kalerkantho


উত্তরে আলো ছড়াচ্ছে আকাশপথ

রেজানুর রহমান

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



উত্তরে আলো ছড়াচ্ছে আকাশপথ

সৈয়দপুর বিমানবন্দর। সকাল পৌনে ৯টা। একটা উড়োজাহাজ এই মাত্র বিমানবন্দর থেকে উড়ে গেল। কিছুক্ষণ পরই আরেকটা উড়োজাহাজ এলাকা কাঁপিয়ে রানওয়ে স্পর্শ করল। দৃশ্যটা দেখে আমার পাশে দাঁড়ানো একজন বয়স্ক লোক অহংকারের ভঙ্গিতে বললেন, একটু পরেই আরেকটা নামবে। জানেন, বাংলাদেশের এই ছোট্ট বিমানবন্দরটা এখন খুবই ব্যস্ত সময় পার করে। চারটি উড়োজাহাজ সংস্থার একাধিক উড়োজাহাজ প্রতিদিন পালা করে ঢাকা থেকে উড়ে আসে আবার ঢাকার দিকে উড়ে চলে যায়। দেখতে কী যে ভালো লাগে! বলতে বলতে লোকটি দ্রুত সামনের দিকে পা বাড়াল। তার যাওয়ার ভঙ্গি দেখে মনে হলো, বিমানবন্দরে এই মাত্র নামা উড়োজাহাজটিতে হয়তো তার কোনো আত্মীয় অথবা পরিবারের কোনো সদস্য ঢাকা থেকে এসেছে।

ছোট্ট বিমানবন্দরটিতে অনেক ব্যস্ততা। দেশি-বিদেশি মানুষের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। সৈয়দপুর থেকে সড়কপথে গাড়িতে চড়ে নীলফামারী জেলা শহরে যেতে সময় লাগে বড়জোর ২০ থেকে ২৫ মিনিট। রংপুরে যেতে সময় লাগে ৩৫ থেকে ৪০ মিনিট। দিনাজপুরে যেতেও একই সময় লাগে। সে কারণে এখন মধ্যবিত্তের বাহনও হয়ে উঠেছে আকাশপথের উড়োজাহাজ। সবচেয়ে বড় কথা, দেশের উত্তরাঞ্চলে উন্নয়ন-অগ্রগতির যে পালাবদল শুরু হয়েছে, সে ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে দেশের এই ছোট্ট বিমানবন্দরটি। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। ২৯ আগস্ট নীলফামারী জেলা শহরে নবনির্মিত শেখ কামাল স্টেডিয়ামে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলের মধ্যে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ২০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার নতুন এই স্টেডিয়ামে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। অনেকে খেলার টিকিট না পেয়ে ফিরে গেছেন। ঢাকা থেকে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরসহ ফুটবল অঙ্গনের জাতীয় পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরাসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তি এই খেলা দেখতে নীলফামারীতে এসেছিলেন। সন্ধ্যা নামার আগেই খেলা শেষ হলো। আধাঘণ্টার ব্যবধানে সংস্কৃতিমন্ত্রীসহ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অতিথি দর্শককে দেখা গেল সৈয়দপুর বিমানবন্দরে। সবাই ঢাকায় ফিরে যাচ্ছেন। সবাই একটু আগে ছিলেন নীলফামারীতে। আবার একটু পরেই থাকবেন ঢাকায়। ঢাকার আশপাশের কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেও এত কম সময়ে ঢাকায় ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অথচ বহুদূরের পথ সৈয়দপুর থেকে ফিরে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সে কারণে ঢাকা টু সৈয়দপুরের আকাশভ্রমণ অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সৈয়দপুরে রয়েছে ইপিজেড। বিদেশি অনেক কর্মকর্তা প্রতিদিন ঢাকা থেকেই আকাশপথে সৈয়দপুরে আসা-যাওয়া করেন। সকালের উড়োজাহাজে সৈয়দপুরে নামেন, আবার বিকেলের উড়োজাহাজে ঢাকায় ফিরে যান। ফলে অনেক সময় ফ্লাইটের টিকিট পাওয়া নিয়েও নানা বিড়ম্বনা দেখা দেয়।

