kalerkantho


সম্প্রীতির উঠোন খোঁজা

গোলাম কবির

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সম্প্রীতির উঠোন খোঁজা

সংস্কৃত সম্প্রীতি শব্দের পোশাকি অর্থ যা-ই হোক না কেন, আমরা এ শব্দের উচ্চারণে বুঝি দূরের, কাছের ও পারিপার্শ্বিকের সবার সঙ্গে সহৃদয় সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখা। প্রকৃতি সংশ্লিষ্ট সব কিছু শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের শিক্ষা দেয়। নিতান্ত শৈশবে একটি কবিতা পড়েছিলাম, যা আজও স্মরণে আছে : ‘আমগাছ, জামগাছ বাঁশঝাড় যেন/মিলেমিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন।’ হায়, প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ, সেই শিক্ষায় বলীয়ান হয়ে উঠল না কোনো দিন। অথচ সবাই আমরা সম্প্রীতি চাই।

সভ্যতার সূচনা থেকে মানুষে মানুষে সদ্ভাব রক্ষা করে চলার জন্য ব্যক্তিপুরুষের প্রবর্তন বা সংঘবদ্ধভাবে আয়োজন কম হয়নি। এ নিয়ে কত না মতবাদের জন্ম হয়েছে। সমাজসংস্কারক ও দার্শনিকমণ্ডলী সব কিছুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সম্প্রীতি রক্ষার উদ্দেশ্যে তাঁদের বাণী বিভিন্ন মাধ্যমে উত্কীর্ণ করে গেছেন। অভ্রান্ত বলে কথিত মতবাদ কোনো কোনো সময় সর্বজনস্বীকৃত হয়নি। অনেক সময় ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের কোন্দলে তা বহুধাবিভক্ত হয়ে গেছে। বিষয়টি সমাজ উন্নয়নের জন্য হোক কিংবা মতবাদ বিস্তারের জন্য হোক, সবাই মিলে সিদ্ধান্তে অটল থাকেনি। কারণ বেশির ভাগ মানুষ নির্জলা সংস্কারমুক্ত হয় না। এ কারণে এমনও দেখা গেছে, জাগতিক কিংবা পারত্রিক ধারণা সম্পর্কে ভুল বুঝিয়ে কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ একটি বহুপরীক্ষিত সমাজবিধানকে তছনছ করে ফেলেছে।

মানবমহিমা বিকশিত করার প্রধান অন্তরায় রিপু। অক্টোপাসের চেয়ে কঠিন এর বাঁধন। এখান থেকে মুক্ত হতে না পারলে, বিশেষ করে লোভ-মোহ-মদ-মাৎস্যর্য এই রিপুচতুষ্টয়ের অবদমন ছাড়া সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা সুদূর পরাহত। রিপুর অপর এক নাম শত্রু। এই শত্রুগুলোর মধ্যে কাম-ক্রোধ অন্যতম হলেও কামের প্রয়োজন আছে সৃষ্টিধারা অক্ষুণ্ন রাখার প্রয়োজনে। আর অন্ধ ক্রোধ যদিও বড় শত্রু; কিন্তু ক্রোধ কখনো কখনো নিজের অপূর্ণতাকে পূর্ণ করার বা মানবতা ধ্বংসকারীর স্পর্ধাকে খর্ব করার জন্য প্রয়োজনে আসে। এই ক্রোধ সুকুমার ‘জিদ’-এ রূপান্তরিত হলে মানবকল্যাণে মহান সৃষ্টির উজ্জীবন ঘটে, যা মানুষ যুগে যুগে দেখে এসেছে জ্ঞাত ইতিহাসের পাতায়। নিজের এবং সমর্থকদের বিত্তবৈভব বৃদ্ধির আয়োজন করে বৃহত্তর সমাজ থেকে বিমুখ হলে সেখানে সম্প্রীতির কল্পনা করা বৃথা। এতদসত্ত্বেও নিরাসক্ত মানবকল্যাণে যারা অগ্রণী, তাদের সহযোগিতা করা সংশ্লিষ্ট সবার জন্য কর্তব্য হওয়া উচিত।

কিছু মতবাদ আছে, যার সৃষ্টিমূলক সমালোচনা করা যায় না। সমাজ সংস্কারের জন্য এই সমালোচনাকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ‘সম্মার্জনী’ বলেছেন। এর ব্যত্যয় মানব উন্নয়নের জন্য ভয়ংকর সীমাবদ্ধতা। এই সীমাবদ্ধতা কিছু সময়ের জন্য বাঁধ দিয়ে রাখা যায়, তবে যথাসময়ে তার বিস্ফোরণ ঘটে। নিকট অতীতের সেই বিপর্যয় আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় তার ভয়াবহতা।

