kalerkantho

রঙ্গব্যঙ্গ

অবাঞ্ছিত এমপি

মোস্তফা কামাল

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



অবাঞ্ছিত এমপি

বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এখন নিজের এলাকায়ই অবাঞ্ছিত। স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ তাঁর প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে। স্থানীয় নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন।

এর আগেও তাঁকে নিয়ে গণমাধ্যমে অনেক রিপোর্ট হয়েছে। তিনি বরগুনা আওয়ামী লীগকে শুধু পারিবারিক লীগেই পরিণত করেননি; ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন। স্থানীয় নেতাদের মতামতকে তোয়াক্কা করেননি। তাঁদের কোনো বিপদে তিনি এগিয়ে যাননি। এলাকায় উন্নয়নকাজের পরিবর্তে দলাদলি, মারামারি, জুলুম-নির্যাতন করেছেন। এখন তিনি মহাবিপদে আছেন। বলতে গেলে দৌড়ের ওপর আছেন।

কথায় বলে না, বিপদে পড়লে বিড়ালও মাদারগাছে ওঠে! শম্ভু বিপদে পড়ে এখন পত্রিকা অফিসে ছুটে এসেছেন। অনুনয়-বিনয় করে বললেন, ভাই, বড় বিপদে আছি। সাহায্য করেন। আপনাদের সাহায্য ছাড়া কিছুতেই উদ্ধার হতে পারব না।

সাংবাদিক : কেন, হঠাৎ আবার কী হলো?

শম্ভু : আর বলবেন না ভাই! দৌড়ের ওপর আছি। এলাকায় আমার দলের লোকরাই আমারে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। কন তো দেখি! নির্বাচনের আগে এ রকম একটা কাণ্ড কেন করল তারা? আমি ভোটারদের কাছে মুখ দেখাব কেমনে?

সাংবাদিক : কথায় আছে, ‘ভাবিয়া করিয়ো কাজ, করিয়া ভাবিয়ো না।’ আপনি আগে ভাববেন না?

শম্ভু : আরে ভাই, আমার অন্যায়টা কী সেটাই তো বুঝতে পারছি না!

সাংবাদিক : একটু চিন্তা করে দেখেন না, কেন অবাঞ্ছিত হলেন!

শম্ভু : ওরা বলল, আমি নাকি এমপি নির্বাচিত হয়ে ওদের কোনো মূল্যায়ন করি নাই। ওদের কাউকে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা করি নাই। ওদের কথা শুনি নাই। এলাকায় কোনো উন্নয়নকাজ করি নাই। শুধু নাকি নিজের উন্নয়ন করছি।

সাংবাদিক : এর মধ্যে কি কোনো সত্যতা নেই? সবই মিথ্যা?

শম্ভু : হয়তো কিছু সত্যতা আছে। তাই বলে আমি শুধু নিজের উন্নয়ন করছি, এই কথা ঠিক না।

সাংবাদিক : তাহলে কোনটা ঠিক?

শম্ভু : আরে ভাই, আমার ভাই-ব্রাদার, আত্মীয়-স্বজন ধনী হইছে না! স্যরি স্যরি! ভুল হয়ে গেছে। মানে কথা হলো, আমার এলাকার লোকজন বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ করছে না। তারা টাকা-পয়সা বানাইছে না!

সাংবাদিক : তার মানে এলাকায় কিছু ব্যক্তির উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু এলাকার কোনো উন্নয়ন হয়নি?

শম্ভু : দূর ভাই! কোথায় কী বলেন! সব কথা সব জায়গায় বলতে নাই। আচ্ছা শোনেন, আমি তো নতুন এমপি হই নাই। এর আগে মন্ত্রীগিরিও করছি। কি, করছি না?

সাংবাদিক ইতিবাচক মাথা নাড়লেন। শম্ভু আবার বললেন, মন্ত্রী হলে টাকা-পয়সা হয় না! হয় তো! তা ছাড়া আমি তো একেবারে গরিব মানুষ না। এই দেশে নির্বাচন করতে হলে কিছু টাকা-পয়সা তো লাগে! লাগে কি না?

সাংবাদিক : তা লাগে। মানিক সরকারও ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর অবস্থা দেখেন। দীর্ঘ ২০ বছর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরও তাঁর নিজের কোনো বাড়ি নেই। গাড়ি নেই। নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর পার্টি অফিসে গিয়ে উঠেছেন। তিনি যা বেতন পেতেন, তার সবটাই পার্টির তহবিলে দিয়ে দিতেন। পার্টি থেকে তাঁকে ১০ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হতো। তা দিয়েই চলত তাঁর সংসার।

শম্ভু : আ রে ভাই! কোথায় মানিক সরকার আর কোথায় শম্ভু দেবনাথ! তাঁর কথা বাদ দেন। তাঁরা টাকা না হলেও নির্বাচন করতে পারে। আমাদের এখানে তা হয় না। নির্বাচন বোর্ডের প্রথম প্রশ্ন কি জানেন তো?

সাংবাদিক : কী?

শম্ভু : নির্বাচন করবেন, টাকা-পয়সা আছে তো? তাহলে বোঝেন! এখনকার জমানায় টাকা ছাড়া নির্বাচন করা যায় না। যাঁরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গতবার এমপি হয়েছিলেন, এবার তাঁরা বুঝবেন কত ধানে কত চাল!

সাংবাদিক বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, মানে!

শম্ভু বললেন, মানে বুঝলেন না। আগেরবার তো বিনা খরচে কাম সারছে। এবার দুই নির্বাচনের খরচ করেও জেতে কি না সন্দেহ আছে! আরেকটা কথা আপনারে বলি, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের অনেকেই কিন্তু এলাকা থেকে দৌড়ানি খাইছেন। তাঁদের নিয়ে তেমন কিছু লিখলেন না। আমি অবাঞ্ছিত হইলাম আর সঙ্গে সঙ্গে আমারে নিয়া ঝাঁপাইয়া পড়লেন! কেন ভাই? কাহিনি কী, খুলে বলবেন?

সাংবাদিক : তাঁদের নিয়েও নিশ্চয়ই লেখা হয়েছে।

শম্ভু : না না! কোথায় হইছে? একটা দেখান! দেখাতে পারবেন না। এইটাই আমার দুঃখ, বুঝলেন! আমি কিছু করলেই দোষ! ভাই, যা লাগে আমি দিমু! আমারে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করেন!

সাংবাদিক : কী যে বলেন! আমরা কিভাবে উদ্ধার করব? যেমন কর্ম তেমন ফল! আপনি যা কর্ম করেছেন তার ফল পাবেন। এ তো সোজা কথা!

শম্ভু : না ভাই। অত সোজা, সোজা না। আপনারাই পারেন। আপনারা ভাসাইতেও পারেন, ডুবাইতেও পারেন। এবার আসি। আমার দিকে খেয়াল রাখবেন ভাই।

শম্ভু দেবনাথ বের হলেন। সাংবাদিক তাঁর দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক



মন্তব্য