kalerkantho


সাদাকালো

সংলাপ ও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খতিয়ান

আহমদ রফিক

৮ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সংলাপ ও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খতিয়ান

সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রধান দুই জোটের সংলাপে বসা নিয়ে কদিন আগেও ঢাকা মহানগর ছিল উত্তেজনায় ঠাসা। সম্ভাবনা, প্রত্যাশা ইত্যাদি নিয়ে পরস্পরবিরোধী নানা বক্তব্য তথা ভবিষ্যদ্বাণী। তবে অতি বাস্তববাদী রাজনৈতিক বিশ্লেষক কেউ কেউ সাফল্যের ঘোড়ায় বাজি ধরতে রাজি নন।

তবু দুই পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক ফ্রন্টের নির্বাচন উপলক্ষে আলোচনার টেবিলে মুখোমুখি বসাই তো একটি ইতিবাচক ঘটনা। কারণ এর আগে, দীর্ঘকাল আগে হলেও বিএনপি সংলাপে বসার ক্ষেত্রে রেখেছিল নেতিবাচক ভূমিকা। কারো মতে, নিজের হাতে-পায়ে কুড়াল মারার মতো ঘটনা।

এরই মধ্যে রাজধানীর বুড়িগঙ্গা দিয়ে অনেক পানি বয়ে গেছে (যদিও দূষিত কৃষ্ণবর্ণ স্রোত)। বিএনপির রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে তাদের জোটসহ। মামলা হামলায় জেরবার (বলা যায় বিধ্বস্ত) বিএনপি। তাই নতুন করে ঐক্যফ্রন্ট গঠন (জোট থাকা সত্ত্বেও) ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে রাজনীতিবিদ সর্বজনাব রব, মান্না প্রমুখের সঙ্গে।

আমাদের বিশ্বাস, সরকারি জোটের সঙ্গে সম্প্রতি বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের রাজনৈতিক-নির্বাচনী সংলাপে বসার কূটনীতির মধ্যমণি ড. কামাল হোসেন। তিনি বরাবরই নমনীয়, সহিষ্ণু বৈশিষ্ট্যের রাজনীতিবিদ—চড়া, কড়া ধাঁচের কখনোই নন। বিএনপি জোটের বর্তমান অবস্থাই হয়তো তাঁকে সংলাপের উদ্যোগ নিতে প্রেরণা জুগিয়েছে।

তবু কিছু কিছু আভাস-ইঙ্গিতে বুঝতে কষ্ট হয় না যে সংলাপের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিএনপি নেতৃত্ব খুব যে আশাবাদী ছিলেন, তা কিন্তু নয়। মাঝেমধ্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুখ ইসলাম আলমগীরের মন্তব্য থেকে তা অনুমান করা চলে। তবু অবস্থাদৃষ্টে সংলাপ তাঁদের মেনে নিতে হয়েছে বলে আমাদের বিশ্বাস। বিশেষ করে ঐক্যফ্রন্ট নেতা যখন সংলাপে বিশেষভাবে আগ্রহী, তখন তা মেনে নিতেই হয়, ফলাফল যা-ই হোক। এরপর তাঁরা সমঝোতাবিরোধী এমন অভিযোগ কেউ করতে পারবেন না।

দুই.

উদ্যোগটি ছিল পুরোপুরিই ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেনের। তিনিই চিঠি পাঠিয়েছিলেন আলোচনার। যে কারণেই হোক আওয়ামী লীগ তা প্রত্যাখ্যান করেনি। হয়তো আন্তর্জাতিক হাওয়ার ধরন-ধারণ লক্ষ করে। কারণ তাঁরা বরাবরই বলে আসছেন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা। এমনকি প্রায় অনুরূপ কথা দু-একবার বলেছে ভারতও।

তাই নভেম্বরের শুভ শুরুতে (বৃহস্পতিবার) গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রথম দফা সংলাপ হয়ে গেল। দমচাপা বাতাস যেন মুক্তি পেল। প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ও জোট পরস্পরের সঙ্গে কথা বলবে না, পরস্পরের মুখ দেখবে না—এটা গণতান্ত্রিক সংসদীয় রাজনীতির রীতিনীতি নয়। গণতন্ত্রবাদী ড. কামাল হোসেন বরফ গলানোর কাজটি করেছেন।

তাই রাজনীতিমনস্ক মানুষ মাত্রেরই প্রবল সমর্থন এই সংলাপের পক্ষে, প্রত্যাশাও যার যার মতো। সেটা যেমন দলের ক্ষেত্রে, তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনের পক্ষে, বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রেও। এরই মধ্যে সংলাপ শেষের সূত্র ধরে টিভিতে রাজধানীর কথিত বিশিষ্ট নাগরিকদের মূল্যবান মতামতে মহানগর সরগরম।

