kalerkantho


প্রমাণিত হলো অপরাধী প্রভাবশালী হলেও পার পাবে না

আবদুল বাসেত মজুমদার

১১ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



প্রমাণিত হলো অপরাধী প্রভাবশালী হলেও পার পাবে না

ধাপে ধাপে অনেকটাই ওপরে উঠেছে বাংলাদেশ। দেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। একটি জাতির উন্নয়নের মাপকাঠিগুলোর মধ্যে অন্যতম সেই দেশের বিচারব্যবস্থা। কত দ্রুত বিচারের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, সেটিই মূল কথা। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর একপর্যায়ে আমাদের বিচারব্যবস্থা থমকে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৭৫ সালের জঘন্য হত্যাকাণ্ড, জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ডসহ একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হবে না বলেই অনেকে মনে করেছিল। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের হামলার ঘটনার পর এর বিচার নিয়েও সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু না, সেটি আর হতে দেননি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারও সম্পন্ন হওয়ার পথে। ধারাবাহিকতায় নানা ষড়যন্ত্র পাশ কাটিয়ে সম্পন্ন হলো ২১ আগস্টের হামলার বিচার। আবারও প্রমাণিত হলো অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, বিচারের ঊর্ধ্বে নয়। পার পাওয়ার সুযোগ নেই।

গ্রেনেড হামলার মামলার রায় ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এই দিনটিও লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে। জাতি আরেকটি কলঙ্ক থেকে মুক্তি পেল। একটি জগদ্দল পাথর আমাদের বুক থেকে সরে গেল। একটি দিক তুলে ধরছি, এই মামলার বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়েছে। সরকার ইচ্ছা করলে একটি সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে দ্রুত এই বিচার শেষ করতে পারত। কিন্তু এই মামলায় অভিযুক্তদের যথাযথ সুযোগ ও সময় দেওয়া হয়েছে আদালতে তাদের পক্ষে বক্তব্য রাখার। বিচারক সেগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। বিচার সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই বিচার আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হচ্ছে। বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই।

জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের দায় থেকে মুক্তি পেতে সংকল্পবদ্ধ। কোনো ষড়যন্ত্রই সেই সংকল্প থেকে এ জাতিকে নিবৃত্ত করতে পারবে না। রায়কে কেন্দ্র করে আবার যেন কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয় সেদিকে কঠোভাবে লক্ষ রাখতে হবে।

গ্রেনেড হামলার ঘটনার দিকে একটু নজর দেওয়া যাক। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট, ভাদ্র মাসের ভাপসা গরমের শনিবার দিনটি ছিল রৌদ্রকরোজ্জ্বল। সময় বিকেল ৫টা ২৫ মিনিট, দোর্দণ্ড মার্তণ্ডের খরতাপ অনেকটা কমে এসেছে। দলীয় প্রতিবাদ র‌্যালি এবং সভা চলছিল ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনের রাস্তায়। উন্মুক্ত ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর ২০ মিনিটের বক্তৃতা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ গগনবিদারী আওয়াজে চারদিকে হুলুস্থুল, দৌড়াদৌড়ি, আর্তনাদ, গোঙানি, বাঁচানোর আকুতি। সুন্দর রোদেলা বিকেল মুহূর্তের মধ্যে হয়ে গেল ধোঁয়াচ্ছন্ন। গ্রেনেডে বিধ্বস্ত সড়কটি হয়ে উঠল হতাহত মানুষের ছোপ ছোপ রক্তের কারবালা। আচমকা গ্রেনেড হামলায় হতবিহ্বল মানুষজনের ছোটাছুটি আর পদদলন পরিস্থিতিকে করে তুলল আরো ভয়াবহ। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা কানের আঘাত নিয়ে বেঁচে গেলেন ভাগ্যক্রমে অনুসারীদের বেষ্টনীর মধ্যে থাকার কারণে; কিন্তু দুই পা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন আওয়ামী লীগের বিশিষ্ট নেত্রী, দলের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আইভি রহমান। আহত অবস্থায় তিন দিন পর ইহলোক ত্যাগ করেন আজীবন নারী জাগরণ আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা এই মহীয়সী নেত্রী।

২১ আগস্টের  হামলা ছিল সে বছরে প্রথম থেকেই সারা দেশে বোমা বিস্ফোরণ সিরিজের সর্বশেষ ঘটনা; এ ঘটনার কয়েক দিন আগেই ৭ আগস্ট সিলেটে এক বোমা হামলায় নিহত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের একজন স্থানীয় নেতা। তাঁরই প্রতিবাদে সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল ২১ আগস্ট। সেদিনকার গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত এবং তিন শতাধিক আহত হয়েছিলেন। আহতদের কেউ পা হারিয়ে, কেউ হাত হারিয়ে বা শরীরে স্প্লিন্টার নিয়ে এখনো জীবন্মৃত অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। অনেকে চিরকালের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন।

