kalerkantho


নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে আমরা মুক্তি পাব কবে?

মাছুম বিল্লাহ

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে আমরা মুক্তি পাব কবে?

টেকসই উন্নয়নের মূলকথা ‘সাক্ষরতা ও দক্ষতার উন্নয়ন’ (Literacy and skills development) হচ্ছে ২০১৮ সালের বিশ্ব সাক্ষরতা দিবসের স্লোগান। ব্যক্তিগত, সামাজিক ও মানবীয় উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে সাক্ষরতাকে গ্রহণ করা হয়। কারণ দারিদ্র্য হ্রাস, শিশুমৃত্যু রোধ, সুষম উন্নয়ন, শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য এটি একটি হাতিয়ার। যে মা-বাবা সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন তাঁদের সন্তানদের যেকোনো মূল্যে বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে থাকেন, আর এই প্রজন্ম তার পরের প্রজন্মকে আরো শিক্ষিত করার ধারার মধ্যে অবস্থান করে। এর অর্থ হচ্ছে সাক্ষরতার সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিক উন্নয়নও জড়িত। সাক্ষরতার বিষয়টি তাই ব্যক্তি, সমাজ, দেশ—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে পৃথিবীর সব দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূর করতে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। পরে ১৯৬৫ সালের ৮ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর ইউনেসকোর উদ্যোগে ইরানের তেহরানে বিশ্ব সাক্ষরতা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিশ্বের ৮০টি দেশের শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছিলেন। ওই সম্মেলনে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালনের প্রস্তাব করা হয়। পরে ১৯৬৫ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকো ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। আর ১৯৬৬ সালে ইউনেসকো দিবসটি প্রথম উদ্‌যাপন করল। তবে বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে ১৯৭২ সাল থেকে। সাক্ষরতার সঙ্গে উন্নয়নের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই যে দেশে এই হার বেশি সে দেশের উন্নয়নও তত বেশি। এখন সাক্ষরতা মানে শুধু অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন নয়, এর সঙ্গে জীবনধারণ, যোগাযোগ দক্ষতা ও ক্ষমতায়নের দক্ষতাও যুক্ত হয়েছে। কাজেই এর গুরুত্ব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি । একসময় ছিল, যখন কেউ নাম লিখতে পারলেই তাকে সাক্ষর বলা হতো। বর্তমানে  যে নিজ ভাষায় সহজ ও ছোট বাক্য পড়তে পারবে, সহজ ও ছোট বাক্য লিখতে পারবে এবং দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ হিসাব-নিকাশ করতে পারবে, তাকে আমরা সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ বলব। পৃথিবী এখন এই তিন শর্তযুক্ত সংজ্ঞাকেই সাক্ষরতার সংজ্ঞা হিসেবে বিবেচনা করে। এই সংজ্ঞা পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইউনেসকো ১৯৯৩ সালে পুনঃসংজ্ঞায়িত করে। প্রশ্ন হচ্ছে ২০১৮ সালেও কি আমরা এই সংজ্ঞাকে সঠিক ও সময়োপযোগী বলতে পারি? এখন সব শ্রেণি-পেশার মানুষের হাতে হাতে মোবাইল ফোন। তারা ইংরেজি পড়তে পারে না অনেকেই, অথচ মোবাইল ফোন রিসিভ করে, ফোন করে, অনেকে ইংরেজিতে মেসেজও লেখে। তাদের আমরা কী বলব?

আমাদের দেশে সাক্ষরতা বৃদ্ধির প্রথম উদ্যোগ গৃহীত হয় ১৯১৮ সালে নৈশবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এরপর ১৯৩৪ সালে খান বাহাদুর আহসানউল্লা, নবাব আবদুল লতিফ প্রমুখের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র। ১৯৬০ সালের ভি-এইড কার্যক্রমের আওতায় সফলভাবে পরিচালিত হয় বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম। এতে শত শত দরিদ্র মানুষ অন্তর্ভুক্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ব্যুরো অব নন-ফরমাল এডুকেশন’। ১৯৯১ সালে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিনা মূল্যে বই সরবরাহ করা হচ্ছে আর মেয়েদের শিক্ষাবৃত্তি তো আছেই। আমাদের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে ছয় থেকে ১০ বছরের ছেলে-মেয়েদের জন্য বিনা মূল্যে মৌলিক শিক্ষা প্রদানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো সাক্ষরতা বৃদ্ধি তথা প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে ধনাত্মক ফ্যাক্টর। কিন্তু এটিও তো ঠিক যে পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পরও অনেক শিক্ষার্থী দেখে দেখে বাংলা পড়তে পারে না, ইংরেজি তো দূরের কথা। এটিকে কোন ধরনের সাক্ষরতা বলব? সাক্ষরতার হার নির্ধারণে আমরা যে পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছি, সেটি সাক্ষরতার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। ১৯৮৫ সালে লেসোথোতে ব্যক্তি প্রদত্ত মূল্যায়ন, যা আমাদের দেশেও প্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহার করে সাক্ষরতার হার দেখানো হয়েছিল ৬০ শতাংশ, অথচ সাক্ষরতার পরিবর্তিত সংজ্ঞা অনুযায়ী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট করার মাধ্যমে মূল্যায়ন ও যাচাই করা হলে সাক্ষরতার হার ৪৬ শতাংশে নেমে এসেছিল। এটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ। কারণ আমরা দাবি করছি আমাদের সাক্ষরতার হার ৭২ শতাংশে পৌঁছে গেছে। এটির ভিত্তি কী? এখানে কী কী শর্ত ধরা হয়েছে, বিষয়টি সবার কাছে পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন।

আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতিতে যদিও বলা হয়েছিল যে ২০১৪ সালের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক সব নাগরিককে সাক্ষর করে তোলা হবে; কিন্তু সে লক্ষ্য থেকে আমরা অনেক দূরে অবস্থান করছি। আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় রয়েছে অপ্রতুলতা ও অনমনীয়তা। বিদ্যালয় উপযোগী বহু ছেলে-মেয়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না, তাদের আর্থিকভাবে পরিবারকে সহায়তা করতে হয়। বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। তাই সাক্ষরতার হার এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। এ ক্ষেত্রে উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর প্রচেষ্টা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এখনো ‘হার্ড টু রিচ’ এরিয়ায় পৌঁছেনি। এসব এলাকায় উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, এনজিও পরিচালিত স্কুলগুলোর গুরুত্ব এবং অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। বর্তমান বিশ্বে এখনো ৮০০ মিলিয়ন মানুষ সাক্ষর নয়, প্রতি পাঁচজন বয়স্ক মানুষের মধ্যে একজন নিরক্ষর,  বাংলাদেশও এর অন্তর্ভুক্ত। তাহলে এই বিশ্বায়ন, এই বিজ্ঞান, এই ডিজিটাল যুগের সার্থকতা কোথায়? এ এক বিশাল বিভাজন নয় কি? এই বিশাল নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৬৪ শতাংশই আবার নারী। বিশ্বের সাত কোটি শিশু এখন লিখতে ও পড়তে পারে না। বিশ্বের মোট অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর তিন-চতুর্থাংশই বাস করছে জনবহুল ১৫টি দেশে। বিশ্ব সম্পর্কে, নিজ দেশের বাইরে কোথায় কী হচ্ছে, তা জানতে হলে একজন মানুষের সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, সংঘাত নিরসন ও প্রতিরোধ করতেও সাক্ষরতার প্রয়োজন। আফ্রিকার অনেক দেশে আমরা অনবরত সংঘাত, অস্থিতিশীলতা দেখতে পাই। ওই সব দেশে সাক্ষরতার হারও কিন্তু অনেক নিম্নে অর্থাৎ শান্তিপূর্ণ অবস্থা ও উন্নয়ন সূচকের সঙ্গে সাক্ষরতার একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে।

দেশে সরকারি পর্যায়ে বিভাগীয়, জেলা ও দুটি উপজেলাসহ মোট ৭১টি গণগ্রন্থাগার পরিচালিত হচ্ছে। বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ৯০ লাখ ছাত্র-ছাত্রীকে বই পড়াচ্ছে। চার হাজার স্কুলে যেখানে কোনো লাইব্রেরি ছিল না, লাইব্রেরি স্থাপন করেছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। এ ছাড়া  আরো দুই হাজার বিদ্যালয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র লাইব্রেরি স্থাপন করেছে। ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি প্রায় তিন হাজার গণকেন্দ্র ও পাঁচ হাজার কিশোর-কিশোরী ক্লাবের মাধ্যমে লাইব্রেরি কার্যক্রম পরিচালনা করে প্রায় ১৪ লাখ পাঠক-পাঠিকা তৈরি করেছে দেশব্যাপী। এসব কেন্দ্রে বছরব্যাপী বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। জ্ঞান ও তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করছে ‘লাইব্রেরিজ আনলিমিটেড’ কর্মসূচি। আলোর পাশে যা থাকে, তা-ও আলোকিত হয়। এই হিসেবে এসব উদ্যোগ ও গ্রন্থাগার কার্যক্রমও দেশে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও বিভিন্ন আদমশুমারি অনুযায়ী ১৯৭১ সালে দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ১৬.৮ শতাংশ। তিন বছর পর অর্থাৎ ১৯৭৪ সালে এই হার দাঁড়ায় ২৫.৯ শতাংশে। এরপর ১৯৯১ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ৩৫.৩ শতাংশ। এ সময় দেশব্যাপী শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে ‘সমন্বিত উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বিস্তার কার্যক্রম (ইনফেপ)’ নামে একটি বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এরপর ২০০১ সালে সাক্ষরতার হার বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭.৯ শতাংশ। ২০০৩ সালে সরকারিভাবে সাক্ষরতার হার বেড়ে হয় ৬৫ শতাংশ। কিন্তু ২০০৮ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৪৮.৯ শতাংশ। বিষয়টি গবেষণার দাবি রাখে। আর ২০১০ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী দেশে সাক্ষরতার হার ৫৯.৮২ শতাংশ। বর্তমানে আমরা দাবি করছি ৭২ শতাংশ। সরকারি-বেসরকারি প্রচেষ্টার ফলে এই হার হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়, তার পরও গ্রহণযোগ্য মাপকাঠি দিয়ে দেখা উচিত এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে দেশে একজন মানুষও নিরক্ষর না থাকে।

লেখক : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক।

masumbillah65@gmail.com



মন্তব্য