kalerkantho


ইদলিব ইস্যুতে আবারও মার্কিন হামলার হুমকি

আলেস্টেয়ার ক্রুক

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ইদলিব ইস্যুতে আবারও মার্কিন হামলার হুমকি

অবশেষে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালে নির্বাচনী প্রচারকালে ঘোষিত ‘মহান’ পররাষ্ট্রনীতির খোলসটা খুলেই ফেললেন। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মধ্য দিয়ে তাঁর ‘বিশ্বশান্তি ছাড়া আর কিছু নয়’ শীর্ষক পররাষ্ট্রনীতির তথাকথিত খোলস খসে পড়ল। তাঁর এমন পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে এক উপলব্ধি—যার ফলে তাঁর মনে হয়েছে তাঁর দেশের বেশির ভাগ মানুষ আর যা-ই চাক, যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণহীন বিশ্ব চায় না।

শুরুটা হয়েছিল ৮ মে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট সেদিন ইসরায়েলের পথ ধরেন। তিনি ইরানের পরমাণু চুক্তি থেকে সরে গেছেন। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেশটিকে জব্দ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং এখনো কার্যকর হতে না পারা ‘সুন্নি আরব ন্যাটো’কে অনুমোদন দিয়েছেন। রিয়াদের নেতৃত্বে এ জোট শিয়া ইরানের মুখোমুখি হবে। এভাবেই তিনি তাঁর ভূ-রাজনীতি সামলানোর কূটনৈতিক কৌশল বদলে ফেলেছেন।

ট্রাম্প যখন ইসরায়েলের পথ ধরলেন, আরো স্পষ্ট করে বললে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পথ ধরলেন তখন সেই পথের অন্য সব গলিঘুঁজির দায়দায়িত্বও যেন তাঁর ঘাড়ে পড়ল। ১৯৯৬ সালে নেতানিয়াহুর জন্য রিচার্ড পার্লের নেতৃত্বে ‘ক্লিন ব্রেক’ শীর্ষক যে নথি প্রস্তুত করা হয়েছিল, তাতে ইসরায়েলি ও মার্কিন নব্য রক্ষণশীলদের এক ছাদের নিচে দাঁড় করানো হয়েছিল। সেই সম্পর্ক আজও বিদ্যমান। ট্রাম্পের চারপাশে এখন প্রকাশ্যে ইরানবিরোধী নব্য রক্ষণশীলদের ভিড়। তাদের মধ্যে শেলডন অ্যাডেলসনও রয়েছেন। অ্যাডেলসন ট্রাম্পের তহবিলে অর্থের অন্যতম জোগানদার এবং নেতানিয়াহুর পৃষ্ঠপোষক।

হেলসিংকিতে ট্রাম্প-পুতিন বৈঠকের পর মনে হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার সহযোগিতামূলক সম্পর্ক তৈরির সুযোগ বুঝি সৃষ্টি হয়েছে, সিরিয়ায় স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প কিছু ইতিবাচক কথাবার্তা বলেছিলেন। তার পরও সহযোগিতার সম্পর্কবিষয়ক অগ্রগতি থেমে গেল। কেন এমন হলো, তা পরিষ্কার নয়। তবে একটা লক্ষণ বোধ হয় স্পষ্ট হলো—ওয়াশিংটনের ক্ষমতায় চিড় ধরছে। হেলসিংকির বোঝাপড়া নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

সেই বোঝাপড়া টিকিয়ে রাখার কোনো রাস্তা আছে কি না, থাকলে সেটা টেকসই কি না, তা বোঝার জন্য রুশ নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান নিকোলাই পত্রুুশেভকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনের সঙ্গে দেখা করার জন্য ২৩ আগস্ট জেনেভায় পাঠিয়েছিলেন পুতিন। ওই বৈঠকের আগেই বোল্টন ঘোষণা দেন, সিরিয়ার সরকার ইদলিব দখলের জন্য রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করলে যুক্তরাষ্ট্র কড়া জবাব দেবে।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২৫ আগস্ট বলেছে, ব্রিটিশ কম্পানির কাছ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হায়াত তাহরির আর শাম উত্তর সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সিরিয়ায় নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য এটাকে অজুহাত হিসেবে কাজে লাগাবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র হামলার নাটক সাজানোর ব্যাপারে গোয়েন্দা তথ্য তাদের কাছে আছে—এমন কথাও বলেন রুশ কর্মকর্তারা।

আগস্টের শুরু থেকেই সিরিয়ায় হামলা চালানোর জন্য চারপাশে সামরিক বহর জড়ো করছে যুক্তরাষ্ট্র। তুরস্কের হুরিয়াত সংবাদপত্র যুক্তরাষ্ট্রের এমন কর্মকাণ্ডের কথাই বলেছে, যদিও এ কথার সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিকে রাশিয়া গুরুত্বের সঙ্গেই নিয়েছে। গুরুত্ব দিচ্ছে ইরানও। যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে রাশিয়া-সিরিয়া-ইরান যেন সম্মিলিতভাবে জবাব দিতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী দামেস্ক সফর করেছেন।

সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার তোড়জোড়ের মধ্যেই পত্রুশেভ-বোল্টন বৈঠক হয়েছে। একেবারে যাচ্ছেতাই বৈঠক। যুক্তরাষ্ট্রের গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ ও সিরিয়ায় ইরানের ভূমিকা—দুই ইস্যুর কোনোটি নিয়েই তাঁদের মধ্যে বনিবনা হয়নি। বার্তাটি বোধ হয় পরিষ্কার, হেলসিংকিতে যদি কোনো বোঝাপড়া হয়েও থাকে, সেটা শেষ। তবে কি যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় হামলা চালাবে? কেন?

এখন পর্যন্ত একটা কারণ স্পষ্ট। ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য নীতির নেতৃত্বে আছে নব্য রক্ষণশীলরা। যে দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্প সম্পর্ক গড়েছেন, সেটা ধসে পড়েছে। বোল্টন, পম্পেও আর নব্য রক্ষণশীলরা বুঝিয়ে দিয়েছে, সিরিয়ায় সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য থেকে তারা বিচ্যুত হয়নি এবং ইরানকেও তারা ভোগাবে।

ইসরায়েল কি স্বঘোষিত অধিকারের অজুহাত তুলে সিরিয়ার যেকোনো জায়গায় ইরানি বাহিনীর ওপর হামলা চালাবে? সিরিয়ায় তারা বিমান হামলা চালালে রাশিয়া কিছুই করবে না—এমন নিশ্চয়তা কি নেতানিয়াহু দিতে পারবেন? ঘটনা যা-ই ঘটুক, রাশিয়া ও চীন জানে, শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তারা যেকোনো উপায়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ধরে রাখতে চান। সংকট কাটানোর জন্য রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাসায়নিক হামলা-চেষ্টা বিষয়ক গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ওয়াশিংটন কি শুনবে? তাদের কাছে সিরিয়া ও ইরান সরকার চরম শত্রু। রাশিয়ার কোনো যৌক্তিক কথা কি তাদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারবে? রাশিয়া ভূমধ্য সাগরে জড়ো করা ক্ষেপণাস্ত্র কাজে লাগানোর হুমকি দিলে বোধ হয় কাজ হতে পারে। কিন্তু তারপর কী?

লেখক : সাবেক ব্রিটিশ কূটনীতিক, কনফ্লিক্টস ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক

সূত্র : স্ট্র্যাটেজিক কালচার জার্নাল (অনলাইন)

ভাষান্তর : শামসুন নাহার



মন্তব্য