kalerkantho


যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ও ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ

গাজীউল হাসান খান

৫ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ও ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ

যুক্তরাষ্ট্রব্যাপী ৬ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনটি ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদলীয় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গত দুই বছরের কর্মকাণ্ডের ওপর একটি গণভোট বলে বিবেচনা করছে ভোটাররা। চার বছর মেয়াদি প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক জীবনে দুই বছর পর অনুষ্ঠেয় এ মধ্যবর্তী নির্বাচনটিই নির্ধারণ করবে আগামী দুই বছর প্রশাসনিকভাবে তিনি কী করতে পারবেন। সাংবিধানিকভাবে প্রেসিডেন্টের প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলোর বাস্তবায়ন অনেকটাই নির্ভর করে কংগ্রেসের দুই কক্ষে তাঁর দলীয় শক্তি। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর। বিগত দুই বছর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুই কক্ষেই রিপাবলিকান দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। বর্তমানে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হলে ডেমোক্রেটিক দলকে প্রতিনিধি পরিষদে আগের তুলনায় ২৩টি আসন ও সিনেটে আরো দুটি আসনে বিজয়ী হতে হবে। ৬ নভেম্বর প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টির সবকটিতে এবং সিনেটে ১০০টির মধ্যে ৩৫টি আসনে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এতে বিরোধী দল হিসেবে ডেমোক্র্যাটরা তাদের কাঙ্ক্ষিত সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করতে সক্ষম হবে বলে গণমাধ্যমসহ অন্যান্য তথ্যাভিজ্ঞ মহলের ধারণা। বিগত বছরগুলোতে মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিরোধী দলকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় লাভ করতে দেখা গেছে। এবার সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা কাঙ্ক্ষিত দুটি আসনে বিজয়ী হতে না পারলেও প্রতিনিধি পরিষদে বিজয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে আমেরিকান গণমাধ্যম মনে করে। তাতে বর্তমান রক্ষণশীলদলীয় বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনিকভাবে অর্থাৎ বিভিন্ন আইন পাস করার ব্যাপারে হাত-পা বাঁধা পড়তে পারে। বিগত ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জেতানোর জন্য রাশিয়ার অভিযুক্ত হস্তক্ষেপ ও সাইবার কারসাজি, প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন নারীঘটিত কেলেঙ্কারি এবং বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যবহার করে ব্যাবসায়িক ফায়দা ওঠানোসংক্রান্ত অভিযোগের বিরুদ্ধে অভিশংসন  (Impeachment) প্রস্তাব আনা হতে পারে। তার জন্য বিরোধী ডেমোক্রেটিক দলের অন্তত প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকতে হবে। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিগত দিনগুলোতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন বিতর্কিত ও অপরিণামদর্শী পদক্ষেপ এবং কর্মকাণ্ডের ফলে বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব বলে অনেকে মনে করেন। তাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ারও একটা আশঙ্কা দেখা দেবে। যদি সেই সংকট থেকে কোনোমতে তিনি বেঁচেও যান, তাহলেও প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে তাঁর পক্ষে কোনো আইন পাস করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে, অর্থাৎ তাঁকে অনেকটা অকার্যকর রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাকি সময়টা পার করতে হবে।