সম্প্রীতি বা ভালোবাসা কি আইন করে অথবা শক্তি প্রয়োগে জন্ম নেয়? হয়তো  নেয়; কিন্তু সদ্যোজীবীর মতো হয়তো ক্ষণকাল প্রভা দিয়ে আবার হারিয়ে যায়। দীর্ঘকালের সম্প্রীতি রক্ষার অন্যতম সোপান হলো ব্যক্তিগত লালসা বৃদ্ধির রাশ টেনে ধরা। অনেক কল্পনাবিলাসী মানুষ ভাবে, এমনটি হলে মানবসমাজ যান্ত্রিক হয়ে পড়বে। সম্প্রীতিহীন সমাজের চেয়ে যান্ত্রিকতা আপাত উত্তম নয় কি? যে সমাজ রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে : ‘স্ফীতকায় অপমান অক্ষমের বক্ষ হতে রক্ত শুষি করিতেছে পান/ লক্ষমুখ দিয়া; বেদনারে করিতেছে পরিহাস/ স্বার্থোদ্ধেত অবিচার’, (চিত্রা) সেখানে সম্প্রীতির কল্পনা যেন কাঁঠালের আমসত্ত্ব।

ক্ষমতা এবং সম্পদ মানুষে মানুষে যতটা সম্প্রীতি বিনষ্ট করে, তারচেয়ে নানা কিসিমের মতবাদ কম বিধ্বংসী নয়। মতবাদের ভিন্নতা বা একই মতবাদের মধ্যে নানা পথের অনুসরণ সৌহার্দ্যের অন্তরায়। শুধু অন্তরায় নয়, এ নিয়ে জগেজাড়া হানাহানি কম হয়নি। এখান থেকে মুক্তির পথ, কোনো মতবাদকে অভ্রান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য ধ্বংসাত্মক মনোভাব বর্জন করা। যুগোপযোগী পরিবর্তন-পরিবর্ধনের সুযোগ রাখা হলে হানাহানি কম হয় এবং সম্প্রীতির পরিবেশ জন্ম নেয়।

সমাজ ও রাষ্ট্রে সম্প্রীতিময় পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনে নীতিনির্ধারকদের উচিত মেধা ও মনুষ্যত্বের মূল্য দেওয়া। মতবাদের ঠুলি পরে ব্যক্তির মূল্যায়ন করলে মনুষ্যত্ব লুপ্ত হয়। ফলে দানা বেঁধে ওঠে সম্প্রীতিহীনতা। অথচ সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য নীরোগ রাখতে সম্প্রীতি অপরিহার্য। এর জন্য প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ হলো স্বার্থত্যাগ। কারণ স্বার্থমগ্ন মানুষ মানব অন্তরে স্থায়ী আসন পায় না।

সমাজে মেধা ও মনুষ্যত্বের চেয়ে কৃত্রিম দলবাজদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। এটি বোধ করি সম্প্রীতি রক্ষার জন্য কাম্য নয়। আপাতমধুর এই প্রবণতা চোখ ধাঁধায়। তবে সমাজের বিনষ্টি সেখান থেকেই শুরু। বিষয়টি সবার জানা থাকলেও তার মূলোৎপাটনে কেউ আগ্রহী নয়, বরং ক্ষমতার বলয়ে থেকে ন্যায়-অন্যায়বোধ বিলুপ্ত হয়ে পূর্ণভোগের পেয়ালা পান করতে মত্ত। এর ফলে সমাজের সর্বত্র সম্প্রীতির পরিবর্তে অসহিষ্ণুতার প্রাধান্য। এই অশুভ প্রবণতা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। তাহলে আশা করতে দোষ নেই, সম্প্রীতি আর পলাতক থাকবে না। কবি-কল্পনা যদিও মনে করছে, ‘প্রীতি ও প্রেমের পুণ্য বাঁধনে’ হয়তো স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। তবে এ যে মর্ত্যভূমি, এখানে ইন্দ্রিয়গত প্রবৃত্তিকে কঠিন ত্যাগের বন্ধনে আবদ্ধ করতে না পারলে সম্প্রীতি চিরকালই অধরা থেকে যাবে।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ



মন্তব্য