kalerkantho


সাদাকালো

যাহা ভাবা গিয়াছিল অবশেষে তাহাই ঘটিল

আহমদ রফিক

১৫ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



যাহা ভাবা গিয়াছিল অবশেষে তাহাই ঘটিল

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনের তড়িঘড়ি নির্বাচনবিষয়ক ঘোষণার বিতর্কিত পরিপ্রেক্ষিতে সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মন্তব্যের কারণে। ঐক্যফ্রন্টের সর্বোচ্চ নেতা ড. কামাল হোসেন অবশ্য ততটা নেতিবাচক ছিলেন না তাঁর মন্তব্যে। তবে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন সংলাপ শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার কারণে। তাও আবার বৈঠকের পরদিনই।

এ ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় বিরোধী জোটের সমালোচনামূলক বক্তব্য মূলত তাড়াহুড়া করে তফসিল ঘোষণার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য নিয়ে। কারণ হাতে সময় বড় কম। দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে অবিন্যস্ত ও বিপর্যস্ত বিএনপির পক্ষে মনোনয়নপ্রার্থী বাছাই রীতিমতো কঠিন কাজ। তদুপরি তাদের ভাষায় তাদের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, হয়রানির মধ্যে এত দ্রুত নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া সহজ নয়।

এই পরিপ্রেক্ষিতে সমস্যার জট খুলে নির্বাচন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট বৈঠকে বসে। এরই মধ্যে আমরা লিখেছিলাম, ‘পরিস্থিতি বিচারে এবং অস্তিত্ব রক্ষার সংকট বিবেচনার মতো একাধিক কারণে যত অসুবিধাই হোক বা জয়ের আশা না-ই থাকুক, বিএনপির পক্ষে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই। অর্থাৎ জয় অনিশ্চিত জেনেও পরিস্থিতির কারণে তাদের পক্ষে উচিত হবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ। একাদশ নির্বাচনকেও একতরফা নির্বাচনে পরিণত হতে দেওয়া ঠিক হবে না। তাতে স্বদেশে-বিদেশে বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতির মুখ রক্ষা হবে। কিন্তু ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে।’

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং তাঁর পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছিল, ‘জাতিসংঘ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায় বাংলাদেশে’। এ ধরনের মন্তব্য যেমন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশস্থ কূটনীতিকদের, তেমনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্র প্রতিনিধিদেরও।

বিরোধী জোটের বৈঠকের সিদ্ধান্তের প্রকাশ ঘটেছে ১১ নভেম্বর রবিবার প্রতিটি সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় কথিত প্রধান শিরোনামে : ‘নির্বাচনে যাচ্ছে বিএনপি’, ‘বিএনপি ভোটে যাচ্ছে ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে’, ‘বিএনপি জোট নির্বাচনে যাবে’, ‘সংসদ নির্বাচনে যাচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ ইত্যাদি।

নির্বাচন নিয়ে সুবাতাস বয়ে গেল বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সেই একদা উচ্চারিত প্রতিবাদী স্লোগান : ‘টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া...’ মনে পড়ে যেতে পারে। আওয়ামী লীগ সুস্থির স্বস্তিতে সন্তুষ্ট। কারণ নির্বাচনবিষয়ক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আপাতত জয় তাদেরই। প্রধানমন্ত্রীও সন্তুষ্ট, নির্বাচন যথাসময়ে হতে যাচ্ছে। তিনি সাধুবাদ জানিয়েছেন বিরোধী দলগুলোকে। যেমন—এর আগে, তেমনি এখন নির্বাচন নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বুদ্ধিজীবীদের লেখালেখি শুরু হয়ে গেছে। তৃতীয় শ্রেণি নিরক্ষবলয়ে দাঁড়িয়ে নিরপেক্ষ যুক্তি-তথ্য সাজিয়ে নির্বাচনের সমস্যা ও পরিণাম নিয়ে ভাবনা ও লেখায় ব্যস্ত। এমনকি কারো লেখায় আদর্শ নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে ভাবনার প্রকাশ ঘটছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে একটি স্থায়ী ও সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তোলা অতীব জরুরি। এমন চিন্তারও প্রকাশ দেখা যাচ্ছে।

