kalerkantho


শতরং

বদলানো মডেলের অসুখবিসুখ

মোস্তফা মামুন

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



হঠাৎ করেই ডেঙ্গুতে পড়ে গেলাম। অসুখবিসুখের বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। একদল সব সময় সতর্ক থাকে, ডাক্তার-হাসপাতালের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ। আরেক দল একেবারে যাকে বলে শুয়ে না পড়লে চিকিৎসামুখী হতে চায় না। আমি দ্বিতীয় দলের। আর সে জন্যই এবারের সমস্যাটা এলো অদ্ভুতভাবে। সাধারণ ভাইরাস জ্বরের মতো জ্বর ওঠানামা করল, সেরেও গেল। ডেঙ্গুজনিত তীব্রতার লেশমাত্র নেই। কিন্তু পরীক্ষা করাতে গিয়ে দেখা যায় প্লেটলেট কমছে। শরীরে সুস্থ আছি কিন্তু ওদিকে কাগজে দেখাচ্ছে ডেঙ্গু কামড় বসাচ্ছে। অগত্যা হাসপাতালে ভর্তি। কয়েক দিন অবস্থান। এবং দিনভর স্যালাইন দিয়ে, প্রচুর ওষধু খেয়ে, বিস্তর দুর্বলতা নিয়ে আপাতত রোগমুক্ত।

আর ঠিক এভাবেই আবার আমি হয়ে উঠছি এবারের ডেঙ্গুর একটা সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি। জ্বর হবে ১০৩-১০৪, একেবারে বিধ্বস্ত-বিপর্যস্ত হয়ে যাবে শরীর—এগুলোকেই ডেঙ্গুর শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য বলে সবাই জানে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে নিজেকে লুকিয়ে রেখে গুপ্ত আততায়ীর মতো আঘাত শুরু করছে রোগটি। ডেঙ্গুর এই মডেল বদল চিকিৎসকদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। ভাবাচ্ছে আমাদেরও। অসুখবিসুখও এই দুর্ভাগা আমাদের সঙ্গে ইচ্ছামতো খেলে নিচ্ছে।

যাহোক, অসুস্থ হলে সব কিছুকে দেখা যায় একটু অন্যভাবে। প্রথমত বোঝা যায়, সুস্থ থাকা কী আনন্দের! এমনিতে হাজারো অন্য যন্ত্রণায় ডুবে থেকে এ বিষয়টি নিয়ে আমরা আসলে ভাবিই না। জাভেদ ভাই হাসপাতালে দেখতে এসে প্রথমে এ রকম একটা কথাই বললেন, ‘অসুস্থ হলে জীবনটাকে অনেক বড় করে দেখা যায়।’

জ্ঞানের কথা বলবেন জানতাম, কিন্তু অসুস্থ সময়ে এমন দার্শনিকতায় বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘বড় কোথায়? এই সময় তো জীবনটাকে আরো ছোট দেখা যায়। মনে হয়, যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে।’

জাভেদ ভাই ধাক্কা খেয়ে একটু মিইয়ে যান। কিন্তু জ্ঞান দেওয়ার লাইনে চলে গেলে থামতেও চান না। বলেন, ‘আমাদের অসুখ হলে প্রথম সমস্যাটা কী হয় জানো? কোথায় যাবে? কোন ডাক্তার দেখাবে? তখন মতামত আসবে নানা রকম। পরিবারের একজন বলবে অমুককে দেখাও, আরেকজন বলবে অমুকের কাছে যাও। সবার কথা তুমি রাখতে পারবে না। এখন যার কথা রাখলে না সঙ্গে সঙ্গে সে দেখা গেল রাগ করে ফেলল। এরপর তাঁকে আর ঠিক তুমি সঙ্গে পাবে না।’

‘মানছি এটা একটা সমস্যা। কিন্তু এ থেকে রক্ষার উপায় কী? মতভেদ তো থাকবেই।’

‘এটার জন্যই একটা সিস্টেমে আনা দরকার সব কিছুকে। আমাদের অনেক বড় বড় হাসপাতাল হচ্ছে, আধুনিক যন্ত্রপাতি আসছে। দেশেই অবিশ্বাস্য বড় রকমের অপারেশন হচ্ছে। কিন্তু মূল সমস্যার জায়গা হচ্ছে সাধারণ রোগী-ডাক্তার-হাসপাতাল সমন্বয়হীনতা। অসুখ মানে শরীরের সমস্যা, এর সঙ্গে টাকার চিন্তা, তার সঙ্গে যদি সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ার আশঙ্কা যোগ হয়, তাহলে চিন্তা করো। তারপর দালালবাজি, হাসপাতালের লোকদের দুর্ব্যবহার এসব মিলিয়ে... না, এই দেশে বড় রকমের অসুস্থ হওয়ার চেয়ে আসলে সরাসরি চলে যাওয়া ভালো।’

জাভেদ ভাই বড় বিষণ্ন দেখায়। সত্যিই, সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণির একজন হিসেবে অনেক বাড়তি সুবিধা পাই চিকিৎসার ক্ষেত্রে কিন্তু তার পরও যে তিক্ততা হজম করতে হয় সেই তুলনায় সাধারণ মানুষের কী কষ্ট!

জাভেদ ভাই বলেন, ‘চিকিৎসাব্যবস্থায় যে উন্নতি হচ্ছে সেগুলো আসলে বাণিজ্যিক উন্নতি, করপোরেট যুগের সঙ্গে তাল মেলানো অগ্রগতি।’

‘বিকল্প কী?’

