kalerkantho


নির্বাচন হলেও লঙ্কায় স্থিতি আসবে কি?

অনলাইন থেকে

১৫ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাইত্রিপালা সিরিসেনা হুট করে ৯ নভেম্বর পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচনের ডাক দিলেন। অনেকে বলছেন, সংবিধান অনুসারে তাঁর যতটুকু ক্ষমতা আছে, সেটা ছাপিয়ে গেছেন তিনি। তাঁর এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে দৃশ্যত শ্রীলঙ্কায় কয়েক সপ্তাহ ধরে চলমান রাজনৈতিক নাটকের যবনিকাপাত হলো।

শুরুটা হয় ২৬ অক্টোবর। প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেকে হঠাৎ বরখাস্ত করে বসেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত করা হয় সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষেকে। অথচ একসময় সিরিসেনা রাজাপক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, এমনকি তাঁকে হত্যার পরিকল্পনার অভিযোগও তুলেছিলেন। সিরিসেনা তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক ঠেকাতে তিন সপ্তাহের জন্য পার্লামেন্টের কার্যক্রম স্থগিত করতেও ছাড়েননি। এর মধ্যেই তিনি নতুন মন্ত্রীদের শপথ পড়াতে শুরু করেন।

সিরিসেনার পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় অনেকে ধরে নিয়েছে, নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বেশির ভাগ পার্লামেন্ট সদস্যের (এমপি) সমর্থন নেই। প্রেসিডেন্ট তিন সপ্তাহের জন্য পার্লামেন্ট স্থগিত করায় আরো বেশিসংখ্যক এমপিকে নিজের পক্ষে ভেড়ানোর সময় পাওয়া গেছে। দলে ভেড়ানোর জন্য এমপিদের অবশ্য মন্ত্রিত্ব ও অর্থসহ নানা রকম উপঢৌকন দিতে হবে। কিন্তু বিক্রমাসিংহে পদ ছাড়তে অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, প্রেসিডেন্ট নন, কেবল পার্লামেন্ট তাঁকে বরখাস্ত করার এখতিয়ার রাখে। এদিকে প্রেসিডেন্টের বিরোধীপক্ষ এবং বিদেশি কূটনীতিকরা পার্লামেন্টে ভোটাভুটির মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। চাপে পড়ে সিরিসেনা অনিচ্ছা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১৪ নভেম্বর পার্লামেন্টের অধিবেশন ডাকেন।

প্রেসিডেন্ট অন্য দলের এমপিদের নিজের দলে ভেড়াতে শুরু করলেও সম্ভবত এখন আর তিনি নিজ দলের এমপিদের ওপরও ভরসা রাখতে পারছেন না। রাজাপক্ষে সম্ভবত সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ১১৩ ভোট নিশ্চিত করতে পারছেন না। এরই মধ্যে স্পিকার জানিয়ে দিয়েছেন, পার্লামেন্টে ভোটাভুটিতে দেরি করা যাবে না এবং ভোটাভুটি ছাড়া তিনি রাজাপক্ষের সরকারকে সমর্থনও দেবেন না।

আর তাই প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা দ্বিতীয় পদক্ষেপটা নেন—পার্লামেন্টই ভেঙে দেন। বিক্রমাসিংহেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্তের মতো এবারও তিনি মধ্যরাতেই সিদ্ধান্তটা নিলেন, যেন হুট করে কোনো আইনি প্রতিরোধের মুখে পড়তে না হয়। কিন্তু পার্লামেন্টের বেশির ভাগ দল জানিয়েছে, তারা সিরিসেনার শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টিকে ঠেকাতে সুপ্রিম কোর্টের আশ্রয় নেবে। বিক্রমাসিংহে কিংবা রাজাপক্ষে—কোনো পক্ষেই না যাওয়া তামিল ন্যাশনাল অ্যালায়েন্সের নেতা এম এ সুমান্থিরান বলেছেন, তাঁর দল পার্লামেন্ট বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্তের ওপর স্থগিতাদেশ চায়।

সংশ্লিষ্ট বিচারক কী ধরনের আদেশ দেবেন আর কত শিগগির দেবেন, তা অবশ্য স্পষ্ট ছিল না। বিচারকদের সবাই হয় সিরিসেনার আমলে অথবা রাজাপাক্ষের আমলে নিয়োগ পেয়েছেন। বিচারকরা ক্ষুব্ধ এমপিদের পক্ষে রায় দিলেও প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা ও তাঁর নতুন মিত্ররা ওই রায় আদৌ মানবেন কি না সেটাও কিন্তু স্পষ্ট নয়। (উল্লেখ্য, ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্টের পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নাকচ করেছে—বি.স.)।

যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে চান প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা ও রাজাপক্ষে। সিরিসেনা ইতিমধ্যে ৪২টি দপ্তর, আইন অনুমোদিত সংস্থা ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করেছেন। আর অর্থ মন্ত্রণালয়কে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি নিয়ে বসে আছেন নবঘোষিত প্রধানমন্ত্রী রাজাপক্ষে। গণমাধ্যমের ওপর মিত্রদের চড়িয়ে বসানোর কাজটাও সেরে ফেলা হয়েছে ইতিমধ্যে। আরো আছে। নতুন সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা; পুলিশকেও নিজের অধীনে নিয়েছেন। মুদ্রণ বিভাগ এখন থেকে সরাসরি সরকারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে, এমন আদেশও জারি করেছেন প্রেসিডেন্ট।

শ্রীলঙ্কা অচলাবস্থার মধ্যে পড়েছে। নতুন মন্ত্রীরা দপ্তর দাবি করেছেন বটে, তবে সরকারি কর্মীরা কোনো দলিলে সই করা নিয়ে ভীষণ চিন্তার মধ্যে আছে। তাদের দুশ্চিন্তার কারণ একটাই—যদি সরকারে বদল ঘটে! পার্লামেন্টে এ নভেম্বরে বাজেট আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। সেটা চুলোয় গেছে। বিদেশি ঋণদাতাদের সঙ্গে যে আলোচনা শুরু করেছিল, সেটাও থমকে গেছে।

সিরিসেনার কারণে দেশে অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে, সেটা থামানোর চেষ্টা তিনি করছেন। তাঁর পরিকল্পনা যদি ঠিকঠাক কাজ করে, তবে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, ভোটে সাংবিধানিক নিয়ম-কানুন বজায় থাকুক বা না থাকুক, বিক্রমাসিংহেকে হটিয়ে রাজাপক্ষে ক্ষমতা নিয়ে নেবেন, যদিও তাঁর ১০ বছরের শাসনামল নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক আছে। তাঁর এক দশকের সেই শাসনকালের সমাপ্তি ঘটে ২০১৫ সালে।

প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার আচরণে বোঝা যাচ্ছে, ভোটের ফল তাঁর পরিকল্পনামাফিক না হলে তিনি সেই ফল কিছুতেই মানবেন না। এ বিষয়ে আইনজীবী কিশালি পিন্টো জয়াবর্ধনার অভিমত, নির্বাচনের ফল যদি যেমন অনুমান করা হয়েছে তেমন না হয়, অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের মনমতো না হয়, তবে সম্ভবত নির্বাচনে বিজয়ী ব্যক্তিকে হটিয়ে দিতেও তাঁর বাধবে না। 

 

সূত্র: দি ইকোনমিস্ট

ভাষান্তর: শামসুন নাহার

 



মন্তব্য