কারণ প্রতিবার নির্বাচন, বিশেষভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে এলেই শুরু হয়ে যায় তর্ক-বিতর্ক। এবং তা মূলত নির্বাচন ব্যবস্থার পদ্ধতিগত দিক নিয়ে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গ নিয়ে। কখনো সে উপলক্ষে চূড়ান্ত বাদ-প্রতিবাদের প্রকাশ ঘটে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ বর্জিত হয়। পরিণামে কখনো সহিংস পরিস্থিতিরও প্রকাশ ঘটে।

কখনো প্রশ্ন ওঠে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ এমনই একপর্যায়ে যে এখানে স্বাধীন, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ রাজনৈতিক অবকাঠামো গড়ে তোলা যায়নি। ব্যক্তি বিশেষের ইচ্ছা-সদিচ্ছার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করে, যা মোটেই আকাঙ্ক্ষিত নয়। পশ্চিমা বিশ্বের দিকে তাকালে মনে হতে পারে, এদিক থেকে বাংলাদেশ কতটা পিছিয়ে।

দুই.

তাই বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে, এ সুখবরের সবটা তত্ত্বগত বিচারে কতটা নির্ভেজাল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এরই মধ্যে তেমন আলামত লক্ষ করা যাচ্ছে। রবিবার দুপুরে ড. কামাল হোসেন সংবাদ সম্মেলনে কী বললেন। সেখানে তাঁরা কী দাবি তুললেন তা জানা গেছে। তাঁরা তফসিল ও নির্বাচন পেছানোর দাবি তোলেন, সেই সঙ্গে আরো সংলাপ।

প্রশ্ন উঠতে পারে ইভিএম ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে। কারণ এরই মধ্যে ইভিএমে কারচুপি নিয়ে বিশ্বের কোথাও কোথাও প্রশ্ন উঠেছে। এ অবস্থায় এত রাজনৈতিক বিতর্কের ও বাদ-প্রতিবাদের মুখে বাংলাদেশ কেন নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতি ব্যবহারে এতটা আগ্রহী? এ প্রসঙ্গে ছোট একটি সিঙ্গেল কলাম সংবাদ শিরোনাম : ‘ইভিএম ব্যবহার হতে পারে সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তায়।’

অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন এর আগেকার ইভিএম-বিষয়ক তর্ক-বিতর্ক, প্রতিবাদ (দেশে-বিদেশে) ও আলোচনা আমলে না এনে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের কথা ভাবছে। স্বভাবতই এটা পছন্দ করছে না বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট। তাদের মনে সন্দেহ দানা বাঁধছে। তবু আমাদের বিশ্বাস, প্রতিবাদ মুখে নিয়েই ঐক্যফ্রন্ট-বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে। এখানে ড. কামাল হোসেনের চিন্তা-ভাবনাই প্রধান বলে আমাদের মনে হয়।

তিন.

প্রত্যাশামাফিক ঐক্যফ্রন্ট-বিএনপি জোট এবার একাদশ সংসদীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছে গত ১১ নভেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে। ঘোষণা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেনের।

বলতে হয় আশঙ্কা, অস্বস্তি দূর হলো। বিএনপি মহাসচিব তাঁদের জোটের শরিক দলগুলোকে নির্বাচনের জন্য দ্রুত সব রকম প্রস্তুতি গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন। শুরু হয়ে গেছে তাঁদের পক্ষেও নির্বাচনী তৎপরতা, যা এর আগে শুরু হয়ে গেছে আওয়ামী লীগের জোট শিবিরে। বছরের বাকি কয়টা মাস কাটবে নির্বাচনী উত্তাপে, উত্তেজনায়, প্রতিযোগিতায়।

তবু এই ইতিবাচকতার মধ্যে একটি ‘কিন্তু’ থেকে যাচ্ছে, যেমনটি এর আগে বলা হয়েছে সম্ভাবনা হিসেবে। এবার সংবাদ সম্মেলনে তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন ড. কামাল হোসেন। সময়ের অতীব স্বল্পতার যুক্তিতে তিনি দাবি তুলেছেন ঘোষিত তফসিল বাতিল করে নির্বাচন এক মাস পিছিয়ে দেওয়ার।