‘কাজটা অনেক কঠিন। মানুষ বেশি, অনেক সমস্যা। কিন্তু বিষয়টাকে একটা প্রক্রিয়ায় তো আনা যায়। উন্নত দেশের মতো এলাকাভিত্তিক জেনারেল ফিজিশিয়ান ব্যাপারটা তো করা যেতে পারে। যেকোনো অসুখ হলে তুমি প্রথমে তাঁর কাছেই যাবে। তিনি যার কাছে রেফার করবেন সেখানেই চিকিৎসা। তাহলে অন্তত কোথায় যাব, দালালদের দৌরাত্ম্য ইত্যাদি কমবে।’

‘ঠিকই তো। এভাবে শুরু করলে তো প্রথম ধাক্কাটা থেকে বাঁচা যাবে।’

‘দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে আমাদের ডাক্তারদের ধরন। এটা অস্বীকারের উপায় নেই যে বড় ডাক্তারদের মানুষ ভয় পায়। তাঁদের বেশির ভাগই সাধারণত রোগীর মনস্তত্ত্ব বুঝতে চান না। কেন এ রকম হয় জানো। আমাদের ডাক্তারি পড়ে সাধারণত ভালো ছাত্ররা। ক্লাসের ফার্স্ট বয় মানে ডাক্তার বানাও, ম্যাট্রিকে স্ট্যান্ড করেছে—হোক ডাক্তার। ভালো ছাত্ররা সাধারণত বইয়ে ডুবে থাকে, সাধারণ মানুষের মানসিকতার সঙ্গে যোগাযোগ থাকে কম। ফলে ডাক্তার হওয়ার পর সেই যোগাযোগটা আর হয় না। অথচ ডাক্তার হওয়া উচিত তাদের, যাদের মধ্যে সেই পর্যায়ের মানবিক আবেগ আছে। সেই ছাত্রটির, যার অন্যের দুঃখে মন কাঁদে।’

একটু আপত্তি করি। ‘কিন্তু আমি আমার এক ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে একদিন একটা হাসপাতালে ঘুরেছি। তোমার মতো শুরুতে আমারও মনে হচ্ছিল, তাঁর ব্যবহারটা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখলাম, সেই একই প্রশ্ন, একই কথা, অদ্ভুত সব আবদার। ডাক্তাররা তো মানুষ। সেদিন আমার মনে হলো, ওর জায়গায় আমি থাকলে বোধ হয় আরো বেশি খারাপ ব্যবহার করতাম।’

‘সে জন্যই তুমি ডাক্তার নও। এবং যার এ রকম মনে হয় তার ডাক্তার হওয়া উচিত না। ডাক্তারদের সমস্যা আছে আরো একটা। ভালো ছাত্ররা ডাক্তার হয়, অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি চাপ, অনেক বেশি পড়াশোনা। কিন্তু প্রাপ্য সম্মান! টাকা-পয়সার দিক থেকে তো নেই-ই, এমনকি দেখবে প্রশাসনিক ক্ষমতায়ও বিসিএসওয়ালারা তাদের ওপর ছড়ি ঘোরায়। এটা তাদের, বিশেষ করে বড় ডাক্তারদের আরেক দফা অসন্তুষ্ট করে রাখে। ব্যতিক্রমী জ্বলজ্বলে ডাক্তাররা আছেন কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়াটা ডাক্তারদের কাজটাকে অনেক কঠিন করে রাখে। তাই বদলাতে হবে সব। নইলে এই বড় বড় হাসপাতাল, আধুনিক যন্ত্র, এত এত মেডিক্যাল কলেজ, এগুলো আসলে একরকম পরিহাস। পকেট কাটার কুশলী আয়োজন। বাঁচার প্রয়োজন মেটানোর নয় একটুও।’

জাভেদ ভাই হাসতে হাসতে বলেন, ‘অনেক কঠিন কথা হয়ে গেল। একটা রসিকতা হোক। হাসতে হাসতে ভারটা কমাই।’

রসিকতা! জাভেদ ভাই’র দার্শনিক ধরনের সঙ্গে একদম যায় না। তবু শুনতে চাইছে যখন, তখন একটা চেষ্টা করি।

রোগী ডাক্তারকে বলছেন, এটা আমার প্রথম অপারেশন। শুনে ডাক্তার বলছেন, চিন্তার কিছু নেই, আমারও প্রথম অপারেশন। ডাক্তার প্রসঙ্গে এই রসিকতা প্রায় সবার শোনা। এই রসিকতাটাও নিশ্চয়ই অনেকে শুনেছেন। এক রোগী ডাক্তারকে বললেন, ‘ডাক্তার সাহেব, একটু ভালোভাবে চেক করুন। আমাদের অমুক ডাক্তার আমার ভাইকে নিউমোনিয়ার ওষুধ দিল। পরে দেখা গেল তার হয়েছে টাইফয়েড, তাতেই সে মারা গেল।’

ডাক্তার রেগে গিয়ে বললেন, ‘আরে রাখুন আপনার হাতুড়ে ডাক্তারের গল্প। আমি আপনাকে যদি নিউমোনিয়ার চিকিৎসা করি তাহলে নিউমোনিয়াতেই মারা যাবেন। টাইফয়েড পর্যন্ত যেতে হবে না।’

খুবই নিষ্ঠুর রসিকতা। কিন্তু এখন প্রাসঙ্গিক এই অর্থে যেন সঠিক রোগটা নির্ণীত হয়। সাধারণ জ্বর ভেবে বসে থেকে যেন ডেঙ্গুকে ডেকে না আনি।

অসুখবিসুখ মডেল বদলাচ্ছে। আমাদেরও রিমডেল হতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক



মন্তব্য