kalerkantho


শ্রদ্ধাবান্ লভতে জ্ঞানম্

গোলাম কবির

১৬ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



শ্রদ্ধাবান্ লভতে জ্ঞানম্

শ্রদ্ধাবান্ লভতে জ্ঞানম্। শিরোনামটির সরল অর্থ হলো, শ্রদ্ধা-ভালোবাসা-সম্মান দিতে পারলে জ্ঞান লাভ করা যায়। মানবসভ্যতার ক্রমধারার বহু শতাব্দী কালের ভূয়োদর্শনের ফলে এই আপ্তবাক্য শ্রদ্ধাবান্ লভতে জ্ঞানম্। মানুষ সুদীর্ঘকাল থেকে দেখে আসছে, যারা বিনয়ী, নম্র, সদাচারী তারাই যেন জ্ঞানের আকর। উদ্ধত মানববিদ্বেষী ব্যক্তি জ্ঞানবান হয়ে ওঠে না।

শ্রদ্ধাবোধ ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। একটি অন্তরের অন্যটি বাইরের। অন্তরের বিশ্বাসকে আচরণের মাধ্যমে যাপিত জীবনে কার্যকর করার পরিশীলিত রূপই হলো শ্রদ্ধাবান হওয়ার পূর্বশর্ত। আমরা সাধারণভাবে দেখে আসছি, বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির সামনে অবনত হওয়াকে ভাবা হয় শ্রদ্ধা-ভক্তি। ভাবনাটি অমূলক নয়। তবে তা যেন একতরফা হয়ে যায়। আমরা সামগ্রিক সমাজ বিশ্লেষণে আলোচ্য অভিধাটির যথার্থতা খুঁজব না। জ্ঞান বা শিক্ষা-সংশ্লিষ্টতার ভেতর আমাদের বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখব।

প্রকৃতিতে আমরা দেখি, আলোকপিয়াসি উদ্ভিদ সূর্যালোকের দিকে ধাবিত হয়। মানুষ প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আর মানবসন্তান প্রকৃতির মতোই যেখানে সুখের-আনন্দের প্রশ্রয় পায়, সেখানেই নিষ্ঠ হয়ে যায়। এ কারণে অগ্রজদের এমনিভাবে তৈরি হতে হবে যেন অনুজরা সেখান থেকে উপাদান গ্রহণ করে শ্রদ্ধাবান হয়ে ওঠে। বিষয়টি পারস্পরিক আদান-প্রদানের। একপক্ষ শুধু শ্রদ্ধাভক্তি সম্মান পাওয়ার জন্য উন্মুখ থাকবে, কিন্তু অধস্তনদের মুখের পানে সদয় দৃষ্টিতে তাকাবে না, তার বোধকরি শ্রদ্ধা পাওয়ার অধিকার নেই। শক্তি প্রয়োগে সাময়িক লোক-দেখানো সম্মান পাওয়া যায়, শক্তি বা ক্ষমতা শেষে তা শূন্যে উবে যায়। মানুষ ভুলেও দাম্ভিকের পানে চায় না। আর প্রসঙ্গ উঠলে তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে।

একদা আমার জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিক শিক্ষকতা। লেখা বাহুল্য, দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দিয়েই আমার কর্মজীবনের সূচনা। আমি সেখানে প্রচুর মেধাবী শিক্ষার্থীর দেখা পেয়েছি। তারা জনক-জননী কিংবা স্বজনদের স্নেহ-ভালোবাসা কম পেয়েছে তা নয়। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসে তারা যেন কিছুটা বাড়তি আদর পেতে চায়। তাতেই তারা বশীভূত হয় অনেক ক্ষেত্রে।

মনে রাখা দরকার, শক্তি প্রয়োগ করে শ্রদ্ধা অর্জন করা যায় না বলে শেকসপিয়ার বহু আগেই বলেছেন; কোয়ালিটি অব মার্সি ইজ নট ইন স্ট্রেংথ। এর জন্য প্রয়োজন অকৃপণ স্নেহের দ্বার উন্মুক্ত করা। না করতে পারলে বাইরে থেকে যে শ্রদ্ধা দেখানো হবে তা কৃত্রিম। সামাজিক নিয়মের বশেই শিক্ষার্থীরা হাত তুলে বা মুখ নেড়ে শ্রদ্ধা প্রদর্শনমূলক কাজ শেষ করে। সত্যিকার স্নেহ-ভালোবাসা পেয়ে যারা শ্রদ্ধাবান হয়, তারা শিক্ষকের যাত্রাপথের জন্য হৃদয় পেতে দিতে দ্বিধা করে না। তখন নিজের অজান্তেই গেয়ে ওঠে : ‘আমি হৃদয়েতে পথ কেটেছি—সেথায় চরণ পড়ে তোমার সেথায় চরণ পড়ে।’

