kalerkantho


দীর্ঘশ্বাসের নাম বেকারত্ব

ড. হারুন রশীদ

১৯ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



দীর্ঘশ্বাসের নাম বেকারত্ব

পৃথিবীর দীর্ঘতম সেতুর নাম নাকি দীর্ঘশ্বাস। আর আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় দীর্ঘশ্বাসের নাম হচ্ছে বেকারত্ব। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার পর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের কথায়ও তার প্রতিধ্বনি পাওয়া বা শোনা গেল। এক সম্মেলনে তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ যত বেশি শিক্ষিত হয় বেকার হওয়ার ঝুঁকি তত বেশি হয়। দেশের মোট যুবকের এক-তৃতীয়াংশ বেকার। বেকারত্ব কমিয়ে আনতে সরকারকে অবশ্যই উদ্যোগ নিতে হবে।’ গত রবিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত যুব সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

বেকারত্ব এক গ্লানিকর অবস্থা সৃষ্টি করেছে। লাখ লাখ বেকার সীমাহীন মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। পরিবার-পরিজন-স্বজনদের কাছে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছে। উপার্জনক্ষম সন্তান থাকার পরও চাকরি না পওয়ায় অর্থনৈতিক সংকটে নিপতিত হচ্ছে পরিবার। এতে দেখা দিচ্ছে হতাশা, যার প্রভাব পড়ছে পরিবারে। সমাজে। ফলে মাদকসহ নানা রকম নেতিবাচক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু সে তুলনায় বেকারত্ব কমছে না। বরং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। এ অবস্থায় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মনোযোগ দিতে হবে।

মনে রাখা প্রয়োজন, পাহাড়সম বেকারত্বের এ দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে শিল্পায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। গড়ে তুলতে হবে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, গ্যাস, বিদ্যুৎ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করাসহ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সহায়ক। এ ব্যাপারে সরকার যত মনোযোগী হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ ততটাই প্রশস্ত হবে।

দুঃখজনক হচ্ছে, যেখানে কর্মসংস্থান বাড়বে সেখানে উল্টো কমছে। এর জন্য নানা কারণকে দায়ী করা হচ্ছে। সহযোগী একটি দৈনিকের এসংক্রান্ত খবরে বলা হয়েছে, বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেও কারখানা তৈরির জন্য জমি পাচ্ছেন না বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা। আবার জমি পেলেও গ্যাসের সংযোগ পাচ্ছেন না অনেকে। যন্ত্রপাতি বসানোর পর গ্যাস সংযোগের অভাবে বসে আছে বহু কারখানা। গ্যাস ও জমির সংকট দূর করতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় কয়েক বছর ধরেই বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দাবস্থা চলছে। অথচ ব্যাংকগুলো প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা নিয়ে বসে আছে। নতুন বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না বেসরকারি উদ্যোক্তারা। ফলে উদ্যোক্তা না পেয়ে এই বিপুল অর্থ নামমাত্র সুদে বিভিন্ন বন্ডে বিনিয়োগ করে রেখেছে ব্যাংকগুলো।

এ ছাড়া বিনিয়োগের জন্য যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নও অত্যন্ত জরুরি। ছয় বছরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কথা ছিল; কিন্তু এক যুগেও তা শেষ হয়নি। জমির সংকট দূর করতে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত মাত্র ১০টি উদ্বোধন করা হয়েছে। ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে দ্রুতগতিতে এগোতে হবে।