এখন নির্বাচনী খেলার বল কার্যত নির্বাচন কমিশনের মাঠে হলেও মূলত তা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও তাদের সরকারের মাঠে। তারা এ ব্যাপারে যদি কঠিন হয়, তাহলে আবার বহু প্রত্যাশিত সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে। সূচিত নির্বাচনী সুপরিবেশ নষ্ট করা ঠিক হবে না।

আমরা মনে করি এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলকে কিছুটা উদার হতে হবে, প্রত্যাশিত ছাড় দিতে হবে তাদের সুবিন্যস্ত শক্তিমান অবস্থানের কথা মাথায় রেখে। কারণ মানুষ চায় সংঘাতহীন পরিবেশে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন, যেখানে তাদের দেওয়া ভোটে জয়ী দল পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য শাসন আসনে বসে দেশ চালাবে।

জনগণের এ প্রত্যাশায় পানি ঢেলে দেওয়া যুক্তিযুক্ত হবে না। অবশ্য এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নির্বাচন কমিশন তফসিল পেছাতে চাইলে তাদের কোনো আপত্তি নেই। এমনকি নির্বাচনের তারিখ পেছাতে চাইলেও আপত্তি নেই।

তাহলে তো দ্বন্দ্ব মিটেই গেল।  রাজনৈতিক মহল থেকে সাংস্কৃতিক মহল, সবারই প্রত্যাশা আর সংঘাত নয়। এবার চাই একটি প্রশ্নবিহীন স্বচ্ছ নির্বাচন।

আমরা আশা করব, সর্বমহলের এ আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা আমলে নেবে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনী রাজনৈতিক মহলের বহু কথিত ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ অর্থাৎ সব দলের জন্য সমান সুযোগের ব্যবস্থা নেবে এবং সময় স্বল্পতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে নির্বাচন নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন।

প্রসঙ্গত, নির্বাচন সম্পর্কে আমাদের দুটি বিষয় নিয়ে বক্তব্য। প্রথমত, নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ আচরণের নিশ্চয়তা চাই, যাতে কোনো পক্ষ কোনো প্রকার অভিযোগ আনতে না পারে। এ ক্ষেত্রে সোনাবাহিনী মোতায়েন সবাইকে সংশয়মুক্ত ও নিশ্চিত করবে। নির্বাচন কমিশন এ বিষয়টি নিশ্চিত করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

দ্বিতীয়ত, জাতীয় সংসদের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে অনেক দিন থেকে প্রশ্ন উঠছে সুধীমহলে, লেখক মহলে। এমনকি বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি এ সম্পর্কে একাধিকবার সঠিক সমালোচনামূলক মন্তব্য করেছেন, যা সর্বমহলে অভিনন্দিত হয়েছে। ভারতেও বিষয়টি নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলে ও সর্বোচ্চ আদালতে বহু আলোচিত হয়েছে।

আমরাও চাই সংসদকে রাজনৈতিক চরিত্রে মননশীল ও সুস্থ রাখতে কোনো দলই যেন দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, অপরাধীদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন না দেয়। এমনকি মহামান্য রাষ্ট্রপতি কথিত ব্যবসায়ীকুলকেও সংসদীয় রাজনীতির অঙ্গন থেকে দূরে রাখেন। কারণ জাতীয় সংসদের আকাঙ্ক্ষিত রূপ হওয়া উচিত পুরোপুরি রাজনৈতিক চরিত্রের। এবং প্রথাসিদ্ধ রাজনীতিকদের দ্বারাই জাতীয় সংসদের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়া উচিত, যেখানে শ্রেণি বিশেষের স্বার্থসিদ্ধির প্রকাশ ঘটবে না।

আশা করি, রাজনৈতিক দলগুলো বিষয়টি তাদের বিবেচনায় রাখবে সংসদের প্রার্থী নির্বাচন ও মনোনয়নদানের ক্ষেত্রে।

 

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

 



মন্তব্য