোনো প্রকল্প গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হবে না। এ ধরনের প্রকল্প শুরুতেই পরিত্যাজ্য বিবেচিত হওয়ার কথা।

একটি প্রকল্প গ্রহণযোগ্য কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ এবং রাজনীতিক নিয়োজিত রয়েছেন। সুনির্দিষ্ট ছকে মোটামুটি পারদর্শী কর্মকর্তা বা উপদেষ্টারা প্রকল্প প্রস্তুত করেন। মন্ত্রণালয় বা সংস্থার নির্দিষ্ট কর্মকর্তা অথবা কমিটি প্রকল্প দলিল পরীক্ষা করেন। তাঁরা প্রথমেই দেখেন, মূল্যায়নের জন্য যেসব তথ্য প্রয়োজন, তা প্রকল্প দলিলে যথাযথভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে কি না। অর্থাৎ তাঁরা দেখতে চেষ্টা করেন, প্রকল্প দলিলটি সম্পূর্ণ এবং নিখুঁত হয়েছে কি না। এখান থেকেই সত্যিকারভাবে প্রকল্পের মূল্যায়ন শুরু হয়। চাহিত তথ্যাদি সংযোজন করে প্রকল্প দলিলটি রচিত হয়ে থাকলে তাঁরা মূল্যায়নের পরবর্তী পর্যায়ে যান। এখানে তাঁরা দেখতে চান যে প্রকল্পের উদ্দেশ্য এবং প্রতিশ্রুত ফল পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। এ পর্যায়ে ধরে নিচ্ছি যে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় রাষ্ট্রের মূল দর্শন এবং ভাবাদর্শের যথার্থ প্রতিফলন ঘটেছে। যদি প্রকল্পের উদ্দেশ্য গ্রহণযোগ্য হয়, তখন প্রশ্ন আসবে—প্রকল্পের অর্থ সংস্থানের প্রস্তাবিত ব্যবস্থা বাস্তবসম্মত কি না। এর জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রয়েছে কি না। এরপর দেখা হবে এর অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা কতটুকু। প্রকল্পের লাভ-ক্ষতির হিসাব আশাপ্রদ হলে তবেই এর গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা করা যেতে পারে। যদি প্রকল্পের অর্থায়ন সহজসাধ্য না হয়, তবে প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে যে প্রকল্পটি কয়েক বছর পর শুরু করা হলে দেশের বা সাধারণ মানুষের কোনো বড় রকমের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কি? যদি ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে, তবে প্রকল্পের অনুমোদন দু-এক বছর বিলম্বিত হতে পারে।

সূচনা পর্যায়ে যদি খুঁটিনাটি বিষয়গুলো প্রগাঢ় পর্যালোচনা করে প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা মূল্যায়ন করা হয়, তবে পরবর্তী পর্যায়গুলোর কাজ অনেকটা সহজ হয়ে যায়। প্রকল্পের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা হলে মন্ত্রী ও সচিব হয়তো তা শোধরানোর নির্দেশ দিতে পারেন অথবা প্রকল্প প্রস্তাবটি নাকচ করতে পারেন। প্রকল্প প্রস্তাবটি ওপরের স্তরে পাঠালে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সাধারণ নিয়মে এটি নাকচ করবে। অসতর্কতাবশত প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হলে দেশ তথা জনসাধারণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন এবং সর্বোচ্চ অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি  (ECNEC) যদি সময় নিয়ে, ধৈর্যসহকারে প্রকল্পের বিভিন্ন দিক প্রগাঢ়ভাবে পর্যালোচনা না করে সহজ উপায়ে প্রকল্প অনুমোদন করে দেয়, তবে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক। ভুল প্রকল্প অনুমোদনের অর্থ হচ্ছে, দেশের সম্পদ বিনষ্ট করা, দেশের মানুষের ওপর ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড চাপিয়ে দেওয়া। এরূপ ভুলের খেসারত বিপুলভাবে দিতে হবে পরবর্তী প্রজন্মকে। প্রকল্পের ফলাফল দীর্ঘস্থায়ী। তাই ভুল প্রকল্পের কুফল টানতে হবে পরবর্তী প্রজন্মকেও।

