kalerkantho


কথার ঊর্ণনাভ হুমায়ূন আহমেদ

সৌমিত্র শেখর

১৩ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



কথার ঊর্ণনাভ হুমায়ূন আহমেদ

কথার ঊর্ণনাভ, উপস্থাপনার স্বভাবকারিগর, অবিরাম রচনা-উৎস আর চিন্তার বহুবর্ণিল রামধনুধর হুমায়ূন আহমেদ। তিনি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যকে একেবারে পাঠকের অন্দরমহলে নিয়ে গিয়েছিলেন অনায়াসে। বাঙালি আবার যেন বইমুখো হয়েছিল বিশ শতকের প্রথমার্ধের মতো। মধ্য-বিশ শতকের খানিক আগে-পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত আর ভারতীয় রাজনীতিতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ বাংলা সাহিত্যের অগ্রগতি স্তব্ধ করে দেয়। এই স্তব্ধতা কাটাতে অন্তত সিকি শতাব্দী থেকে তিনটি দশক লেগে যায়। তত দিনে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে এবং স্বাধীনতা-উত্তর পরম আনন্দে বাংলা সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। তখন যেন ‘আমরা সবাই রাজা’ গোছের একটা কিছু। তবে গদ্য সাহিত্যে পাঠকের মন জয় করার মতো কোনো রাজাকেই পাওয়া গেল না। লিখছিলেন অনেকেই, সে লেখাগুলোর নানা ধরনের মূল্য নিশ্চয়ই আছে—কিন্তু পাঠকের মনজয়ী লেখা-পরম্পরা নিয়ে এলেন হুমায়ূন আহমেদ। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালেই লেখক হিসেবে তাঁর হাতেখড়ি।

ভাবা যায়—মাত্র এক রাতে ‘নন্দিত নরকে’ নামের একটি উপন্যাস লিখে ফেলেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ! তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৩ বছর। ১৯৭২ সালের ১৬ জুন এই বইয়ের ‘ভূমিকা’ লেখেন সে সময়ের প্রবর অধ্যাপক আহমদ শরীফ। যে লেখকের বই প্রকাশ করার জন্য প্রকাশকরা একসময় চাতকের মতো চেয়ে থাকতেন, সেই হুমায়ূন আহমেদের প্রথম বই ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশই হতো না, যদি না এই ভূমিকাটি আহমদ শরীফ লিখতেন! হুমায়ূন আহমেদ জানিয়েছেন, ‘একটা ভূমিকা লিখে দিলেন তিনি (আহমদ শরীফ)। যার জন্য খান ব্রাদার্স বইটি ছাপতে আগ্রহী হলো, নইলে বইটি তারাও ছাপত না।’ ফলে হুমায়ূন আহমেদের লেখক হওয়ার গল্প কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ জানতেন, কী অভাব আছে বাঙালি পাঠকের সামনে। তিনি সেভাবেই পরিবেশন করেন। তাঁর ঘটনা বিনির্মাণের ক্ষমতা, স্বল্প সময়ের মধ্যে চরিত্র দাঁড় করার দক্ষতা, গল্প বলার রীতি, কাহিনি উপস্থাপনের সময় পরিপার্শ্বকে সুচারুরূপে তুলে ধরা এক কথায় অসাধারণ। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জীবনের খুঁটিনাটি অপূর্ব দক্ষতায় শব্দে বাঙ্ময় করেছেন এই লেখক; চরিত্রগুলোকে সাবলীল রেখেছেন আটপৌরতায়; কঠোর-কঠিন গদ্য না হেনে তিনি কাব্যিক গদ্যে, খুদে বাক্যে লেখাকে পুরে দিয়েছেন ছোট ছোট নিঃশ্বাসের মধ্যে, আর যুক্ত করেছেন এমন কিছু হৃদয়ছোঁয়া বাণীর, যা তরুণ-তরুণীদের মনে দাগ কাটে! এটাই তো দরকার। হুমায়ূন আহমেদ লক্ষ করেছিলেন, সাতচল্লিশ-উত্তরকাল থেকে স্বাধীনতা-উত্তরকালের ৩০-৩৫ বছরে বাংলাদেশের পাঠক আবার বইবিমুখ হয়েছে। শিক্ষিতদের মধ্যে হাতে গোনা কিছু মানুষ বই পড়েন। অথচ বিকাশোন্মুখ মধ্যবিত্তের ঘরে শিক্ষা ও অর্থ দুই-ই এসেছে; প্রত্যেকের ঘরে লেখাপড়া জানা সন্তানও রয়েছে। এই সন্তানদের স্বাধীনতাও অবারিত। হুমায়ূন আহমেদ তাদের লক্ষ্য করে লিখে চললেন এবং চললেনই। একজন পাঠক তাঁকে এমন প্রশ্ন করেছিলেন, “আপনি এত লেখেন কেন? এত লিখলে লেখার ‘মান’ পড়ে যায়।” হুমায়ূন আহমেদ জানতেন, এটা শুধু ওই পাঠকের নয়, বহুজনের প্রশ্ন। তিনি এর উত্তর দিয়েছিলেন এভাবে : মহাকাল কোন লেখাকে কালোত্তীর্ণ করবে কেউ জানে না।

