kalerkantho


সংশয় শঙ্কা ও প্রত্যাশিত নির্বাচন

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

১৬ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সংশয় শঙ্কা ও প্রত্যাশিত নির্বাচন

একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনী বাঁশি বাজিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ৮ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা জাতির উদ্দেশে ভাষণের মাধ্যমে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। কিছু রাজনৈতিক দল ও জোটের দাবি অনুযায়ী ঘোষিত তফসিলে পরিবর্তনও করা হয়েছে। পরিবর্তিত তফসিল অনুযায়ী ২৩ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ৩০ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ হবে। মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ২৮ নভেম্বর, মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের তারিখ ২ ডিসেম্বর এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ৯ ডিসেম্বর। সুতরাং দৌড় শুরু হয়ে গেল। সবার জন্যই ট্রেন দুয়ারে প্রস্তুত। কে কত আগে ও পরে ট্রেনে উঠবেন বা আদৌ উঠবেন কি উঠবেন না, তা প্রতিটি দল এবং প্রার্থীর ব্যক্তিগত বিষয়। দর্শকের ভূমিকায় এ দেশের নাগরিক ও ভোটার হিসেবে সেটি দেখার জন্য আমাদের হয়তো মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

নির্বাচনী রাজনীতিতে চাপ পাল্টা চাপ, হুমকি পাল্টা হুমকি এবং দর-কষাকষি শেষ সময় পর্যন্ত চলবে। বিএনপির প্ল্যাটফর্মে জড়ো হওয়া ঐক্যফ্রন্ট নামের যাত্রীদের নিয়ে মানুষের কিছু সংশয়, সন্দেহ ও শঙ্কা আছে। বাকিরা সবাই নির্বাচনী ট্রেনে উঠে পড়েছে। বামপন্থার ক্ষুদ্র কিছুসংখ্যক যাত্রী এ পর্যন্ত যা বলছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে তাঁরা ভিন্ন প্ল্যাটফর্মে থাকলেও দৃষ্টি রেখেছেন জামায়াত-বিএনপির নেতৃত্বাধীন প্ল্যাটফর্ম ঐক্যফ্রন্টের দিকে। আলাদা হলেও দুই প্ল্যাটফর্মের কথা অভিন্ন। মানুষের ধারণা, জামায়াত-বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট প্ল্যাটফর্মের যাত্রীরা নির্বাচনী ট্রেনে উঠে পড়লে বামপন্থী প্ল্যাটফর্মের যাত্রীরাও তখন তড়িঘড়ি করে ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করবেন। তবে তাঁরা কয়জন জায়গা পাবেন সেটি তখন দেখার বিষয় হবে। সবচেয়ে বড় সংশয় ও শঙ্কার কথা বলতেই আজকের লেখা। ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন বা অন্য যে-ই হোন না কেন, বিএনপি মাইনাস হয়ে গেলে নির্বাচনী মাঠে অন্য কারো কোনো মূল্য নেই, তখন হারিকেন দিয়ে খুঁজেও কাউকে পাওয়া যাবে না। বিএনপি কী করবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখন যাঁদের সামনে দেখা যাচ্ছে তাঁদের কারো হাতে নেই। সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেশের বাইরে তো বটেই। তবে তা যে শুধু লন্ডনে তা-ই নয়, অন্য দেশের অদৃশ্য শক্তি এখন বিএনপির অন্যতম নিয়ামক শক্তি। আবার জামায়াতের কথা ভুলে গেলে চলবে না। অদৃশ্য উপাদানের কথা বাদ দিয়ে দৃশ্যমান উপাদানের দিকে তাকালেও তাতে দেখা যায় ত্রিমুখী সংকটের বিভ্রান্তিতে জরুরি অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে এখনো বিএনপি দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে। এই দোদুল্যমান অবস্থায় তারা যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, তার শেষ দেখার জন্য ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সংশয় ও সন্দেহের অনেক উপাদান এখনো প্রবলভাবে বিদ্যমান।