বাস্তবে কিন্তু অনেক নিকৃষ্ট মানের অগ্রহণযোগ্য এবং ক্ষতিকর প্রকল্প অনুমোদন লাভ করে। এরূপ অনুমোদন শুধু যে মন্ত্রণালয় বা পরিকল্পনা কমিশন দিয়ে থাকে তা নয়, সর্বোচ্চ অনুমোদনকারী ফোরাম অর্থাৎ একনেকে এরূপ প্রকল্প অনুমোদন পায়। সাধারণ পাঠকের মনে নিশ্চয়ই খটকা লাগবে যে এত শিক্ষিত, পারদর্শী নির্বাহী এবং অভিজ্ঞ, দায়িত্বশীল রাজনীতিক কিভাবে এত নিকৃষ্ট মানের প্রকল্প অনুমোদন করতে পারেন। এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ক্ষমতার বিন্যাস এবং গতি-প্রকৃতির ওপর মনোনিবেশ করতে হবে।

প্রতিটি প্রকল্পের সঙ্গে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, শ্রেণি বা চক্রের স্বার্থ জড়িত রয়েছে। শ্রেণি ও গোষ্ঠীর আকার ও চরিত্রভেদে কখনো প্রকল্পের উপকারভোগীদের আকার সম্প্রসারিত হলে প্রকল্পের সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। উপকারভোগীদের সংখ্যা বিপুল হলে এটি জনবান্ধব বা জনস্বার্থে গৃহীত প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, এ ধরনের প্রকল্পের সংখ্যা খুব বেশি নয়। বেশির ভাগ প্রকল্প ব্যক্তিস্বার্থে কিংবা গোষ্ঠীস্বার্থে নেওয়া হয়। রাজনৈতিক সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে, এসব প্রকল্পের পেছনে কাদের স্বার্থ জড়িত, কিভাবে জড়িত। এসব উপকারভোগী স্বার্থবাদীগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় একটা নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, যার মাধ্যমে তারা প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যায়। এদের সহজে বাধা দেওয়া যায় না। মাঝেমধ্যে এরা রীতিমতো অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে।

অনেক সময় দেখা যায়, শুরু থেকেই প্রকল্পের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে কেমন যেন একটা গাছাড়া ভাব থাকে। যে কর্মকর্তা প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ করেন, তিনি যেন ধরেই নেন যে প্রকল্পটি পাস করতে হবে; এর ভুলভ্রান্তি চিহ্নিত না করে তিনি প্রকল্পটি পাস করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়ে দেন। তাঁরা মনে করেন, নিম্নপর্যায়ে যেহেতু প্রকল্পটি পরীক্ষা করা হয়েছে, তাই তাঁদের পর্যায়ে আর পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই। অনেকটা না দেখেই তাঁরা প্রকল্প প্রস্তাবটি পরবর্তী ধাপে পাঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এভাবে প্রকল্প প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে চলে যায়। সেখানেও অনেক সময় তীক্ষ সতর্কতা নিয়ে প্রকল্প প্রস্তাব পরীক্ষা করা হয় না। যদি কদাচিৎ পরীক্ষান্তে কিছু বিরূপ মন্তব্য করা হয়, তবে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তাতে আপত্তি তোলেন। কারণ তত দিনে প্রকল্পের সঙ্গে তাঁদের শ্রম ও সমর্থনী প্রবণতা জড়িয়ে গেছে। প্রকল্পটি পাস হলে তাঁরা কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাবেন সে চিন্তা তাঁদের মাথায় এসে গেছে। সম্ভাব্য উপকারভোগীরা তত দিনে সক্রিয় হয়েছে। তারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে তদবিরের ঝুড়ি নিয়ে হাজির, পরিকল্পনা কমিশন পীড়াপীড়ি করলে মন্ত্রণালয় দায়সারা কিছু সংশোধন করে আবার প্রস্তাবটি কমিশনে পাঠিয়ে দেয়। কমিশনও এবার হালকাভাবে পরীক্ষা করে প্রকল্পটি অনুমোদনের লক্ষ্যে এগিয়ে যায়। ত্রুটিযুক্ত প্রকল্পটি একসময় চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে।

প্রকল্পটি যখন একনেকের সভায় অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে, ততক্ষণে স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহল ভয়ানক তৎপর হয়ে উঠেছে। এ প্রকল্প পাস হলে কিভাবে এর বাস্তবায়নকাজে তারা জড়িত হবে এবং তাতে তাদের কী ধরনের বৈষয়িক সুবিধা হবে সে সম্পর্কে তারা পুরো হিসাব-নিকাশ করেছে। সরকারের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের হয় সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে অথবা তাঁদের আশপাশের লোকের মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যাপারে উৎসাহী করে ফেলেছে। তারা নিশ্চিত যে সভায় উপস্থাপন করলেই প্রকল্পটি পাস হয়ে যাবে। তা-ই হয়েছে।

