kalerkantho


বিএনপি কি এবার ভুল শোধরাবে

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বিএনপি কি এবার ভুল শোধরাবে

রাজনীতির মাঠ ক্রমেই গরম হচ্ছে। আগামী মাসেই একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা, চলতি মাসে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন এবং বহুল আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়। আবার কারাবন্দি চেয়ারপারসনের মুক্তি ও দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে নভেম্বরের শুরুতেই আন্দোলনের দিকে যাচ্ছে বিএনপি। এমন বাস্তবতায় বিভিন্ন ইস্যুতে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে। বিশেষ করে বিএনপির দেওয়া দাবিগুলোর কোনোটাই যদি আওয়ামী লীগ তথা সরকার না মানে, তাহলে কি বিএনপি নির্বাচনে যাবে? বিএনপি নির্বাচনে না গেলেই বা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী হতে পারে? এমন সব প্রশ্নে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা যথেষ্ট।

আপাতদৃষ্টিতে লক্ষণীয় হলো, বিএনপি অনেকবার আন্দোলনে নামার হুংকার দিয়ে আসা দলটি এবার আটঘাট বেঁধেই নির্বাচনী মাঠে নামতে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, আন্দোলন এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি একই সঙ্গে দুই পথে হাঁটছে বিএনপি। সব কিছু মিলে একদিকে রাজনৈতিক উত্তেজনা, অন্যদিকে নির্বাচনমুখী আয়োজন। গত ৮ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে উত্তরবঙ্গ সফরের মধ্য দিয়ে ভিন্নধর্মী এক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির নির্বাচনী পথ যেহেতু মসৃণ অবস্থায় নেই, সে জন্য তাদের এগিয়ে যাওয়াটাও একটু অন্য রকম। তারা মূলত খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিসহ নানা রকম প্রক্রিয়া অবলম্বন করে সামনে এগিয়ে চলেছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিয়ে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিংবা সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখেছিল, সেটি বাস্তবায়িত না হওয়ায় তাদের রাজনৈতিক চিন্তার পরিবর্তন ঘটেছে। তারা এখন সংশয় বোধ করছে যে এবার নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে তাদের পক্ষে কোনো সম্ভাবনাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে কি না। মোটা দাগে বলা যায়, মূলত তৃতীয় কোনো শক্তি তাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে এমন ধারণা বদ্ধমূল হওয়ায় বিএনপি দশম জাতীয় সংসদ বর্জন করেছিল। একেবারে আপসহীন অবস্থায় অটল থেকে খালেদা জিয়া তাঁর নামের আগে ব্যবহৃত ‘আপসহীন’ শব্দটি পাকাপোক্ত করতে পেরেছেন। কিন্তু বিএনপির জন্য কতটুকু পোক্ত কিংবা কল্যাণকর হয়েছে, সেটি নিয়ে একটা বড় প্রশ্ন আমাদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।

এ কথা সত্য যে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হতেই প্রশ্ন উঠেছিল পরবর্তী একাদশ সংসদ নির্বাচনের। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, বিরোধী দলের সঙ্গে চলমান সংলাপ কাঙ্ক্ষিত সমঝোতায় পৌঁছলে দশম সংসদ ভেঙে দিয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচন দেওয়া হবে। কিন্তু পরিস্থিতি সেদিকে যায়নি। দশম সংসদ ভাঙাও হয়নি। বরং মাঝখানে বিএনপি-জামায়াত জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের অবস্থান আরো দুর্বল করেছে আর সরকারকে বৈধতা দিয়েছে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন আদর্শ ও কল্যাণের লক্ষ্য নিয়ে ক্ষমতাসীন ছিলেন তখনো একটি বিরোধী শক্তি বঙ্গবন্ধুর শাসনকে মেনে না নিয়ে দেশে নানা রকম নৈরাজ্য ও নাশকতার পরিবেশ তৈরি করে দেশকে অস্থিতিশীল পরিবেশের মুখাপেক্ষী করেছিল। দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ করার লক্ষ্যেই সম্ভবত বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) নামে একটি একক জাতীয় দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর এই উদ্যোগ ভূলুণ্ঠিত হয়ে যায় বিরোধীদের ষড়যন্ত্রে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও নানা প্রেক্ষাপটের উপসংহারে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় একটি নির্বাচনের আয়োজন করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে তাঁর স্বপ্নকে ভূলুণ্ঠিত করার সুযোগ পেয়েছিল বিরোধীরা। কিন্তু শেখ হাসিনার উদ্যোগ এবং প্রচেষ্টা নানা রকম ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে সরকারের উন্নয়নমুখী সফলতা দেশে-বিদেশে সরকারের সুনাম বয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন হিসেবে সিভিল সোসাইটির সদস্যরা মতামত দিয়েছিলেন। আবার তাঁরা বলেছিলেন, এই নির্বাচন ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিএনপির একতরফা নির্বাচনের কলঙ্ক মুছে দেবে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের পূর্ববর্তী বাকশাল গঠনের দুর্নাম পাকাপোক্ত করবে। এ ছাড়া প্রশ্ন উঠেছিল, আওয়ামী লীগ কি ইচ্ছা করে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, নাকি বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল আওয়ামী লীগের জন্য রাস্তা পরিষ্কার করেছিল। বিএনপি ভেবেছিল, পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে যাবে, আর আওয়ামী লীগ আবার কলঙ্কিত হবে, বিএনপির কলঙ্ক কিছুটা লাঘব হবে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিএনপির অজান্তেই তাদের ধরাশায়ী করেছে।

