kalerkantho


যুক্তরাষ্ট্র কেন আল-কায়েদার পক্ষ নিচ্ছে?

রন পল

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



যুক্তরাষ্ট্র কেন আল-কায়েদার পক্ষ নিচ্ছে?

সপ্তাহখানেক আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেছিলাম, তাঁরা যেন সিরিয়ায় আল-কায়েদাকে রক্ষা করার চেষ্টা বন্ধ করেন। তাঁরা বলেছেন, সিরিয়ার সরকার যেন ইদলিবে অভিযান না চালায়। তার মানে ইদলিবকে আল-কায়েদার নিয়ন্ত্রণে রেখে দেওয়া হোক। এমন ইচ্ছা প্রকাশের অর্থ যে আল-কায়েদাকে সুরক্ষা দেওয়া, সেটাই তাদের আমি বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম।

যুক্তরাষ্ট্র সরকার সিরিয়ায় আল-কায়েদাকে সাহায্য করতে পারে—এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন বটে। তবে আমাদের কাছে বিষয়টি যতখানি আশ্চর্যজনক মনে হয় ততখানি কিন্তু নয়। আমাদের হস্তক্ষেপ-প্রবণ পররাষ্ট্রনীতির কারণেই দুষ্ট লোকজনের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা ওয়াশিংটনের দিন দিন বেড়ে চলেছে। বিপজ্জনক ও আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য পূরণের জন্যই ওয়াশিংটনের এ ধরনের সখ্য প্রয়োজন।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কি আসলেই আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) সমর্থন করে? অবশ্যই না। কিন্তু কথিত যে বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ ও পরিচালনা করেন, তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যে আরো দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য পূরণের স্বার্থে এই দুই চরমপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে আপাত মিত্রতা বজায় রাখার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সেই লক্ষ্যগুলো কী? ইরানে সরকার পরিবর্তন।

চলুন একটু খতিয়ে দেখা যাক—কোনো কোনো ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আল-কায়েদা ও আইএসের কর্মকাণ্ড দেখেও দেখছে না; সজ্ঞানে চোখ বুঁজে আছে। যুক্তরাষ্ট্র কেন অন্ধবৎ আচরণ করছে।

প্রথমত, ইদলিব। আইএসবিরোধী লড়াইয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত গত বছর কী বলেছিলেন? তিনি বলেছিলেন, ‘সেই ৯/১১ থেকে ইদলিব হচ্ছে আল-কায়েদার বৃহত্তম নিরাপদ স্বর্গ।’ তা-ই যদি হয়, তবে খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা কেন আল-কায়েদার কাছ থেকে ইদলিবের নিয়ন্ত্রণ না নেওয়ার জন্য সিরিয়ার সরকারকে সতর্কবার্তা দিয়ে আসছেন? সিরিয়ার সরকার আল-কায়েদাকে হটিয়ে দিলে সেটা কি আদতে আমাদের পক্ষেই আসে না? তাহলে শুনুন, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ যদি ইদলিবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন, তাহলে নব্য রক্ষণশীলদের (এবং সৌদি আরব ও ইসরায়েলের) সিরিয়ায় সরকার পরিবর্তনের স্বপ্ন এবং এর ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরানের ওপর আরোপিত কলঙ্ক—দুটোই অস্তিস্ত্বহীন হবে।

দ্বিতীয়ত, সিরিয়ার আল তানাফে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির চারপাশের এলাকায় রয়েছে বিপর্যস্ত আইএসের অবশিষ্ট যোদ্ধাদের একটি দল। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দুই বছর ধরে সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবৈধভাবে অভিযান চালিয়ে আসছে। সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, আল তানাফে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটির চারপাশে অবস্থানরত আইএস যোদ্ধাদের ওপর রাশিয়া হামলা চালাতে চায়। সে ব্যাপারে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র শতাধিক মেরিন সেনা পাঠিয়ে এবং সামরিক মহড়া চালিয়ে সেই সতর্কবার্তার জবাব দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি আরেক দফা নিজের অবস্থান বদলেছেন এবং ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র অনির্দিষ্টকালের জন্য আল তানাফে থাকবে। কেন? এটাকে একটা কৌশলগত অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যে অবস্থান থেকে ইরানকে আক্রমণ করা হবে। আল তানাফে অবস্থানের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করেছে। তাতে যদি কারো মনে হয় যে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে অবস্থানরত আইএসের ব্যাপারে অন্ধের মতো আচরণ করছে, তাতেও কিছু যায়-আসে না।

সব শেষে ইয়েমেন প্রসঙ্গ। সেখানে হুতি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট। তাদের সমর্থন জোগাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এ যুদ্ধ যে সরাসরি আল-কায়েদার জন্য ফায়দা বয়ে আনছে, সেটা এপি (অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস) এবং অন্যান্য মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো টের পেয়েছে। কেন ইয়েমেনে আল-কায়েদাকে সাহায্য করা হচ্ছে? কারণ যুক্তরাষ্ট্রের আসল উদ্দেশ্য হলো ইরানে সরকার পরিবর্তন ঘটানো। আর মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাইলে ইয়েমেন হলো সম্মুখসমরের উৎকৃষ্ট জায়গা। এ জন্যই আমরা সেই আল-কায়েদাকে সাহায্য করে যাচ্ছি, যে আল-কায়েদা আমাদের ওপর হামলা করেছিল। আমরা সেই ইরানে সরকার পরিবর্তন ঘটাতে চাই, যে ইরান আমাদের ওপর হামলা চালায়নি। এসবের কী মানে হতে পারে?

বেনজামিন ফ্রাংকলিনের পুওর রিচার্ডস অ্যালমানাকের সেই পুরনো লাইনটি আমাদের সবার মনে থাকার কথা—‘তুমি যদি কুকুরের সঙ্গে শয়ন করো, তবে তুমি মাছির সঙ্গে জেগে উঠবে।’ কথিত বিশেষজ্ঞরা চান, আমরা যেন ভেবে নিই, তাঁরা এমন এক বুদ্ধিদীপ্ত পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের পেছনে ছুটছেন, যে নীতি দিন শেষে আমেরিকার জন্য মহান বিজয় বয়ে আনবে। কিন্তু যথারীতি কথিত এ বিশেষজ্ঞরা ভুল ভেবেছেন। বিষয়টি অত জটিল নয়—বিজয়ের মানে যদি হয় আল-কায়েদা আর আইএসের সঙ্গে আপনাদের মিত্রতা, তাহলে আপনারা যে কোথাও ভুল কিছু করছেন তাতে সন্দেহ নেই।

চলুন, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি ঠিকঠাক করতে শুরু করি। আসুন, বাকি বিশ্বকে তাদের নিজেদের মতো করে চলতে দিই।

লেখক : রন পল ইনস্টিটিউট ফর পিস অ্যান্ড প্রসপারিটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান; লেখক, সাবেক রাজনীতিক

সূত্র : রন পল ইনস্টিটিউট ওয়েবসাইট

ভাষান্তর : শামসুন নাহার



মন্তব্য