ওপরে উল্লিখিত পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের বেশ আগে থেকেই শক্তভাবে মাঠে নেমেছিলেন ট্রাম্প। তিনি তাঁর দলের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সদস্যদের (পরিষদ ও সিনেটে) পুনর্নির্বাচনের জন্য বিশেষ করে ওহাইয়ো, পেনসিলভানিয়া, ফ্লোরিডা, মনটানা ও টেক্সাসসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে এরই মধ্যে বেশ কিছু গণজমায়েত ও সভায় ভাষণ দিয়েছেন। সেসব সভায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথমেই আক্রমণ করেছেন গণমাধ্যমকে। তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমে পরিবেশিত তথ্যকে ‘ফেক নিউজ’ বা ভুয়া খবর বলে উল্লেখ করে গণমাধ্যমকে জনগণের শত্রু হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তের দিকে প্রায় পাঁচ হাজার ছুটে আসা সম্ভাব্য অভিবাসীর কাফেলাকে ‘আক্রমণকারী’ এবং ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের আগমনকে ঠেকানোর জন্য দক্ষিণ সীমান্তজুড়ে মোতায়েন করেছেন এক হাজার ৫০০ মার্কিন সৈন্য। প্রয়োজন হলে তাদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে গুলি করার ভয় দেখানো হয়েছে। তা ছাড়া একই সময়ে আরো একটি হুমকি দিয়েছেন যে আমেরিকার বৈধ নাগরিক নয়, অথচ তেমন মানুষের আমেরিকাতে জন্ম নেওয়া সন্তান-সন্ততিদের জন্মগত নাগরিকত্বের অধিকার বাতিল করা হবে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের এ অধিকার  (birth right citizenship) দেশের ১৫০ বছর পুরনো সংবিধানে নিশ্চিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে আইন হিসেবে এটি বাতিল করতে না পারলে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাবলে (Executive Order) তা কার্যকর করার হুমকি দিয়েছেন। অথচ এ বিষয়টি নিয়ে তাঁর দলের প্রতিনিধি পরিষদে স্পিকার পল রায়ানের সঙ্গেই ট্রাম্পের বিতর্ক সৃষ্টি হয়ে গেছে। আমেরিকা অভিবাসীদের দেশ হলেও এত দিন অশ্বেতাঙ্গদের অভিবাসনসংক্রান্ত বিষয়টি ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান দলের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচনী ইস্যু। রিপাবলিকান দলের শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা অশ্বেতাঙ্গ মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব দেওয়ার পক্ষপাতী নয়। তারা অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসনপ্রত্যাশী মানুষকে ‘জানোয়ার’ বলেও উল্লেখ করেছে। তারা শুধু মুসলিম সম্প্রদায় কিংবা কিছু মুসলিম দেশের মানুষের অভিবাসনেরই বিরোধী নয়, তথাকথিত শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের সাম্প্রতিক স্লোগান ছিল ‘ইহুদিদের আমাদের স্থলাভিষিক্ত হতে দেব না’। সেই অবস্থার সূত্র ধরে কি না জানা যায়নি; তবে সম্প্রতি পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গের একটি সিনেগগে প্রবেশ করে জনৈক উগ্র শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি ১০ জন ইহুদি ধর্মাবলম্বী বয়োজ্যেষ্ঠ নিরপরাধ মানুষকে গুলি করে হত্যা করেছে। তারপর সে ঘটনাস্থল সফরে এলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিরাট বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে ট্রাম্পের জামাতা জেরেড কুশনার এবং কন্যা ইভানকা—দুজনেই ইহুদি ধর্মাবলম্বী। অথচ এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমেরিকাব্যাপী অশ্বেতাঙ্গ মানুষের মধ্যে যথেষ্ট ভয়-ভীতির সৃষ্টি হয়েছে, যাতে তারা ভোটকেন্দ্র থেকে দূরে থাকে। তাতে মুসলিম সম্প্রদায়, হিসপানি, লাতিনো ও কৃষ্ণাঙ্গরা অনেক জায়গায় আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল, বাদ পড়েনি রাজনৈতিক দিক থেকে প্রভাব ও বিত্তশালী ইহুদিরাও। শুধু তা-ই নয়, মধ্যবর্তী নির্বাচনের কিছুদিন আগে থেকে ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের, বিশেষ করে সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারি ক্লিনটন, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, চিত্রশিল্পী রবার্ট ডি নিরুসহ সংবাদমাধ্যম সিএনএনের নিউ ইয়র্ক সেন্টারে পার্সেল বোমা পাঠানো হয়েছিল। এসব গণবিরোধী কর্মকাণ্ডের পেছনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রভাব যথেষ্ট পরিমাণে কাজ করেছে বলে সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন বিশ্লেষকের অভিযোগ। অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, ট্রাম্পের মতো ঘৃণ্য-নৈতিক আচরণসম্পন্ন একজন অরাজনৈতিক মানুষ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন কিভাবে?