অনেক লিখলে এর মধ্যে কোনো না কোনোটি টিকে যেতে পারে; অল্প লিখলে এর সম্ভাবনা কমে যায়। তিনি বেশ কয়েকজন বিখ্যাত লেখকের নাম লিখেছিলেন, যাঁরা অনেক বই লিখেছেন। বহু লেখাকে তিনি আনন্দের সঙ্গেই গ্রহণ করেছিলেন। মূলত তরুণ পাঠকদের লক্ষ করে স্ববৈশিষ্ট্যে একের পর এক বই লেখার কারণে বাংলাদেশে নবপ্রজন্মের মধ্যে আবার ‘পাঠের আগ্রহ’ তৈরি হয়। এই আগ্রহ অগ্নির লেলিহানের মতো হয়ে উঠলে হুমায়ূন আহমেদের একার পক্ষে এত বই লেখাও সম্ভবপর ছিল না। তাই গড়ে ওঠে একদল তরুণ কথাসাহিত্যিক, যাঁরা মূলত সব দিক থেকে হুমায়ূন আহমেদেরই ছায়া-অনুসারী। হুমায়ূন আহমেদের ধারায় গ্রন্থ লিখে তাঁদের অনেকেই অল্পতে খ্যাতি পান, বিত্তও আসে তাঁদের ঘরে।

হুমায়ূন আহমেদের লেখায় ‘সেন্স অব হিউমার’ এক পরিমার্জিত ধারায় সঞ্চারিত। তিনি যখন চরিত্রের মুখ দিয়ে ‘কী সুন্দর’ না বলিয়ে ‘কী সৌন্দর্য’ বলান, তখন বিশেষণটি বিশেষ্য হওয়ার কারণে নয়, উপস্থাপনার জন্যই তা পাঠকের হৃদয়চিত্তে হাস্যরসের সৃষ্টি করে। তিনি তাঁর রচনায় ভূতপ্রেতকে বৈজ্ঞানিকতার পরম্পরায় তুলে ধরেছেন। তাই তাঁর ভূতের গল্পগুলো আসলে হয়ে উঠেছে বিজ্ঞানমনস্কতার গল্প। তিনি হিমু, মিসির আলি, শুভ্র—অন্তত তিনটি স্মরণযোগ্য চরিত্র নির্মাণ করেছেন, যে চরিত্রগুলো পাঠককে নানা মাত্রায় ভাবায়। যেমন—শুভ্র শতভাগ সচ্চরিত্র, মিসির আলি রহস্যে ঘেরা চরিত্র আর জীবন সম্পর্কে উদাসীন হিমু চরিত্র। যাত্রায় যেমন ‘বিবেক’ থাকে, লোকধারার লেখায় যেমন থাকে শাশ্বত বাণীবহ কোনো ইঙ্গিত, হুমায়ূন আহমেদের রচনায় তেমনি প্রায়ই তিনি একটি এমন চরিত্র নির্মাণ করেন যে চরিত্রের মুখ দিয়ে একটি শুভবোধের বাতাবরণ রাখা যায়। এই শুভবোধের কারণে হুমায়ূন আহমেদের রচনা পাঠ করলে অথবা তাঁর সৃষ্ট চিত্র বা চলচ্চিত্র দেখলে মন বিষিয়ে ওঠে না, কুচিন্তা জাগে না মনে।

হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক ‘বড় ক্যানভাসে’র উপন্যাস লিখবেন বলে প্রথম জীবনে ভেবেছিলেন। কিন্তু সে ভাবনা পূরণ হয়নি। গত শতকের আশির দশকে স্বৈরাচার জেনারেল এরশাদ যখন রাষ্ট্রক্ষমতায়, মাওলানা মান্নানসহ স্বাধীনতাবিরোধীরা যখন সেই ক্ষমতার অংশীদার—এসবের প্রতিবাদে দেশজুড়ে যখন প্রতিদিন আন্দোলন চলছে, তখন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ‘বিটিভি’তে প্রচার করা হয় তাঁরই নাটক ‘বহুব্রীহি’। এই নাটকে একটি টিয়ে পাখির মুখ দিয়ে ‘তুই রাজাকার’ ধ্বনির উচ্চারণ ছিল সেনাশাসনকবলিত তৎকালীন বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের আন্তরিক উচ্চারণের প্রতিধ্বনি। রাজনৈতিক দলগুলো যা করতে পারেনি, একজন লেখক হুমায়ূন আহমেদ প্রতীকের মাধ্যমে একটি টিয়ে পাখির মুখ দিয়ে তা করে দেখিয়ে দেন। এমন প্রতীকের ব্যবহার করতে দেখা গেছে আইয়ুব খানের শাসনামলে শওকত ওসমানকে, তাঁরই উপন্যাস ‘ক্রীতদাসের হাসি’তে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ‘বহুব্রীহি’র এই অংশটুকুই যেন হয়ে উঠল ‘ক্রীতদাসের হাসি’র প্রতীকী প্রতিবাদের শব্দরূপ। আসলে হুমায়ূন আহমেদ এক আধারে বন্দি হয়ে থাকেননি। তিনি সাহিত্য থেকে চিত্র ও চলচ্চিত্র জগতেও ব্যাপক অবদান রেখেছেন। সেখানেও মিশেছেন বহু মানুষের সঙ্গে, সৃষ্টি করেছেন নবশিল্পের দ্যোতনা।  

 

লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ

উপদেষ্টা, টিএসসি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



মন্তব্য