অথচ আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে সৈয়দপুরের এই বিমানবন্দরটি বলা যায় অচল হয়ে পড়ে ছিল। সরকারি উড়োজাহাজ সংস্থা ‘বিমান’ যাত্রী আনা-নেওয়া শুরু করলেও অজানা কারণে একসময় ‘বিমান’-এর সেবা কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। সময়ের প্রয়োজনে বর্তমান সরকারের আন্তরিকতায় দেশের ছোট্ট এই বিমানবন্দর এখন অনেক ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ঢাকার পরেই চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রামের পরেই সৈয়দপুর বিমানবন্দরের ব্যস্ততা বেশি। যদিও সৈয়দপুর বিমানবন্দরের রানওয়ে দেশের বিমানবন্দরগুলোর রানওয়ের তুলনায় দৈর্ঘ্যে সবচেয়ে ছোট। শোনা যাচ্ছে, সৈয়দপুর বিমানবন্দরের সম্প্রসারণকাজ শিগিগরই শুরু হবে। জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। আশা করা যায়, কয়েক বছরের মধ্যে সৈয়দপুর বিমানবন্দরের চেহারা হয়তো পাল্টে যাবে। সেই সঙ্গে পাল্টে যাবে এলাকার পরিবেশও। কিন্তু সে জন্য বিমানবন্দরের উন্নয়ন প্রস্তুতি ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো প্রস্তুতি কি চোখে পড়ছে? ছোটবেলার একটি স্মৃতি মনে পড়ছে। প্রাইমারি স্কুলে দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। কুড়িগ্রাম থেকে উলিপুর হয়ে চিলমারী পর্যন্ত রেললাইন নির্মিত হয়েছে। প্রথম যেদিন রেলগাড়ি নামল এই রুটে, গোটা এলাকার মানুষের মাঝে সেকি সাজসাজ রব। রেলগাড়িতে চড়ে ‘সাহেব’ টাইপের মানুষজন আসা-যাওয়া করছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও ‘সাহেব’ হওয়ার প্রবণতা শুরু হয়ে গেল। বছরখানেকের মধ্যেই একটি রেলগাড়ি বদলে দিল গোটা এলাকার সাধারণ মানুষের জীবনধারণপ্রক্রিয়া ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ।

সৈয়দপুর বিমানবন্দরও ঠিক একই ভূমিকা পালন করছে। প্রতিদিন আকাশপথে উড়ে আসে দেশি-বিদেশি অগ্রসরমাণ অনেক মানুষ। বিশেষ করে বিদেশিরা সৈয়দপুরে নেমেই প্রথমে খোঁজ করেন ভালো মানের কোনো আবাসিক হোটেল আছে কি না? আবার বিনোদনের ব্যাপারেও তাঁরা জানতে চান। উন্নত মানের যানবাহনের খোঁজও করেন অনেকে। কিন্তু এলাকাটা কি এ ক্ষেত্রে প্রস্তুত? অথবা এ ক্ষেত্রে আছে কি সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনা?

