kalerkantho


বাংলাদেশের রাজনীতিতে চরম এক ক্রান্তিকাল

গাজীউল হাসান খান

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বাংলাদেশের রাজনীতিতে চরম এক ক্রান্তিকাল

কোনো রাষ্ট্রে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সেখানকার অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও অসংগঠিত বিরোধী দলগুলোর বৃহত্তর ঐক্য প্রচেষ্টাকে উৎসাহ দেওয়ার অর্থ কোনোমতেই ক্ষমতাসীন দল বা জোটের বিরোধিতা করা নয়। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলও সরকার কিংবা শাসনব্যবস্থার একটি অপরিহার্য  অংশ। এটি ভুলে গেলে সরকারের কোনো যুক্তিগ্রাহ্য জবাবদিহি থাকবে না। থাকবে না সরকারের সার্বিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছতা। এর ফলে আইনের শাসন ভেঙে পড়বে। চারদিকে অপ্রতিরোধ্যভাবে মাথা তুলে দাঁড়াবে দুর্নীতিসহ অন্যান্য সামাজিক অপরাধ। দেশের মানুষ হারাবে তার মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সঙ্গে সঙ্গে লঙ্ঘিত হতে থাকবে মানবাধিকারের অন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো। এগুলোর মধ্যেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিহিত রয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে অর্থাৎ গত ৪৭ বছরে আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনালব্ধ বিষয়াদি থেকে ক্রমে ক্রমে অনেক দূরে সরে গেছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অর্থ শুধু স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে রোধ করে নিজেদের অপশাসনকে দীর্ঘায়িত করা নয়, বরং যে বৃহত্তর কারণে মানুষ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে যেতে বাধ্য হয়েছিল অর্থাৎ তাদের রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক অধিকারগুলো অর্জন করা। এ কথা অনস্বীকার্য যে আমাদের জাতীয় জীবনে এখন এক ক্রান্তিকাল চলছে। এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের অনেকেই যেন ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। সাম্প্রতিককালে দেশে দুর্নীতি, লুটপাট, ধর্ষণ, গুম, গুপ্তহত্যা ও রাজনীতির নামে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের পরিমাণ যেভাবে বৃদ্ধি পেতে দেখা গেছে, তাতে মনে হয়েছে এ দেশে আইনের শাসন শেষ হয়ে গেছে। এ দেশে সংসদের ভেতরে কিংবা বাইরে বিরোধী দল বলতে কিছু নেই। সংসদে বিরোধী দলের তথাকথিত সদস্যরা সরকারের মন্ত্রী হয়ে বসে আছেন। আর প্রশাসনিক ক্ষমতা হারিয়ে যারা হালে বিরোধী দলে পরিণত হয়েছে, তাদের ভেতরে কিংবা বাইরে কোথাও গণতন্ত্র একটি রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে মনে হয় না। তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে আসে না। আসে দু-একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে। সে অবস্থায় সরকারবিরোধী আন্দোলন কিংবা নির্বাচনের লক্ষ্যে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা এত দিন কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে নির্বাচন সামনে রেখে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে এখন যে ঐক্য প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে তাকে উৎসাহ দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া গণতন্ত্রমনা সব দেশপ্রেমিক নাগরিকের কর্তব্য বলে মনে করি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিষয়টি একেবারে উপেক্ষা করেননি।

সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের বৃহত্তম বিরোধী দল বিএনপি ছাড়াও রাজনৈতিক অন্য বিরোধী সংগঠনগুলো এরই মধ্যে বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে। বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি এবং নবগঠিত বিরোধী জোট যুক্তফ্রন্টের সভাপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী সম্প্রতি দেশের অপর এক প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরামের সঙ্গে এক বৃহত্তর ঐক্য মোর্চা গঠন করেছেন। এতে শিগগিরই তাঁদের সঙ্গে বিএনপির আরো অনেক বৃহত্তর একটি নির্বাচনী সমঝোতা বা মোর্চা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা অত্যন্ত বলিষ্ঠ হয়ে দেখা দিয়েছে। বিএনপির কারারুদ্ধ নেত্রী  খালেদা জিয়ার অবর্তমানে প্রবীণ রাজনীতিক অধ্যাপক বি চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনের রাজনৈতিক ভূমিকা অত্যন্ত ব্যাপক হয়ে দাঁড়াতে পারে। অধ্যাপক বি চৌধুরী কিংবা কামাল হোসেন সম্পর্কে সরকারি মহল থেকে যত সমালোচনাই করা হোক, এ দুজন ব্যক্তিই অত্যন্ত সৎ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং দুর্নীতির অনেক ঊর্ধ্বে বলে সাধারণ মানুষ মনে করে। তা ছাড়া এ দুজন বিশিষ্ট ব্যক্তির অতীতে দুটি দলীয় সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। অধ্যাপক বি চৌধুরী শুধু বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকই ছিলেন না, তিনি বিএনপি গঠিত সরকারে বিভিন্ন সময় শিক্ষামন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেছিলেন। তা ছাড়া বঙ্গবন্ধুর অধীনে গঠিত সরকারের আইনমন্ত্রী ও পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন ড. কামাল হোসেন। তা ছাড়া তাঁর  নেতৃত্বেই রচিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের  সংবিধান। সুতরাং নেতৃত্বশূন্য বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরে এ দুজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক ঐক্য মোর্চা গঠন নিঃসন্দেহে অধিকারসচেতন সাধারণ মানুষের জন্য একটি অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক খবর। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, যখন খালেদা জিয়া কারা অন্তরিন এবং তাঁর পুত্র ও দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে রয়েছেন রাজনৈতিক আশ্রয়ে তখন বিএনপিসহ সম্মিলিত বিরোধী জোটের নেতৃত্বে উল্লিখিত এ দুই ব্যক্তির নেতৃত্ব হতে পারে অত্যন্ত ফলপ্রসূ। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া কিংবা তাঁর পুত্র তারেক রহমান আদালতে সাজাপ্রাপ্তির কারণে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। সে অবস্থায় নির্বাচনী জোটে সার্থকভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা আর তেমন কারো মধ্যে দেখা যায় না। তা ছাড়া বিএনপির সিনিয়র নেতাদের অনেকের বিরুদ্ধে এখনো রয়েছে অনেক দুর্নীতির মামলা।