ওই হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল প্রতাপশালী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে হামলা-মামলায় জড়িয়ে হতভম্ব করে দিয়ে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া। একুশের হামলাটি বিগত হামলাগুলোরই ধারাবাহিকতায় ঘটানো হয়। এ ঘটনার পরও ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৪ জেলার ৬৩টি শহরে সিরিজ বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। তৎকালীন সরকার কোনোটিরই সুবিচার করেনি, শুধু বিচারের নামে জজ মিয়া নাটক সাজিয়েছিল। অথচ ২০১২ সালের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২১ আগস্টের হামলাটি ছিল একটি বিশাল ষড়যন্ত্রের অংশ। আর এ ষড়যন্ত্রটি করেছিল যৌথভাবে জঙ্গিগোষ্ঠী হুজি, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবশালী কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ প্রশাসন, ডিজিএফআই, এনএসআই এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অফিসের কয়েকজন দুষ্টু চরিত্রের কর্মকর্তা। সব দেখেশুনে মনে হয়, এ জঘন্য হামলাটি করার উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকন্যাকে সরিয়ে দেশে পাকিস্তানি ভাবধারা আরো পাকাপোক্ত করা।

একটি বিষয় আলোকপাত না করলেই নয়, এ দেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে জাতি অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডের পর দেশ পাকিস্তানপন্থীদের হাতে চলেছে দীর্ঘদিন। জাতির জনককে হত্যার পর তাঁর বিচার যাতে না করা যায়, সে জন্য ইনডেমনিটি অ্যাক্টও করা হয়েছিল, যা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। জাতির জনক হত্যাকাণ্ড যেমন ইতিহাসেব বর্বরতম ঘটনা, তেমনি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধে আইন করাও ইতিহাসের বর্বরতম ঘটনা। জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এ দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি নির্মূলে কাজ শুরু করেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে জাতির জনক হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধে ইনডেমনিটি অ্যাক্ট বাতিল করা হয়। এরপর শুরু হলো জাতির জনক হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া। ২০০১ সালে আবারও ক্ষমতায় আসে দেশবিরোধী শক্তি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসায় আবার সেই বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়। আওয়ামী লীগ মানেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি নির্মূল করার দল। শেখ হাসিনা মানেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি নির্মূল করার নেত্রী। শেখ হাসিনা মানেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নেত্রী। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে এ দেশে যারা ৩০ লাখ লোককে শহীদ করেছিল, দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠন করেছিল, কোটি বাঙালিকে ঘরছাড়া করেছিল, তারা ছিল বিচারের আওতার বাইরে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ২০১০ সালে আইন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে একাত্তরের সেই ঘাতকদের বিচারের আওতায় আনতে সক্ষম হয়। আমি বলছি বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে দেশকে নিস্তার দেওয়ার জন্য একমাত্র উপযুক্ত নেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদানের কথা। জাতির জনক হত্যাকাণ্ডের বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে হাজারো বাধা এসেছে। তেমনি বাধা ছিল ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচারে, কোনো হুমকি ও বাধার পরোয়া না করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে জাতিকে রক্ষা করেছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। ২১ আগস্টের ঘটনার পর এই বিচার নিয়ে ষড়যন্ত্র ও জজ মিয়া নাটকের কথা সারা বিশ্ব জানে। আওয়ামী লীগই এই ঘটনার ন্যায়বিচারে যথাযথ উদ্যোগ নিয়েছে। তার ফলাফল রায় পর্যন্ত এলো। একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন হলো।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার ঘটনার চার বছর পর ২০০৮ সালে মামলাটিতে যে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল, তাতে ইচ্ছা করেই আসামিদের নাম গোপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে মামলাটির বাদীপক্ষ থেকে। ২০০৮ সালের ৯ জুন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে ঢাকার সিএমএম আদালতে দুটি অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হলেও সরকার পরিবর্তনের পর ২০১১ সালের ২ জুলাই আদালতে যে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হয়, তাতে আসামি দেখানো হয় ৩০ জন। ফলে এই মামলার মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২ জনে। এর মধ্যে ১৯ জন পলাতক, কারাবন্দি ২২ জন। জামিনে ছিলেন আটজন।

আমরা বর্তমানে এমন এক বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে এগোচ্ছি, যেখানে দারিদ্র্য, অসমতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির পরিবর্তে সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। গ্রেনেড হামলার বিচারের মাধ্যমে ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথ আরো প্রশস্ত হলো। এই বিচারের মাধ্যমে এটি আরো একবার সুদৃঢ় হলো যে অপরাধ করে কেউ পার পায় না। একদিন না একদিন তার বিচার হয়ই। এই মামলার বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ আসামি এখনো পলাতক। তাদের ফিরিয়ে এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি কার্যকরের জোরালো দাবি জানাচ্ছি।

লেখক : আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি



মন্তব্য