তথ্য-প্রযুক্তি খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সবচেয়ে বেশি উপার্জন খাত হবে—এমনটি আশা করা হচ্ছে। এমনও বলা হচ্ছে, এ খাতের আয় পোশাকশিল্পকেও ছাড়িয়ে যাবে। এটা নিঃসন্দেহে আশার দিক। এ জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এগোনোর কোনো বিকল্প নেই। প্রযুক্তি এসে পাল্টে দিচ্ছে সব কিছু। মানুষের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণায় যেমন পরিবর্তন আসছে, তেমনি বদলে যাচ্ছে কর্মক্ষেত্র। উদ্ভব হচ্ছে নতুন নতুন পেশার। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষমতা অর্জন করতে পারলেই শুধু আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নপূরণ সম্ভব হবে। এ জন্য তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তিবান্ধব একটি পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে হবে। হাইটেক পার্কসহ এসংক্রান্ত যেসব প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে দ্রুততার সঙ্গে। আমলাতন্ত্রের বেড়াজালে আটকে থাকলে মুখ থুবড়ে পড়বে সব কিছু। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের যে স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে, সেটিও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। দক্ষ জনশক্তি যদি আমরা রপ্তানি করতে পারি সে ক্ষেত্রেও একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

আয়তনের তুলনায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা অধিক। বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা এক বিরাট কর্মযজ্ঞ। এ জন্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে একসময় জোর দেওয়া হলেও এখন তেমন একটা কার্যক্রম চোখে পড়ে না। যদিও সরকার বলছে, ‘বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবার পরিকল্পনার সেবা দেওয়া বন্ধ করা হয়নি। আগের চেয়ে এখন যোগাযোগব্যবস্থা অনেক ভালো হওয়ায় লোকজন নিজেরাই সেবাকেন্দ্রে চলে আসে। বাড়ি বাড়ি যাওয়ার ততটা প্রয়োজন হয় না। এর পরও প্রয়োজন হলে বাড়ি বাড়ি যাওয়া আরো বাড়ানো হবে।’

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাত হচ্ছে জনশক্তি রপ্তানির খাত। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তারা তাদের শ্রমলব্ধ অর্থ দেশে পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকাকে আরো গতিশীল করছে। বলতে গেলে জনশক্তি রপ্তানি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। এ অবস্থায় বিদেশে নিত্যনতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করে ব্যাপক হারে আরো জনশক্তি রপ্তানির পথ উন্মুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করার পথ সুগম করার জন্য জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিদেশে শ্রমিকরা গিয়ে অনেক সময় অনেক সমস্যার মধ্যে পড়ে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোকে সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় শ্রমিকরা বিপদে পড়েও দূতাবাস কর্মকর্তাদের কোনো রকম সহায়তা পায় না। এতে যে ওই শ্রমিকটি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু তা-ই নয়, দেশও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন থেকে বঞ্চিত হয়। ব্যাপারটি অবশ্যই মাথায় রেখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। এ ছাড়া বিদেশে গিয়ে অনেকেই ইচ্ছা-অনিচ্ছায় নানা রকম অপরাধকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এতে ওই সব দেশে শ্রমবাজার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ জন্য এ ব্যাপারেও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এর সঙ্গে দেশের সুনামের বিষয়টিও জড়িত।

নতুন নতুন শ্রমবাজার যেমন খুঁজে বের করতে হবে, তেমনি বাজার ধরে রাখার জন্যও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আর জোর দিতে হবে দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর দিকে। প্রয়োজনে দক্ষ শ্রমিক সৃষ্টির জন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে আরো জোরোলো পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এই খাত যাতে কিছুতেই কোনো রকম হুমকির মুখে না পড়ে সে ব্যাপারেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

বিদেশে চাকরিপ্রার্থী কেউ যাতে দালাল বা অসাধুচক্র কিংবা সরকারি কোনো কর্মী দ্বারা কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়ে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। যেখানে চাকরিপ্রার্থী, সেখানেই অবৈধ অর্থের লেনদেন—প্রচলিত এই কুসংস্কৃতির বেড়াজাল থেকে আমাদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। জনশক্তি রপ্তানির যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পাশাপাশি তাই দুর্নীতি মাথাচাড়া দেওয়ার সব ফাঁকফোকরও বন্ধ করতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে কোনো শৈথিল্য, অব্যবস্থা, অসাধুতা ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে তাত্ক্ষণিকভাবে তার বা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশ-বিদেশ মিলিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বেকারত্ব নামক দীর্ঘশ্বাস দূর করে দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

harun_press@yahoo.com

 



মন্তব্য