বিরাজমান বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য নির্বাচনের অন্তত দুই মাস আগে বর্তমান সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অধ্যাপক বি চৌধুরী। তা ছাড়া সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের দাবিও জানিয়েছেন তিনি। অনেকে মনে করে বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীর পদে রেখেও একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা সম্ভব। অধ্যাপক বি চৌধুরীসহ যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামের গঠিত মোর্চার নেতাদের মতে, নির্বাচনের সময় একটি নিরপেক্ষ সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। নির্বাচনের এক মাস আগে এবং পরে আরো ১০ দিন সামরিক বাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দিতে হবে। নতুবা কোনোমতেই একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে বিরোধীদলীয় নেতারা দাবি করেছেন। সবাই চায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সব দলের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করার আন্তরিক প্রচেষ্টা। এ ব্যাপারে দেশের চলমান সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের একটি বৈঠক হয়েছে বলে জানা গেছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে থাকা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীনদের মনোভাব, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপির সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানসহ সার্বিক বিষয়াদি আলোচিত হয়েছে বলে কালের কণ্ঠ আভাস দিয়েছে। বিএনপি নেতাদের ধারণা,  শিগগিরই তাঁদের নেতা তারেক রহমানকে জড়িয়ে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় প্রকাশ করা হবে, যা লন্ডনের রাজনৈতিক আশ্রয় থেকে তারেক রহমানের দেশে ফেরাকে অসম্ভব করে তুলতে পারে। সে অবস্থায় শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের আগে সাময়িকভাবে জামিন পেলেও খালেদা জিয়া বিশেষ কিছু করতে পারবেন না বলে অনেকে মনে করে। এসব নিয়ে নবগঠিত যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম মোর্চার নেতাদের সঙ্গে বিএনপি নেতারা শিগগিরই একাধিক বৈঠকে মিলিত হবেন বলে জানা গেছে। এতে খালেদা জিয়ার ভবিষ্যৎ থেকে শুরু করে আসন্ন নির্বাচনে দেশব্যাপী আসন ভাগাভাগির ব্যাপারেও বিস্তারিত আলোচনা হবে। আগামী নভেম্বরের শেষ কিংবা ডিসেম্বরের শুরুতে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে কিভাবে সরকারের ওপর সামগ্রিকভাবে বিরোধী দল ঘোষিত দাবিদাওয়া নিয়ে চাপ প্রয়োগ করা হবে তার কৌশল নির্ধারণ করা এখনই আবশ্যক বলে তাঁরা মনে করেন।