শিক্ষাক্ষেত্রে মেধা-সততা-নিষ্ঠা শিক্ষকের জন্য অপরিহার্য। এ তিনটির কোনো একটির অভাব থাকলে শ্রদ্ধাপ্রাপ্তিতে টান পড়ে। তখন শিক্ষার্থীকে দোষারোপ করে লাভ নেই। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের অসম্পূর্ণ রেখে শিক্ষকতায় আসা কাম্য নয়। শিক্ষার্থীরা তাদের দেখেই শেখে। সামান্য সততা রক্ষার শক্তি যার নেই, জীবিকার জন্য তার অন্য পথ সন্ধান করা উচিত। নগদ প্রাপ্তির জন্য যে শিক্ষক শিক্ষার্থীকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করে, সে পরিণামে ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়। প্রকাশ্যে না হলেও অন্তরে।

এসব আপ্তকথা স্মরণে রেখে আমাদের সন্তানদের শ্রদ্ধাবোধের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারলে আমরা আড়ম্বরের নয়, সত্যিকার শ্রদ্ধাবোধসম্পন্ন জাতি হিসেবে পরিচিতি পাব।

শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে আহরিত জ্ঞান অবশ্যই ফলপ্রসূ হবে তা আশা করা যায়। কারণ জ্ঞানের সঙ্গে হৃদয়ধর্মের মেলবন্ধন অধিকতর কার্যকর। দেয়ালের দৃষ্টি আকর্ষক লিখন যদি চিত্তকে আলোড়িত না করে তবে তার মূল্য কতটুকু? শিক্ষক যদি অনৈতিক কাজ করে ভাবেন, কেউ দেখছে না, তবে তিনি ভুল করবেন। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে ‘ইল রানস্ অ্যাপেস’। রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন, ‘গোপন কথাটি রবে না গোপনে।’ 

পদ-পদবি, অর্থ-বিত্তের লোভে নৈতিকতা বিসর্জিত হলে আর যাই হোক, সেখানে শ্রদ্ধাবোধের বীজ অঙ্কুরিত হওয়া দুরূহ। সদাচারের আচরণ ও অন্তরের ঐশ্বর্য দুয়ে মিলে মানবসন্তানকে শ্রদ্ধাবনত করে তোলে।

‘আপনি আচরি ধর্ম অপরে সেখাও’, কথাটি অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনের বাণী ‘.... লাম তাকুলুনা মালা তাফয়ালুন’ (সরল অর্থ : যা নিজে করো না, অপরকে তা করতে নির্দেশ কোরো না।) স্রষ্টা এই কপটতা পছন্দ করেন না। অথচ অহরহ আমরা এই সমাজবিধ্বংসী কাজে লিপ্ত। আমরা জীবন দিয়ে যা করি না, তাই করতে উপদেশ দিই। অবোধ শিশুর কাছেও সেই ভণ্ডামি ধরা পড়ে যায়। এই ভণ্ডামি দিয়ে যেমন সৎ-জীবনাচার শেখানো যায় না, তেমনি শিশুমনে শ্রদ্ধাবোধও জাগ্রত হয় না। সঠিক জ্ঞানাহরণের জন্য শ্রদ্ধাবোধের পরশ অপরিহার্য। চিরকালই মানুষ নিজের সময়ে নানা অবক্ষয়ের কথা বলে তা সংশোধনের পরামর্শ দেয়। কালের ধারায় আমরা অক্ষম পথিক। সংশোধনের সামর্থ্য আমাদের শূন্য। তবু সবিনয়ে বলতে হবে, আমরা বোধকরি শ্রদ্ধাবান হয়ে উঠতে পারি, এর জন্য বেশি খরচ করতে হয় না, পক্ষান্তরে লাভের অংশ বাড়ে। এর চেয়ে মহৎ বিনিয়োগ আর কী হয়?

লেখক : সাবেক শিক্ষক

রাজশাহী কলেজ



মন্তব্য