সংবিধান অনুযায়ী পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচন হবে—এটিই খুব স্বাভাবিক এবং নিঃসন্দেহে ন্যায্য। এতে কোন দল নির্বাচনে এলো আর কোন দল এলো না, সেটি বড় কথা নয়। কারণ এ ক্ষেত্রে না বললেই নয় যে সামরিক শাসকরা নির্বাচন ছাড়াই অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পর বছরের পর বছর ক্ষমতায় থেকেছেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অন্তরালে সামরিক শাসকদের ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়া যথাযথ নয়। তবু তাঁরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকেছেন তত দিন, যত দিন পরিস্থিতি অনুকূলে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

বর্তমানে যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, তাতে সরকার বিএনপির দেওয়া কোনো দাবি না মানলে আর বিএনপি নির্বাচনে না এলে নির্বাচিত নতুন সরকারকে কোনোভাবেই পেছনে তাকাতে হবে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগকে যতটুকু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে, ততটাও হয়তো এবার হতে হবে না। এখন প্রশ্ন আসছে, বিএনপি কি এবার নিজের ভুল শোধরাবে, নাকি নতুন কোনো ভুল করবে। দশম সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ বরাবরই বিএনপিকে সংবিধানের অধীনে থেকে সর্বোচ্চ ছাড়ের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। বিএনপি তা প্রত্যাখ্যান করেছিল বারবার। এবার আওয়ামী লীগ নতুন করে আহ্বান করবে না—এমনটাই বিএনপিকে ধরে নিয়ে এগোতে হবে। আর আওয়ামী লীগও তাদের অবস্থান থেকে একবিন্দুও সরে আসবে না—এমনটাই বর্তমান রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত। কাজেই বিএনপির পক্ষ থেকে খুব বেশি এদিক-সেদিক ভেবে লাভ হবে না, বরং নির্বাচনী প্রস্তুতিতে থাকাই শ্রেয় হবে। আবার অন্যদিকে আওয়ামী লীগকে ধরে নিতে হবে, বিএনপি যেকোনো মূল্যেই নির্বাচনে যাবে।

বিএনপির মতো একটি জনপ্রিয় দলের নির্বাচনে না যাওয়াটা রাজনৈতিকভাবে বুমেরাং। এখন আর পরিস্থিতি তেমন নেই যে আওয়ামী লীগকে আরো একটি একতরফা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বিএনপি লাভবান হবে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলকেই মনে রাখতে হবে, নির্বাচনের প্রশ্নটি প্রতিশোধের নয়, জনগণের কল্যাণের, সর্বোপরি গণতন্ত্রের। রাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থান এবং প্রতিশোধ যা-ই বলি না কেন, কোনোটিই জনগণের কিংবা রাজনীতিবিদদের কল্যাণ বয়ে আনবে না। সব কিছুই রাজনৈতিক বুমেরাং হিসেবে দেশকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি করবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

sultanmahmud.rana@gmail.com



মন্তব্য