মধ্যবর্তী এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানার জন্য শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর রক্ষণশীল রিপাবলিকান দলের কিছু নেতা সাম্প্রদায়িক মনোভাব এবং কর্মকাণ্ড উসকে দেওয়ার জন্য টেলিভিশনসহ বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপন দিয়ে মেক্সিকোসহ দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও সমাজবিরোধী চক্রকে যুক্তরাষ্ট্রে এনে ডেমোক্রেটিক দল এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে অপেক্ষমাণ অগণিত মানুষকে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে এনে সব কিছু ওলটপালট করে দেওয়ার ব্যাপারে ডেমোক্র্যাটরা এক বিরাট চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে বলে তাঁরা দেশব্যাপী এক বিশাল প্রচারাভিযানের সূত্রপাত করেছেন। রিপাবলিকান রক্ষণশীল শিবিরের অভিযুক্ত চক্রান্তকারীরা জর্জ সরোস নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে গণ-অভিবাসনের পরিকল্পনার জন্য দায়ী করেছেন। সরোস ডেমোক্রেটিক পার্টির সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে জড়িত ইহুদি সম্প্রদায়ের একজন মান্যগণ্য ব্যক্তি। কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়া সে ধরনের প্রচারাভিযান চালিয়ে যাওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে এক দাঙ্গা-হাঙ্গামার রাজনীতি চালু করা। এ ধরনের পাল্টা অভিযোগ করে গেছে ডেমোক্র্যাটরা। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট ধনী ব্যবসায়ী টন স্টেয়ার ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী তহবিলে বিরাট অঙ্কের অর্থ প্রদান করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান দলের অভিযুক্ত ‘রাজনৈতিক সন্ত্রাস’ বন্ধ করার উদ্দেশে। এ অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ডেমোক্রেটিক পার্টির সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারি ক্লিনটন বলেছেন, ট্রাম্পের নেতৃত্বে রিপাবলিকানদের  এ ধরনের অপপ্রচার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিবষ্টকারী ও বর্ণবাদী দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী রাজনীতি বন্ধ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটে অর্থাৎ সম্ভব হলে দুপক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করা। এর আগে রিপাবলিকান দলের দাঙ্গাবাজ গোষ্ঠীটিকে সব শক্তি দিয়ে মোকাবেলা করতে হবে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উৎসাহে মাঠে নামা অভিযুক্ত ‘শ্বেত সন্ত্রাসকে’ জনমত গঠন করে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলা করার জন্য নির্বাচনের ময়দানে নেমেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও অসামান্য বাগ্মিতার অধিকারী বারাক ওবামা, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ডেমোক্রেটিকদলীয় প্রগতিশীল রাজনীতিক ও সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সসহ অনেকে। উল্লিখিত নেতারা বিভিন্ন রাজ্যে অনুষ্ঠিত গণজমায়েতে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইতিহাসের এক চরম সংকটজনক অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। এখানে অবিলম্বে একটি পরিবর্তন আবশ্যক, যা উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদ ও অশুভ বিভক্তির রাজনীতি কাটিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার, সবার জন্য ব্যয়সাধ্য স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করে সবাইকে উন্নত সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কর্মক্ষেত্রে বিরাজিত বিভিন্ন বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি নারী ও পুরুষের জন্য সমান সুযোগ ও মজুরির ব্যবস্থা করবে। প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেট আসনের জন্য নির্বাচনে অংশ নেওয়া ডেমোক্রেটিকদলীয় প্রার্থীরা মূলত সাধারণ মানুষের বিভিন্ন বাস্তবভিত্তিক দাবিদাওয়া নিয়েই সোচ্চার প্রচারাভিযান চালিয়ে গেছেন। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বেশির ভাগ নতুন প্রার্থীই এসেছেন সংগ্রামী মহিলাদের মধ্য থেকে। তা ছাড়া সিনেট আসনে দুই দলের মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে নেভাদা, আরিজোনা, টেনাসি ও টেক্সাস রাজ্যে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে উৎসাহী যুক্তরাষ্ট্রের সবার দৃষ্টি পড়ে আছে সেই রাজ্যগুলোর ওপর। টেক্সাসের রিপাবলিকান দলীয় সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সিনেটর ট্রেড ক্রুজের বিরুদ্ধে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন ডেমোক্রেটিক দলের ও’রৌরকি। রিপাবলিকানদের লাল রঙে চিত্রিত রক্ষণশীল দক্ষিণে ও’রৌরকির অবস্থান এমনই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে শেষ পর্যন্ত ট্রেড ক্রুজের সাহায্যার্থে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সেখানে বিশেষ গণজমায়েতের আয়োজন করতে হয়েছে। ও’রৌরকি সাধারণ মানুষের বিভিন্ন স্থানীয় আর্থ-সামাজিক সমস্যা ও দাবিদাওয়া নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। আরিজোনাতে রিপাবলিকান দলীয় সিনেটর মার্থা ম্যাকগানকে হারিয়ে ডেমোক্রেটিক দলীয় প্রার্থী ক্রিস্টেন সিনেমা নির্বাচিত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তা ছাড়া জর্জিয়া রাজ্যে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী লুসি ম্যাকরেথ রিপাবলিকান দলীয় ক্ষমতাসীন ক্যারেন হ্যান্ডেলকে হারাতে পারেন বলে আভাস দিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যম। নিউ ইয়র্কে ডেমোক্র্যাট মিরান্ডা হবস কেড়ে নিতে পারেন নিউ ইয়র্কের ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দলীয় অ্যান্ড্রু কমোর গভর্নরের পদটি। তদুপরি এই নিউ ইয়র্কেই ২৮ বছর বয়সী আলেকজান্দ্রিয়া অকাসিও-কর্টেজ ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে ১০ বারের নির্বাচিত রিপাবলিকান জো ক্রলিকে হারিয়েছেন। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টিতে মহিলা প্রার্থীদের প্রভাব ও আধিক্য উল্লেখযোগ্যভাবে লক্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। সে কারণে অনেক রিপাবলিকান দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থী এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে দূরে সরে রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রব্যাপী এবার প্রথম থেকেই ডেমোক্রেটিক দলীয় প্রতিনিধি পরিষদের প্রার্থীদের যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখা গেছে। জনপ্রিয়তার দিক থেকে রিপাবলিকানদের তুলনায় তাঁদের অনেকেই এগিয়ে ছিলেন।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে বিভেদ সৃষ্টিমূলক কর্মকাণ্ড, বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক উসকানি, নারী কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক অপকৌশলের কারণে তিনি এরই মধ্যে মহিলা সম্প্রদায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সমর্থন হারিয়েছেন বলে গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। তা ছাড়া মুক্তবাজার অর্থনীতির বিরোধিতা, বহুপাক্ষিক বাণিজ্যব্যবস্থা সমর্থন না করা, পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবের কারণে শিক্ষিত শ্বেতাঙ্গ পুরুষ সম্প্রদায়ের মধ্যেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন অনেক কমে গেছে। মুক্তবিশ্ব ও মুক্তবাণিজ্যে বিশ্বাসী যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা, বিশেষ করে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় মনে করে, ট্রাম্প এ দেশটিকে বিশ্বসমাজের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষয়িষ্ণু বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা আবার স্থায়ী করে নিচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বেচ্ছাচারী, অপরিণামদর্শী ও অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে। যুক্তরাষ্ট্রে অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীরা ট্রাম্পকে এখনো ধরে রেখেছে। তথাকথিত শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী, নব্য নাৎসিবাদী বর্ণবাদী ক্লু ক্লাক্স ক্ল্যান এবং বিকৃত রুচিসম্পন্ন সমকামীরা সবাই যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে। প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতাহীন এবং চারিত্রিক ও নৈতিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে বেপরোয়া এমন একটি মানুষকে কী করে যুক্তরাষ্ট্রবাসী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতে পারে, এখন তা নিয়ে বিতর্কে অনেকেই সোচ্চার বিশ্বব্যাপী। তাঁর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পেছনে রাশিয়ার সরাসরি হস্তক্ষেপ ও তাদের সাইবার কারসাজিকে দায়ী করেন অনেকে। সে বিষয়টি নিয়ে এখন বিশিষ্ট আইনজীবী ও এফবিআইয়ের সাবেক পরিচালক রবার্ট মুলার তাঁর বিশেষ কাউন্সিলে এখনো তদন্ত অব্যাহত রেখেছেন। সম্ভবত এ মধ্যবর্তী নির্বাচনের কিছুদিন পরই রবার্ট মুলারের তদন্তের রিপোর্ট পাওয়া যেতে পারে। সেদিকে এখন অনেকের দৃষ্টি পড়ে রয়েছে। তা ছাড়া মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের ওপরও অনেকখানি নির্ভর করছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসনের বিষয়টি। রবার্ট মুলারের তদন্ত নিয়ে চিন্তাযুক্ত হয়ে পড়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও। এ তদন্তের সূত্র ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেমন অভিশংসন প্রস্তাব মুভ করা হতে পারে, তেমনি রুশ রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিয়ে মিথ্যাচারের জন্য তাঁর পুত্র ট্রাম্প জুনিয়র এবং জামাতা জেরেড কুশনারের জেল হতে পারে বিভিন্ন মেয়াদে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখে কিছু বোঝা না গেলেও এ সার্বিক বিষয়টি যে তাঁকে মানসিক দিক থেকে অস্থির করে তুলেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে কারণেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন প্রক্রিয়া, শ্বেতাঙ্গদের সমর্থন এবং কংগ্রেসে তাঁর দলের অবস্থানের বিষয়টি নিয়ে এতটা উদগ্রীব ও অস্থিরচিত্ত হয়ে উঠেছেন। তা ছাড়া দেশের দক্ষিণ সীমান্তে অবস্থানকারী সম্ভাব্য ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ব্যাপারে তিনি বিশেষভাবে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। সীমান্তে অবস্থানকারীরা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করলে তাদের ওপর গুলি চালানোর হুমকি দিতেও কসুর করেননি তিনি। তাঁর ধারণা, এতে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত জাতীয়তাবাদী শক্তি কিংবা বৃহত্তর অর্থে দেশপ্রেমিকদের মধ্যে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়বে এবং প্রয়োজন হলে তারা দেশব্যাপী ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে বা সমর্থনে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করবে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি ভিন্নভাবে পরস্ফুিট হয়ে উঠছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন চল্লিশের কোটা থেকে আরো ৪-৫ শতাংশ কমেছে বলে গ্যালপপুলের এক সাম্প্রতিক জরিপে প্রকাশ পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের অতীত ইতিহাসে দেখা গেছে, কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার হার ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে তাঁর দল প্রতিনিধি পরিষদের ৩০ থেকে ৩৫টি আসন হারিয়ে ফেলে। সেই হিসাবে দেখা যাচ্ছে ডেমোক্রেটিক দলের প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। তা ছাড়া সিনেটে তাদের দুই থেকে তিনটি আসন পাওয়ার কিছুটা সম্ভাবনা রয়েছে। এ নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দল চায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বাঁচাতে। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর বশংবদরা চান, যেকোনোভাবে মিথ্যাচার ও ভয়ভীতি সৃষ্টি করে তাদের (ডেমোক্র্যাটদের) সমর্থক-ভোটারদের ঠেকাতে। সে কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন হোয়াইট হাউসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কিং কংয়ের মতো বুক চাপড়ে তর্জন-গর্জন শুরু করেন, তখন তাঁর কর্মকর্তারা, রিপাবলিকান দল, সারা দেশ ও পৃথিবী কাঁপতে থাকে। তাঁরা ভাবেন, এরপর কী করতে পারেন প্রেসিডেন্ট? আবার কী ঘোষণা দেবেন ট্রাম্প? এটাই নাকি এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের জেতার প্রধান কৌশল। এ মন্তব্য হোয়াইট হাউসের সাবেক উপদেষ্টা ডোনাল্ড ম্যাকগানের। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটবে কি?

 

লেখক : ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাসে নিযুক্ত সাবেক মিনিস্টার ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

gaziulhkhan@gmail.com

 



মন্তব্য