এ বিষয়ে আমরা নেতিবাচক ভূমিকায় যেতে চাই না। এর আগেও আমাদের মন্তব্য ছিল : ‘বিএনপি সংলাপে না গিয়ে মস্ত ভুল করেছে।’ বাস্তবিক ঘটনা তেমনই ছিল। পরবর্তী পরিস্থিতি এ সত্যই প্রমাণ করেছে। তাই বলে এমন কথাও নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে সংলাপে বসলেই সব সমস্যার সমাধান ঘটবে।

সংলাপে সফলতা-ব্যর্থতা দুই-ই সমান পরিণাম তৈরি করতে পারে। অবিভক্ত ভারতে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংলাপ দুই-দুইবার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল (১৯৪২, ১৯৪৬)। পরে ১৯৪৭ সালে বাধ্যতামূলক সমাধান। পরিণামে দেশ পরাধীনতামুক্ত ও দেশভাগ প্রবল রক্তস্রোতে, অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ও বাস্তু ত্যাগে। এখানে অবশ্য ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এবং তা মূলত নির্বাচনবিষয়ক। কাজেই পূর্বোক্ত উদাহরণ এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবু ঘটনার সাধারণ সত্য বলে কিছু পরিণাম তো থাকেই, যা রীতিনীতিসিদ্ধ।

তিন.

কেউ যদি গভীর মনোযোগে সংলাপের সম্ভাবনা ও প্রাপ্তি নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করেন তাহলে দেখা যাবে, রাজনৈতিক শিষ্টাচার মেনে সংলাপ সৌজন্যমূলক পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু পরিণামে তা আপাতত কোনো বিশেষ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বহন করে না। একটি দৈনিকের তাৎপর্যপূর্ণ শিরোনাম—সংলাপ শেষে : ‘পরিবেশ ছিল আন্তরিক/অবস্থানে অনড়’।

সংলাপ শেষে দুই পক্ষের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি আমলে আনলে দেখা যায়—প্রতিক্রিয়ার ধরনটি ছিল কূটনৈতিক সৌজন্যের রাজনৈতিক তাৎপর্যের নয়। আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে গিয়ে ড. কামাল হোসেনের সংক্ষিপ্ত জবাব—‘ভালো’। সেই সঙ্গে এমন মন্তব্যও ফলপ্রসূ হবে। অর্থাৎ ভবিষ্যৎকাল (ফিউচার টেন্সে) বিবেচনায় কথা বলা।

মজাটা হলো একই প্রতিনিধিদলের অন্যতম প্রধান সদস্য বিএনপি মহাসচিবের মন্তব্যটি নেতিবাচক : ‘আমরা সন্তুষ্ট নই’। তাহলে ব্যাপারটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াল? এক যাত্রায় পৃথক ও বিপরীতধর্মী প্রতিক্রিয়া। এর মূল কারণ সংলাপে বিএনপি মহাসচিব উত্থাপিত ৭ দফা কানে তোলেনি আওয়ামী লীগ। তাই এ প্রতিক্রিয়া বিএনপি মহাসচিবের একটি বিষয়, অনুমানসাপেক্ষ হলেও লক্ষ করার মতো যে ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেনের প্রধান লক্ষ যেকোনোভাবে হোক একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, দুর্নীতিমুক্ত নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। অন্যদিকে বিএনপির অন্যতম প্রধান লক্ষ দলনেত্রী খালেদা জিয়ার কারাগার থেকে মুক্তি, যা প্রায় অসম্ভব একটি প্রাপ্তি। তবে ওই যে বলে, রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই।

অন্যদিকে সংলাপের প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যা বলেছেন তার মর্মার্থ হলো, প্রধানমন্ত্রী অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস দিয়েছেন, বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার আশ্বাস দিয়েছেন ইত্যাদি। কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতাদৃষ্টে বিএনপি সে আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে পারছে না। অন্যদিকে তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ড. কামাল হোসেনও সাংবাদিকদের যা বলেছেন তা মূলত নেতিবাচক।

তিনি বলেছেন, তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আলোচনা হয়েছে। তাঁদের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও প্রত্যাশামূলক বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর ভাষায় ‘আমরা বিশেষ কোনো সমাধান পাইনি’। তবে এটাও সত্য যে কোনো সংলাপেই এক বৈঠকে সমাধান আসে না। প্রয়োজন পড়ে ধারাবাহিক একাধিক বৈঠকের, আলাপ-আলোচনার।

সংলাপের পরিণাম নিয়ে মনে হয় আওয়ামী লীগ সন্তুষ্ট। তাদের বক্তব্য থেকে তেমনটিই মনে হয়। এ প্রসঙ্গে বলার অপেক্ষা রাখে না যে আপাতত প্রথম বৈঠকে আওয়ামী লীগের সফলতা অনেকটা দুইধারী হাতিয়ারের মতো। একদিকে এই সংলাপে সাড়া দিয়ে, চমকপ্রদ আয়োজনে বসে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলকে তাঁরা আশ্বস্ত করতে চেয়েছেন এই বার্তার মাধ্যমে যে তাঁরা রাজনীতির সমাঝোতায় বিশ্বাসী—যুক্তিহীন অন্ধ বিরোধিতায় নয়।