ওপরে উল্লিখিত জরুরি বিষয়াদি নিয়েই সরকার কিংবা সরকারি দলের সঙ্গে বৈঠকে বসতে চান বিএনপিসহ নবগঠিত বিরোধীদলীয় ঐক্য মোর্চার নেতারা। কারণ নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তাঁদের হাতে আর তেমন বেশি সময় নেই। অন্যদিকে শেখ হাসিনার বর্তমান ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার যদি একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও অর্থবহ নির্বাচন চায়, তবে বিরোধী দলগুলোকে নির্বাচনে আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে না পারলে অতীতের মতো অনেকেই নির্বাচন বর্জন করতে বদ্ধপরিকর। এতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো একটি ভোটারবিহীন নির্বাচন করে কোনো লাভ হবে না। সে নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪ জন নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। সে নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাতিসংঘ কিংবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) কেউ মানেনি। সে নির্বাচন ও তার ফলাফল নিয়ে বিতর্ক এখনো রয়েই গেছে। সে ক্ষেত্রে আরো একটি নতুন বিতর্ক সরকারের সব অর্থনৈতিক সাফল্যকেই ম্লান করে দেবে। সামনে নিয়ে আসবে স্বৈরতন্ত্রের একটি পূর্ণ চিত্র। এতে জনগণের গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘন, সরকার নিয়ন্ত্রিত ৯টি ব্যাংক লুটপাট, দুর্নীতি, সরকারের জবাবদিহি, অস্বচ্ছতা ও আইনের শাসনের চূড়ান্ত অবক্ষয়ের চিত্রই বিশ্বব্যাপী ফুটে উঠবে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ভোটারবিহীন নির্বাচন হলেও বাংলাদেশকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য সে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে পাশ্চাত্য জগৎ থেকে শুরু করে সবাই অপেক্ষা করছিল আরেকটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য; কিন্তু তা হয়নি। অথচ সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করেছে। এত কিছুর পরও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছে সরকার। জ্বালানি, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অত্যন্ত অগ্রগতি সাধন করেছে। ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে-বিদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। সেসব সাফল্য, অগ্রগতি ও জনপ্রিয়তাকে ধরে রাখতে হলে কিংবা আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে আসন্ন নির্বাচনটি হতে হবে সম্পূর্ণ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। নতুবা নির্বাচন নিয়ে বারবার একই কাহিনির পুনরাবৃত্তি করা যাবে না। এতে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশ তার কদর হারাবে। বাংলাদেশিদের গণতান্ত্রিক ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কারণে কোথাও মাথা তুলে দাঁড়ানো হয়তো আগের মতো সম্ভব হবে না।

পর পর সম্পূর্ণ দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থেকে এবং অর্থনৈতিক ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেও নির্বাচনে জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেত্রী শেখ হাসিনার কোনো ভয়ভীতির আশঙ্কা থাকার কথা নয়। এ সময়ে তাদের দাবি অনুযায়ীই তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী কিংবা পরাজিত শক্তির বিচার প্রায় সম্পন্ন করেছে। অনেকটাই দেশব্যাপী জঙ্গিবাদের অবসান ঘটিয়েছে। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগের অবস্থা সৃষ্টি করেছে। তা ছাড়া অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও সরকার সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছে। কিন্তু তার কোনো কিছুই দেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সত্যিকার অর্থে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প হতে পারে না। যে দেশে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন কিংবা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে পারছে না, সে দেশে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নটি কি অবান্তর নয়। বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হচ্ছে আওয়ামী লীগ। এ ঐতিহ্যবাহী সংগ্রামী রাজনৈতিক দলটির বয়স এখন প্রায় ৫০ বছর। সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী এ দলের দায়িত্ব এখন দেশের অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকে গণতন্ত্র ও জবাবদিহির রাজনীতি শিক্ষা দেওয়া, সর্বক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী একটি দল। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পূর্ণাঙ্গ বহিঃপ্রকাশ ঘটানোই হতে হবে তাদের প্রধান লক্ষ্য। আওয়ামী লীগ কিংবা ক্ষমতাসীন দল সেদিকেই অগ্রসর হচ্ছে বলে তার নেতাকর্মীরা দাবি করছে। সে কারণে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের পক্ষে কোনো অসাধ্য কাজ নয় বলে তথ্যাভিজ্ঞ মহল মনে করে। এ ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার ব্যাপারে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের কোনো আপত্তি থাকার কারণ আছে বলে মনে হয় না। কারণ একটি পরিচ্ছন্ন ও সফল নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারাই হবে সরকারের অসামান্য সাফল্যের বিষয়। আমরা যারা স্বাধীনতার বেশ আগে থেকেই বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) সাংবাদিকতা কিংবা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত তারা অবশ্যই একটি ব্যাপারে একমত যে এ দেশের জনগণ যথাসময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে ভুল করে না। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস সে শিক্ষাই দেয়।

জনগণকে নিয়ে এবং জনগণের জন্যই আমাদের সব রাজনৈতিক দলের রাজনীতি। সত্যিকার অর্থে জনগণই সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। যাঁরা তাঁদের জনগণের মুক্তির জন্য কিংবা সার্বিক কল্যাণের জন্য রাজনীতি করেন তাঁরা কোনো দিনই পরাজিত হন না। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন থেকে শুরু করে ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল—সবাই বারবার এ সত্যটিই প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক অধিকার না থাকলে আর বাকি সব কিছুই গঠন হয়ে যায়। বাংলাদেশ এখন একটি ক্রান্তিকাল পেরোচ্ছে বলে অনেকেই অভিমত প্রকাশ করেছে। এই সময়টি সাফল্যজনকভাবে পেরোতে পারলে কিংবা বিরাজমান সংকটগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে বাংলাদেশের জনগণ তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবে বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অপশাসন ও অন্যান্য রাজনৈতিক কিংবা আর্থ-সামাজিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারলে বাংলাদেশের রাজনীতিকরা যোগ্য নেতৃত্বের বেদিতে পৌঁছতে অবশ্যই সক্ষম হবেন। প্রয়োজন পরমতসহিষ্ণুতা, মূল্যবোধ ও চরম আত্মত্যাগের। ক্ষমতা শেষ কথা হতে পারে না।

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

gaziulhkhan@gmail.com



মন্তব্য