kalerkantho


মেডিক্যাল শিক্ষা ও বাস্তবতা

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

১৬ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মেডিক্যাল শিক্ষা ও বাস্তবতা

চিকিৎসাবিদ্যায় গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম এ কারণে যে এখানে মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন সরাসরি জড়িত। অন্যান্য বিজ্ঞান; যেমন—ভৌত ও সামাজিকেও গবেষণার বিকল্প নেই। কেননা একমাত্র গবেষণার মাধ্যমেই জ্ঞান সৃষ্টি এবং বিতরণের সুযোগ তৈরি হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন বিজ্ঞানে গবেষণাকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়, যেখানে গবেষণা করার জন্য বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। বিজ্ঞানের মৌলিক শিক্ষা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মাধ্যমে আমরা আয়ত্ত করতে পারি; কিন্তু মৌলিক শিক্ষাকে ফলিত পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে দরকার গবেষণা এবং এর জন্য প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান। এর সঙ্গে যুক্ত সুযোগ সৃষ্টি, অর্থ, প্রণোদনা, শক্তি ও সাহস।

অন্যান্য পেশার তুলনায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্ব একটু আলাদা। অনেক কারণে এমন মন্তব্য গ্রহণযোগ্য। চিকিৎসার ভুলত্রুটি শোধরানোর সুযোগ কম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাজ জ্ঞানদান ও সৃষ্টি। অন্যদিকে একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানীর কাজ জ্ঞানদান করা, জ্ঞান সৃষ্টি করা এবং সরাসরি মানুষের চিকিৎসাসেবায় নিজেকে নিযুক্ত করা। এর কোথাও ফাঁক, অসংলগ্নতা, ভুল ও অবহেলায় মানুষের জীবনহানি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। প্রতিটি অধ্যায়ে একজন চিকিৎসকের যথেষ্ট দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হয়। সরাসরি মানুষকে সহায়তা করার মতো যতগুলো পেশা রয়েছে, তার মধ্যে চিকিৎসা অন্যতম। এ কারণে মানুষের কাছে চিকিৎসকের কদর, গুরুত্ব ও মর্যাদা অনেক বেশি। এমন মর্যাদা ধরে রাখার জন্য তাঁদের যেমন দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তেমনি সমাজের পক্ষ থেকে এবং সরকার কর্তৃক বিশেষ সহায়তা ও বেশি বেশি প্রণোদনা দেওয়া দরকার। নইলে পেশার মানোন্নয়ন পিছিয়ে পড়বে।

মৌলিক বিজ্ঞানের যথাযথ প্রয়োগের জন্য যখন ফলিত বিজ্ঞানের শাখাগুলো বিস্তৃতি লাভ করে তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণার বিষয়গুলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ অন্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান করা হয়। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম নয়। এ দেশের অনেক, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলিক, ফলিত ও লাইফ সায়েন্সের অধীনে চিকিৎসাবিদ্যার অনেক বিষয় নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, যা মানবকল্যাণে ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের মেডিক্যাল কলেজগুলোকে, যেখানে চিকিৎসকদের, যাঁরা সরাসরি চিকিৎসা দেন। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে; কিন্তু সেই পরিমাণে গবেষণা, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মানসম্মত গবেষণা কম হয়ে আসছিল। বাংলাদেশের প্রথম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা বেশিদিন আগের নয়।

বর্তমান সরকার চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্ব ও গবেষণার পরিধি বাড়ানোর জন্য বরাবরই সচেতন ও সচেষ্ট ছিল এবং এখনো আছে। যদিও চিকিৎসা বিষয় অত্যন্ত ব্যয়বহুল; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ জীবন-মরণের বিষয়। সরকার গত কয়েক বছর অনেক বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে; কিন্তু গবেষণার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। উন্নত মানের গবেষণা করার জন্য প্রয়োজন ভালো মানের সুযোগ-সুবিধা। এর অংশ ভালো প্রতিষ্ঠান এবং অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। এমন লক্ষ্য সামনে রেখে এরই মধ্যে চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও সিলেটে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সরকারের অঙ্গীকার আবার ক্ষমতায় এলে প্রতিটি বিভাগে এমন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার। এর মাধ্যমে চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। এখন আর গবেষণার জন্য ঢাকায় যেতে হবে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িতরা বিভাগে বসে শিক্ষা ও গবেষণার কাজটি সহজে সম্পন্ন করতে পারবেন। শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নত ও সমৃদ্ধ হবে। অধিকন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা মেডিক্যাল কলেজগুলো পরিচালনায় এক নতুন দ্বারও উন্মোচিত হবে। কেননা এত দিন কলেজগুলো বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ছিল।

বাংলাদেশে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী উদ্যোগ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। একে সাফল্যজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বড় প্রয়োজন চিকিৎসকদের বিশেষ মোটিভেশন; যার অংশ পাঠদান ও গবেষণার মধ্যে নিবদ্ধ। আমরা সবাই জানি, চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা পাঠদান, বই-পুস্তক, যন্ত্রপাতি ও রোগীদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এমন গবেষণা দীর্ঘমেয়াদি হওয়া স্বাভাবিক। আমাদের দেশে চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণার যে সুযোগ তৈরি হতে যাচ্ছে, তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য চিকিৎসকদের ভূমিকা প্রধান। চিকিৎসকদের রোগী সুস্থ করার জন্য, রোগ নির্ণয় ও নিরাময়ের জন্য নিয়মিত গবেষণা করতে হয়। অপেক্ষাকৃত বেশি সময় কিংবা কিছুসংখ্যকের পুরো সময় গবেষণায় ব্যয় করা ভালো। ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে আমরা নতুন নতুন সাফল্যের দিকে ধাবিত হতে সক্ষম হব বলে আশাবাদী।

 

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

neazahmed_2002@yahoo.com



মন্তব্য