অন্যদিকে স্বদেশেও রাজনৈতিক মহলে একই বার্তার সুবাতাস পৌঁছে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী প্রথম বিএনপি জোট ও ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপে বসে অনেক আশ্বাসের কথা বলে, যা গণতান্ত্রিক রীতিনীতিসম্মত। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি যে আদালতের এখতিয়ারভুক্ত তাও স্পষ্ট করে দিতে কসুর করেননি। কিন্তু তাঁরা যেহেতু ক্ষমতাসীন, নির্বাচন তাঁদের শাসনাধীনে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে, সে ক্ষেত্রে তাতে তাঁদের হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ক্ষমতার তাসগুলো তাঁদের হাতেই থাকছে। শেষোক্ত দিকটিতে তাঁদের অব্যর্থ বিজয়।

এ সূক্ষ্ম বিষয় সাধারণত আন্তর্জাতিক মহল আমলে আনে না। তারা গণতন্ত্রের মোটাদাগের বিষয়গুলো অর্জিত হলেই সন্তুষ্ট। তাই এ ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগের আরেক দফা জয়। এ বিষয়গুলো যে ড. কামাল হোসেনের মতো প্রবীণ আইনজ্ঞ বোঝেন না তা নয়। কিন্তু কাদায় পড়া বিএনপি রাজনীতিকে নির্বাচনী ময়দানে যথাযথভাবে আনতে গেলে অনেক ঝামেলার মুখোমুখি তাকে হতে হবে। পোড়াতে হবে অনেক কাঠখড়, কাজেই সংলাপ নিয়ে সংবাদপত্রগুলো (এক-আধটি ব্যতিক্রম বাদে) বা সুধীজন বুদ্ধিজীবী যতই আবেগ ঝরান না কেন বাস্তবতা বড়ই কঠিন, কথিত ‘সমস্যার সমাধান’ ততোধিক কঠিন। কারণ নিয়মমাফিক প্রতিটি দলই চাইবে যেকোনো মূল্যে তার রাজনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করতে। তাই ড. কামাল হোসেন এবং বিএনপি চাইছে আরো বৈঠক, একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে ন্যূনতম সমঝোতায় পৌঁছাতে। আওয়ামী লীগও তাতে আপত্তি জানায়নি, বরং আশ্বাস দিয়েছে ভবিষ্যৎ বৈঠকের। গতকাল দ্বিতীয় দফা সংলাপ হয়ে গেছে।

সংলাপের অর্জন, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হাল খতিমান নিয়ে আমাদের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে একটি দৈনিকের ছোট্ট একটি শিরোনামের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, যা হলো—‘উত্তাপে পানি ঢেলে দিল আ. লীগ’। এর অর্থ নির্বাচন নিয়ে যে উত্তাপ সঞ্চিত হয়েছিল রাজনৈতিক আবহে তার অনেকটাই ঠাণ্ডা হবে সংলাপের প্রক্রিয়ায়। কিন্তু কথাটির তাৎপর্য অনেক গভীর।

আওয়ামী লীগ এখন নির্বাচন নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে, তফসিল ঘোষণা ইত্যাদি নিয়ে। বাতাস অনেকটা তাদের পালে। বিএনপি এটা বুঝেই অসন্তুষ্ট। তাই তারা দুটি বিকল্প হাতে রাখতে চাইছে। সংলাপে সমাধান না এলে দাবি আদায়ে আন্দোলন।

‘বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে যুক্তফ্রন্ট’—একটি দৈনিকে এমন শিরোনামের সঙ্গে অনেকেই একমত। যদিও ভিন্নমত যে নেই এমন নয়। তবে বিকল্প ধারায় আন্দোলনের কথা যতই বলুক বিএনপি, বর্তমান পর্যায়ের সমঝোতা-আবহে এবং সংলাপের বাধ্যবাধকতায় বিকল্প পথ ধরা বিএনপির পক্ষে সহজ হবে না। পরিস্থিতি চরম সংকটজনক না হলে ড. কামাল হোসেনও সহজে বিচ্ছিন্নতার পথ ধরবেন বলে মনে হয় না।

কাজেই সংলাপ নিয়ে শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। পরবর্তী বৈঠক বা বৈঠকগুলোর ফলাফলের ওপর তা নির্ভর করছে। অবস্থা বায়বীয় না হলেও তরল তো বটেই। শেষ কথা হলো, গোটা বিষয়টির সমাধান নির্ভর করছে উভয় পক্ষের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার ওপর। শেষ সত্য জানতে কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে আমাদের।

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী



মন্তব্য