ঢাকা টু সৈয়দপুরের আকাশপথ উত্তরবঙ্গের সৈয়দপুর, নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাটসহ গোটা এলাকায় একটা পরিবর্তনের আলো ফেলেছে। কিন্তু আমরা বোধ করি এই আলো যথার্থভাবে কাজে লাগাতে পারছি না। বাড়িতে অতিথি আসার খবর পেলে আমরা সাধারণত কী করি? ঘর সাজাই, পরিবারের সবাইকে পরিপাটি করে তুলি। নতুন কাপড় পরি। তেমনি উত্তরবঙ্গের গোটা এলাকাটাকেও তো সাজানো যায়। নতুনভাবে সাজাতে পারি সৈয়দপুরের ঐতিহ্যবাহী রেল কারখানাটিকে। পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে নতুন করে সাজিয়ে তুলতে পারি নীলফামারীর নীলসাগর, দিনাজপুরের কান্তজির মন্দির, রামসাগর, সৈয়দপুরের চিনি মসজিদ, রংপুরের তাজহাট জমিদারবাড়িসহ এলাকার বিনোদনকেন্দ্রগুলোকে। এ জন্য একটা সাংস্কৃতিক জাগরণ দরকার। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এ ধরনের কোনো উদ্যোগই দৃশ্যমান নয়। বরং সাংস্কৃতিক একটা বন্ধ্যত্ব চলছে গোটা এলাকায়। বিশেষ করে সৈয়দপুরের সাংস্কৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে। শহরের বেশির ভাগ বাসিন্দা উর্দুভাষী। ফলে মিশ্র সংস্কৃতির এই শহরে বাংলা গান, বাংলা নাটক, বাংলা ছায়াছবি  অনেকটাই উপেক্ষিত। বরাবরের মতো এবারের ঈদেও দেশের প্রায় প্রতিটি টিভি চ্যানেলে ব্যাপক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন ছিল। তবু সৈয়দপুর শহরের বেশির ভাগ বাসাবাড়িতে বিদেশি টিভি চ্যানেলই গুরুত্ব পেয়েছে। এই যে ভিনদেশীয় সাংস্কৃতিক প্রবণতা, এর ভবিষ্যৎ কী? অনেকে হয়তো বলবেন, এটা শুধু সৈয়দপুরের চিত্র নয়, সারা দেশেই এই প্রবণতা বিদ্যমান। স্বীকার করছি। কিন্তু সৈয়দপুরের সাংস্কৃতিক পরিবেশ যেন নিজস্ব গতি হারাচ্ছে। বিটিভি না দেখে কেউ যদি পিটিভি দেখায় ব্যস্ত থাকেন, তাহলে তো প্রশ্ন থেকেই যায়।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, আমি হঠাৎ সৈয়দপুর শহরের সাংস্কৃতিক পরিবেশ নিয়ে কথা বলছি কেন? বলছি এ জন্য যে প্রতিদিন আকাশপথে উড়ে আসছে যে পরিবর্তনের আলো, তা প্রথমে গিয়ে পড়ছে মিশ্র এক সংস্কৃতির ওপর। শহরের মানুষের ভাষা না বাংলা না উর্দু। একটা জগাখিচুড়ি অবস্থা। এই শহরে ভালো কোনো সিনেমা হল নেই। একসময় মঞ্চনাটক হতো। এখন ওই সব মঞ্চে বিয়ের বর-কনে সেজে বসে থাকে। মঞ্চ ঘিরে বিয়ের অনুষ্ঠান হয়।

ছোটবেলায় একটা রেলগাড়ি কিভাবে গোটা এলাকার পরিবর্তন ঘটাতে পারে, তা স্বচক্ষে দেখেছি। বড়বেলায় এসে দেখছি, আকাশপথের যোগাযোগব্যবস্থার অপূর্ব কারিশমা। সৈয়দপুর বিমানবন্দর সচল হওয়ায় উত্তরাঞ্চলে একটা জাগরণ দেখা দিয়েছে। সুস্থ সংস্কৃতিই পারে এই জাগরণ আরো বেগবান করতে। দেশ স্বাধীনের আগে এই শহরে বিনোদনের নানা ক্ষেত্র প্রসারিত ছিল। জৌলুসপূর্ণ ক্লাব ছিল। এখন নেই। অথচ সময়ের বাস্তবতায় এখন আধুনিক মানের ক্লাব ও বিনোদনকেন্দ্র খুবই জরুরি। ধরা যাক, সৈয়দপুরে আন্তর্জাতিক মানের একটি বিনোদন ক্লাব গড়ে উঠল। নিশ্চিত বলে দিতে পারি, বিদেশিদের মধ্যে যাঁরা প্রতিদিন আকাশপথে ঢাকা থেকে উড়ে এসে সৈয়দপুর ইপিজেডে অফিস করেন, তাঁরা সৈয়দপুরেই থেকে যাবেন। এ জন্য প্রয়োজন সমন্বিত রাজনৈতিক উদ্যোগ। সেই সঙ্গে গোটা এলাকা ঘিরে সাংস্কৃতিক জাগরণের এক সমন্বিত পরিকল্পনাও প্রয়োজন। সময় থাকতেই তা করা জরুরি। কথায় আছে—সময়ের এক ফোঁড়ে যা কাজ হয়, অসময়ে হাজার ফোঁড়েও তা হয় না। কাজেই সময়ের কাজ সময়েই করা জরুরি। সৈয়দ শামসুল হকের কবিতার ভাষায় বলি—জাগো বাহে কোনঠে সবায়...

লেখক : কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক-আনন্দ আলো



মন্তব্য