পরিস্থিতির স্বেচ্ছা-অনুভূত স্পর্শকাতরতা এবং রাজনৈতিক কৌশলের কারণে সরকারের নীতিনির্ধারণীগোষ্ঠী প্রকল্প অনুমোদনের পক্ষে এক ধরনের বাধ্যবাধকতা বোধ করে। তখন সময় না দিয়ে, সতর্কতা অবলম্বন না করে, প্রকৃতপক্ষে কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যালোচনা না করেই একনেক সভায় গাদায় গাদায় প্রকল্প পাস করা হয়। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত নিচের খবরটিতে বাস্তবতা মুখর হয়ে উঠেছে।

প্রতি ছয় মিনিটে এক প্রকল্প পাস

‘প্রতি ছয় মিনিটে একটি করে প্রকল্প পাস করল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। গতকাল রবিবার একনেক সভায় আগের সব রেকর্ড ভেঙে মোট ৩৯টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে শুরু হয়ে একনেক বৈঠক শেষ হয়েছে সন্ধ্যা ৭টায়। সে হিসাবে চার ঘণ্টায় বা ২৮০ মিনিটের মধ্যে প্রতি ছয় মিনিটে গড়ে একটি করে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে গত ১০ বছরে গতকাল একনেক সভায় সবচেয়ে বেশি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হলো। সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, একনেক সভায় ৮৬ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে মোট ৩৯টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে জোগান দেওয়া হবে ৬৬ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। বাস্তবায়নকারী সংস্থা থেকে আসবে ৩১৩ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ পাওয়া যাবে ১৯ হাজার ৯০৮ টাকা।’ (কালের কণ্ঠ, ৫ নভেম্বর ২০১৮)

তীক্ষ সতর্কতা অবলম্বন না করে জাতীয় পর্যায়ে প্রকল্প অনুমোদন করা হলে দেখা যাবে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। এখানে হিসাব-নিকাশ করার প্রয়োজন রয়েছে। যেসব প্রকল্প অনুমোদন করা হয়, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে মোট কত টাকা লাগবে, তা হিসাব করে দেখতে হবে। আমরা ধরে নিতে পারি যে প্রকল্পের গড় আয়ু পাঁচ বছর। তাহলে অনুমোদিত প্রকল্পের জন্য বছরে লাগবে কত টাকা। এভাবে বছরে যদি মোট ১০ লাখ কোটি টাকার প্রকল্প পাস করা হয়, তবে তার বার্ষিক সংশ্লেষ দুই লাখ কোটি টাকা। আগের বছরগুলোর জমানো প্রকল্পের জন্য বর্তমান বছরে খরচ লাগবে ধরা যাক তিন লাখ কোটি টাকা। তাহলে বছরের এডিপির আকার হতে হবে পাঁচ লাখ কোটি টাকা। এত টাকার সংস্থান করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। অতএব অনুমোদিত অনেক প্রকল্পে নামমাত্র (প্রায় শূন্য) বরাদ্দ দেওয়া হবে। এডিপির, বিশেষ করে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হবে অসম্পূর্ণ, অসন্তোষজনক। প্রকল্প অনুমোদনের অনুশীলন হয়ে পড়বে পুরো অর্থহীন গোঁজামিলের শামিল। সম্ভাব্য উপকারভোগীদের কূটকৌশলে বুঝ দেওয়ার নামান্তর মাত্র।

এভাবে বছরের পর বছর চলে আসছে প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন ও বাস্তবায়নের পাশা খেলা। প্রগাঢ় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হিসাব-নিকাশ ছাড়া আমরা প্রকল্প গ্রহণ করে চলেছি। নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও প্রকল্প শেষ হচ্ছে না। সময় বাড়ানো হচ্ছে, খরচ বাড়ছে, সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। যদি সময় নিয়ে, ধৈর্যসহকারে, আত্মপ্রত্যয় এবং সাহস নিয়ে বিভিন্ন স্তরে প্রকল্প প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হতো, তবে প্রকল্পে যথাযথভাবে অর্থসংস্থান করা যেত, প্রকল্প ঠিক সময়ে সমাপ্ত হতো, দেশের সম্পদের অপচয় হতো না।

প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় একটু ধৈর্য, নিষ্ঠা ও সতর্কতা নিয়ে আমাদের এগোতে হবে। দেশের সম্পদের সদ্ব্যবহার করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।

 

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান

 



মন্তব্য