প্রথমেই আসা যাক বিএনপির নেতৃত্ব সম্পর্কে হাইকোর্টের আদেশের কথায়। হাইকোর্ট সম্প্রতি এক আদেশে বলেছেন, এ বছরের শুরুর দিকে বিএনপি তাদের গঠনতন্ত্রের সপ্তম ধারা সংশোধন করে দুর্নীতি ও ক্রিমিনাল অফেন্সে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও যে দলের নেতৃত্বে থাকতে পারবেন, তা অবৈধ। নির্বাচন কমিশনকে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছেন, এই সংশোধিত গঠনতন্ত্র যেন গ্রহণ করা না হয়। এর অর্থ দাঁড়াবে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান কেউই বিএনপির নেতৃত্বে থাকতে পারবেন না। তাঁরা দুজন তো নির্বাচন করতে পারবেনই না, বরং তাঁদের নেতৃত্বে রাখলে দলগত প্রার্থীরা বৈধতার প্রশ্নে আইনের সম্মুখীন হতে পারেন। এ অবস্থায় আপাতদৃষ্টিতে দুটি সংকট দেখা যায়। দলের কট্টরপন্থী গ্রুপ গোঁ ধরতে পারে খালেদা জিয়া ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না। এ জায়গায় কট্টরপন্থীরা ছাড় দিলেও পরবর্তী প্রশ্ন আসবে নির্বাচনে গিয়ে তার ফল কী পাওয়া যাবে। অনেক মানুষের ধারণা, নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় যাওয়ার দুরাশা এত দিনে বিএনপি ছেড়ে দিয়েছে। সে অবস্থায় পার্লামেন্টে শক্তিশালী বিরোধী দল হলে দলীয় রাজনীতি হয়তো রক্ষা পাবে। কিন্তু তাতে তারেক রহমানের অবস্থার কোনো পরিবর্তন যে হবে না, এটা তো সবাই বুঝতে পারে। সুতরাং লন্ডন এবং অদৃশ্য বিদেশি শক্তির কাছ থেকে কী সিদ্ধান্ত আসে, সেটি এখন বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্বের জায়গা।

এ অবস্থায় অনেকেই বিশ্বাস করে, তারেক রহমান নির্বাচন ভণ্ডুল করতে চাইবেন এবং এর জন্য বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করবেন। এতে বিএনপি অবধারিতভাবে ভাঙনের মুখে পড়বে। তৃণমূল পর্যায়ের বেশির ভাগ নেতাকর্মী এলাকায় নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য এখন মরিয়া। সুতরাং নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করা সম্ভব হবে না। এতে নির্বাচনমুখী তৃণমূলের সঙ্গে যোগ দিতে পারে টপ নেতৃত্বের বড় একটা অংশ। দ্বিতীয় গ্রুপ, কট্টরপন্থী অংশ খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ঝাণ্ডা নিয়ে নির্বাচন বয়কট করার দিকে যাবে। তৃতীয় অংশের অনেক নেতা দর-কষাকষি করে সুবিধাজনক প্রাপ্তির বিবেচনায় নির্বাচনমুখী অন্যান্য দলে ভিড়ে যেতে পারেন। এ পরিস্থিতিতে তারেক রহমান ও তাঁদের অদৃশ্য শক্তি মিলিতভাবে ওই কট্টরপন্থী অংশের ওপর নির্ভর করে নির্বাচন প্রতিহতের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে।

কিছুদিন আগে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় এই মর্মে একটা খবর বেরিয়েছিল যে ঢাকাস্থ পাকিস্তান দূতাবাসের ভেতরে বাংলাদেশের নির্বাচনকে ভণ্ডুল করার জন্য বহুমুখী ছক কাটা হচ্ছে। অনেকে আশঙ্কা করছে, ভাড়াটে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী অথবা জঙ্গি বাহিনীর দ্বারা বড় ধরনের কোনো খুনখারাবি ঘটিয়ে সব কিছু উল্টাপাল্টা করে দিতে পারে। তবে এ চেষ্টায় তারা সফল হবে—এমন খুব বেশি মানুষ মনে করে না। কারণ বাংলাদেশের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক আগের চেয়ে অনেক বিস্তৃত ও শক্তিশালী। পুলিশের সন্ত্রাস জঙ্গিবিরোধী ইউনিট এবং র‌্যাবের জনবলজনিত ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের বাইরে পর্যন্ত বিস্তৃত মাল্টিলেয়ার গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ফাঁকি দেওয়া ষড়যন্ত্রকারীদের পক্ষে মোটেও সহজ হবে না। তবে নিরীহ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মনে নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা কিছুটা সৃষ্টি হতে পারে। নির্বাচন কমিশন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ বিষয়ে অতিরিক্ত সজাগ থাকতে হবে। আত্মতুষ্টিতে থাকা যাবে না।

আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার জন্য নির্বাচন কমিশনসহ সব অংশীজনের যথাযথ সাহসী ভূমিকা দরকার। সচেতন জনগণের দায়িত্ব এখানে সবচেয়ে বেশি এবং গুরুত্বপূর্ণ। জনগণই পারে এই নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে প্রমাণ করতে পারে বাংলাদেশের মানুষ ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতে পারে, ধর্মান্ধতা ও উগ্রবাদকে প্রত্যাখ্যান করে, প্রগতি এবং উদার গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণ করে এর বিপরীত স্রোতকে প্রত্যাখ্যান করে। অপশক্তি ষড়যন্ত্রকারীরা নানা ছদ্মবেশে এবং অপকৌশলে নির্বাচন কমিশনকে সংবিধানবহির্ভূত কাজে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করবে, যার উদাহরণ এরই মধ্যে কিছু দেখা গেছে। সন্ত্রাসী জঙ্গিগোষ্ঠী দেশের ভেতরে অবৈধ অস্ত্রের পাহাড় গড়ে তুলেছে। রাজধানীর সন্নিকটে ২০১৬ ও ২০১৭ সালের জুন মাসে দুটি বড় অস্ত্রভাণ্ডার ধরা পড়ার মাধ্যমে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। সুতরাং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য। অন্য দুটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, কালো টাকা ও ধর্মের অপব্যবহার। প্রয়োজনবোধে প্রার্থীদের ব্যয়ের সীমা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। তবে কালো টাকার ব্যবহার বন্ধ করার জন্য কঠোর ব্যবস্থাসংবলিত নিশ্ছিদ্র নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন, যাতে কেউ কালো টাকা ছড়িয়ে সরলপ্রাণ মানুষকে প্রভাবিত করতে না পারে। এ সময়ে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর পক্ষে বিদেশ থেকে অবৈধ টাকা আসার আশঙ্কা থাকে। এর আগে দেখা গেছে, ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক গোষ্ঠী তাদের মহিলা সদস্যদের দ্বারা মফস্বল অঞ্চলে ধর্মের নামে অপপ্রচার চালায় এবং গোপনে সরল মনের নারীদের কোরআন ছুঁয়ে শপথ নেওয়ায়, যাতে ওই নারী ভোটাররা তাদের প্রার্থীকে ভোট দেয়। এটা বন্ধ করার ব্যবস্থাসহ কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান থাকা প্রয়োজন। যাঁর পক্ষে কালো টাকা ও ধর্মের অপব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যাবে সেই প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করার ব্যবস্থা থাকা উচিত।

সর্বশেষ, তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে বিশেষ ব্যবস্থা ও পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। এলাকাভিত্তিক পরিস্থিতি মূল্যায়নপূর্বক কর্মপন্থা নির্ধারণ করা জরুরি। গড়পড়তা নির্দেশনার মাধ্যমে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি, যার উদাহরণ ২০১৪ সালে দেখা গেছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে যশোরের অভয়নগর উপজেলার মালোপাড়ায় সংঘটিত ঘটনার কথা কেউ ভুলে যায়নি। পরের দিন ৬ জানুয়ারিতে দেশের সব বড় পত্রিকায় তার সচিত্র প্রতিবেদন দেখে মানুষমাত্রই চোখের পানি ফেলেছে। তখন ওখানকার স্থানীয় প্রশাসনের ভয়ানক গাফিলতি ধরা পড়ে, যা ক্ষমার অযোগ্য। এবার এর পুনরাবৃত্তি হলে তা শুধু লজ্জাজনক নয়, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ভয়ানকভাবে ক্ষুণ্ন হবে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় শুধু নির্বাচনপূর্ব ও ভোটের দিনের জন্য নয়, তার সময়সীমা বর্ধিত করে নতুন সরকারের শপথ নেওয়া পর্যন্ত বহাল রাখতে হবে। সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সংবিধান ও প্রচলিত আইন মোতাবেক তারা বেসামরিক প্রশাসনকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা করবে। ষড়যন্ত্রকারীদের পাতা ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না। রাষ্ট্রের স্বার্থে সশস্ত্র বাহিনীকে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। উপসংহারে বলতে চাই, মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, সব সংশয়, শঙ্কা কাটিয়ে বাংলাদেশের মানুষ আসলেই প্রত্যাশিত একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করবে।

 

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

sikder52@gmail.com



মন্তব্য