kalerkantho


ইমরান খানকে বাস্তবতা মেনে নিতেই হচ্ছে

অনলাইন থেকে

১৩ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নির্বাচনী প্রচারণাকালে ভোটারদের সামনে নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন যে তাঁর দেশের পাশ্চাত্যপ্রীতি একেবারে ঘুচিয়ে দেবেন তিনি। পাকিস্তানের এই নির্ভরতা কাটানোর জন্য তিনিই সর্বোত্তম ব্যক্তি। পাশ্চাত্যের নির্দেশিকা মেনে পাকিস্তান আর চলবে না। তাঁর মতে, পূর্ববর্তী সব সরকার ভিক্ষার পাত্র নিয়ে আইএমএফের কাছে ছুটেছে। এটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। তাঁর দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) বরং বিদেশে পাচার করা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার উদ্ধার করায় মনোযোগী হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ভাবগতিক উল্টে গেল। গত ৮ অক্টোবর তাঁর অর্থমন্ত্রী জানান, আইএমএফের কাছে বড় ধরনের ঋণের আবেদন জানাবে সরকার।

পাকিস্তানের অর্থনীতির সংকটের জন্য ইমরান খানকে দায়ী করা চলে না। পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) নেতৃত্বাধীন পূর্ববর্তী সরকার জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশে তুলেছিল—১০ বছরের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। কিন্তু এর জন্য জ্বালানি ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে প্রচুর ব্যয় করতে হয়েছে। রুপিকে চাঙ্গা রাখার ব্যবস্থা করতে গিয়ে রপ্তানিমুখী শিল্প; যেমন—বস্ত্র খাত আক্রান্ত হয়েছে। ফলে ২০১৬ সালের গোড়া থেকে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট লাফিয়ে বাড়তে থাকে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমে যায়। বর্তমানে রিজার্ভের পরিমাণ ৮০০ কোটি ডলার। এ রিজার্ভ দিয়ে এ বছরে প্রদেয় আমদানি বিল ও বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। বিদ্যুতের সরবরাহ অব্যাহত রাখার জন্য (অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র আমদানি করা কয়লার ওপর নির্ভরশীল) সরকারকে দ্রুত এক হাজার কোটি ডলার জোগাড় করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এটাও বুঝতে পারছেন যে পাকিস্তানের জন্য ঋণগ্রহণ জরুরি হয়ে পড়ছে। এর পরও কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি আইএমএফের বেইল-আউটের বিকল্প খুঁজেছেন হন্যে হয়ে। টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি প্রবাসী পাকিস্তানিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, প্রত্যেকে যেন সরকারকে এক হাজার ডলার দান করে একটি বড় বাঁধ নির্মাণের খরচ মেটানোর জন্য (এটা বাহ্য কথা)। সরকারি তহবিলের আর অপচয় হবে না, এটা বোঝানোর জন্য কৃচ্ছসাধনের কিছু সরকারি কাণ্ড জনসমক্ষে আনার চেষ্টা করছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের লোকজনের দুধের চাহিদা মেটানোর জন্য রাখা আটটি মহিষ এবং ৬১টি বিলাসবহুল গাড়ি নিলামে বিক্রি করেছে সরকার।

৭ অক্টোবর পর্যন্তও ইমরান খান আশা রেখেছিলেন—বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর কাছ থেকে ঋণ পাওয়া যাবে। সেটা হলে আইএমএফের কাছে হাত পাতার বিড়ম্বনা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। সৌদি আরবের ওপর বিশেষভাবে ভরসা করেছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে তিনি সেখানেই গিয়েছিলেন। কিন্তু সৌদি আরব তাঁকে উদ্ধারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি (বাণিজ্য উপদেষ্টা আবদুল রাজ্জাক দাউদের প্রতিক্রিয়া, ওদের কাছে হাত পাতার বিষয়টি বিব্রতকর)। ঋণ দেওয়ার বদলে সৌদি আরব ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি)’ প্রকল্পে বিনিয়োগ করার কথা বলেছে। ছয় হাজার কোটি ডলারের এ অবকাঠামো প্রকল্পে বেশির ভাগ অর্থের জোগানদাতা চীন। তাই সৌদি আরবের প্রস্তাবে মনঃক্ষুণ্ন্ন হয়েছেন তাঁরা। চীন পাকিস্তানের সবচেয়ে পুরনো বন্ধু, তাদের লৌহদৃঢ় সম্পর্ক। ফলে এ প্রস্তাবকে দ্রুত প্রত্যাখ্যান করতে হলো।

কোনো কোনো পর্যবেক্ষক ধারণা করেছিলেন, চীন হয়তো পাকিস্তানকে ঋণ দেওয়ার পরিমাণ বাড়াবে। কারণ আইএমএফের দ্বারস্থ হলে তারা সিপিইসির দলিলপত্র খতিয়ে দেখতে চাইবে। এতে অনেক বিষয় প্রকাশ্যে চলে আসতে পারে, যা পাকিস্তানের জন্য মঙ্গলজনক হবে না। উল্লেখ্য, সিপিইসি বিষয়ক চুক্তিপত্র প্রকাশ্য নয়। কিন্তু সিপিইসি বিষয়ে ঝুট-ঝামেলা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও ঋণসংক্রান্ত বিষয়ে পাকিস্তান চীনকে শেষ ভরসা হিসেবে পাবে—এমন সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না।

ইমরান খানের দাতা বা ত্রাতা খোঁজার হতাশাজনক পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত করেছে। ৮ অক্টোবর পাকিস্তানের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের পতন ঘটে। গত এক দশকে এক দিনে এত বড় পতন আর ঘটেনি। সাংবাদিক খুররম হোসাইনের অভিমত, ঋণ নেওয়া, না নেওয়া বিষয়ক দোলাচলে ইমরান খানেরই ক্ষতি হয়েছে। আইএমএফের কাছ থেকে যেকোনো ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে দর-কষাকষির সক্ষমতা কমে গেছে তাঁর। সিপিইসি বাস্তবায়নে পাকিস্তান কুলিয়ে উঠতে পারবে কি না, তা বোঝার জন্য আইএমএফ দলিলপত্র খতিয়ে দেখতে চাইবে। পাশাপাশি রুপির আরো অবমূল্যায়ন, কর সংগ্রহ আরো বাড়ানো এবং সুদের হার বাড়ানোর কথা বলতে পারে তারা। কোনোভাবেই এসব বিষয় তাঁর ‘ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির অনুকূলে নয়। ক্ষমতা গ্রহণের আগে তিনি নিশ্চিত না হয়ে থাকলেও এখন তাঁকে নিশ্চিতভাবেই বুঝতে হবে যে পাকিস্তানের সমস্যা শুধু দুর্নীতিপরায়ণ রাজনীতিকরা নন, এ সমস্যা আরো গভীরে নিহিত। ভোটাররা যদি আগে বুঝে না থাকে, তাহলে এখন ভালো করেই বুঝতে হবে যে প্রবল আত্মবিশ্বাস এবং তারকাখ্যাতি থাকার পরও খান সাহেব খুব সহজে এবং সত্বর তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবেন না।

 

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক



মন্তব্য