kalerkantho


স্মরণ

মালেক উকিলকে যেমন দেখেছি

মোহাম্মদ হানিফ

১৭ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



মালেক উকিলকে যেমন দেখেছি

ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারের সংগ্রাম, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার যুদ্ধ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের পুনর্গঠনের রাজনীতির উত্তাল ধারায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের যে বিশাল রাজনৈতিক বলয় গড়ে উঠেছিল, সে বলয়ের কেন্দ্রিকতায় বঙ্গবন্ধু তাঁর যে কতিপয় সহকর্মীকে নিয়ে আন্দোলন, সংগ্রাম ও যুদ্ধ পরিচালনার জন্য কমান্ড স্ট্রাকচার তৈরি করেছিলেন, প্রয়াত আবদুল মালেক উকিল তাঁদেরই একজন।

নোয়াখালীতে ১৯২৪ সালের ১ অক্টোবর তাঁর জন্ম। তিনি ইন্তেকাল করেন ১৯৮৭ সালের ১৭ অক্টোবর। তাঁর পিতা ধর্মীয় শিক্ষায় আলেম ছিলেন। পিতার সিদ্ধান্তেই তিনি আহাম্মদিয়া হাই মাদরাসা থেকে হাই স্কুল মানের শিক্ষালাভ করেন। ছাত্র হিসেবে তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। হাই মাদরাসা থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অঙ্কে লেটারসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

স্কুলজীবনেই তিনি জড়িয়ে পড়েন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে। মেধাবী ছাত্রের খ্যাতিবশত নোয়াখালী শহরে স্কুল পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব লাভে তিনি সক্ষম হন।

তা সত্ত্বেও কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক পাস করে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশে তিনি কলকাতা গমন করেন। কিন্তু স্বাধীনতার জন্য তখনো চলমান ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে এবং ভারত বিভক্তির প্রশ্নে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামায় দেশে এক চরম অরাজক অবস্থা সৃষ্টি হয়। এতে সমকালীন শিক্ষাব্যবস্থাও লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। তাই কলকাতায় তিনি লেখাপড়ার সুযোগ পেলেন না ঠিকই, কিন্তু এখানে তিনি ছাত্ররাজনীতির অন্যতম তুখোড় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সাহচর্যে আসেন এবং বাংলার মাটি ও মানুষের স্বার্থ ও স্বাতন্ত্র্যবাদী যে একটা রাজনৈতিক ধারা অবিভক্ত বাংলাদেশে আগে থেকেই চলে আসছিল, তিনি এ সময়ে তাঁর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন।

কলকাতায় এসে আবদুল মালেক উকিল সেই যে শেখ মুজিবের সাহচর্যে এলেন তা আর ছিন্ন হয়নি। শেখ মুজিবের সঙ্গে তাঁর এক আদর্শিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। সে সম্পর্ক তিনি শত উত্থান-পতনের মুখেও আমৃত্যু লালন ও ধারণ করেছেন।

সে যাই হোক, আবদুল মালেক উকিল ১৯৪৭ সালে তদানীন্তন যশোর জেলার মাগুরা কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। ১৯৪৯ সালে তিনি বিএ ডিগ্রি লাভ করেন এবং ১৯৫২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ শেখ মুজিবসহ অন্যান্য ছাত্রনেতার সঙ্গে তিনিও গ্রেপ্তার হন এবং ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে কারারুদ্ধ জীবন যাপন করেন। ১৯৫২ সালের ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’র পরের দিন ভাষা আন্দোলনের অনেক সহযোদ্ধার সঙ্গে তিনি আবারও গ্রেপ্তার হন। রাজনৈতিক কারণে তাঁর কারাবাস ও কারাভোগের শুমারি এখানেই শেষ নয়। জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তিনি আবারও গ্রেপ্তার হন এবং কারাভোগ করেন।

১৯৫২ সালে তিনি নোয়াখালী বারে আইনজীবী হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬২ সালে তিনি হাইকোর্ট বারের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৫-৬৬ সালে মালেক উকিল পূর্ব পাকিস্তান ও পাকিস্তান বার কাউন্সিলের সদস্যও নির্বাচিত হন।

মুজিবুর রহমান মোক্তারের মৃত্যুতে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যের নোয়াখালী সদরের শূন্য আসনের উপনির্বাচনে ১৯৫৬ সালে তিনি এমপিও নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (এমপিএ) নির্বাচিত হন এবং সেবার আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের নেতাও নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালেও তিনি তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমপিএ) নির্বাচিত হন এবং ওই সময়ই পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে সংযুক্ত বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) এবং ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৬৯ সালে ৯ সদস্যের আওয়ামী লীগ সংসদীয় বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগের (বাকশালের) ১১ সদস্যবিশিষ্ট কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৭৮ সালের ৫ মার্চ তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং একই সালে তিনি গণ-ঐক্যজোট নামে গঠিত সামরিক শাসনবিরোধী মোর্চার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালের এপ্রিলে তিনি বঙ্গবন্ধু সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, ১৯৭৩ সালের মার্চে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ১৯৭৪ সালের ২৮ জানুয়ারি তিনি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে তিনি এমপি নির্বাচিত হন এবং সেবার শেখ হাসিনা নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ বিরোধীদলীয় নেতা এবং তিনি উপনেতা।

বঙ্গবন্ধু তাঁর যেসব রাজনৈতিক সহচর নিয়ে স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, সদ্য স্বাধীন দেশের সরকার চালিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকের মতো আবদুল মালেক উকিলও ধনসম্পদের জন্য কখনো রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি। তাই তিনি ধনের বিচারে ধনী ছিলেন না। কিন্তু নীতির বিচারে ছিলেন এক অনন্য নেতা।

লেখক : মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, গণপরিষদ ও জাতীয় সংসদের সাবেক সদস্য ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাবেক কৃষি সম্পাদক

 

 



মন্তব্য