kalerkantho


উ. কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে আবারও ঝোড়ো মেঘ

অ্যান্ড্রু সালমন

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



উত্তর কোরিয়ার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যের দিকে এগোতে শুরু করার আগেই থেমে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। পিয়ংইয়ং ও ওয়াশিংটন আবার তাদের পুরনো কৌশলে ফিরে গেছে। এসব গত জুনে সিঙ্গাপুরে দুই দেশের নেতাদের মধ্যে শীর্ষ বৈঠকের পর থেকেই বন্ধ ছিল।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস ম্যাটিস আভাস দিয়েছেন, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র আবারও তাদের সামরিক মহড়া শুরু করতে পারে। গত জুনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের শীর্ষ বৈঠকের পর শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে এই মহড়া বন্ধ রাখা হয়েছিল।

পেন্টাগনে গত মঙ্গলবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ম্যাটিস বলেন, ‘সিঙ্গাপুর সম্মেলনের পর আমরা শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে বড় ধরনের কয়েকটি মহড়া স্থগিত করি। এবার আর কোনো মহড়া স্থগিত করার পরিকল্পনা নেই আমাদের।’

উত্তর কোরিয়ার অভিযোগ, বড় ধরনের বার্ষিক যৌথ মহড়াগুলো মূলত হামলা চালানোর প্রস্তুতি। সাধারণত বসন্ত ও গ্রীষ্মে এই মহড়াগুলো অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবারই এসব মহড়া নিয়ে একই ধরনের বক্তব্য শোনা গেছে। এগুলো উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় উত্তেজনার পারদ বাড়িয়ে দিয়েছে সব সময়।

ম্যাটিস জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে স্বল্প পরিসরের মহড়া অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘ওই সব মহড়ার বিষয়টি আপনারা জানতে পারেন না। কারণ দক্ষিণ কোরিয়া আলোচনায় বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখার জন্য কখনোই এগুলো ভুলভাবে উপস্থাপন করে না। তার পরও কূটনীতিকেই মার্কিন নীতির মূল ফোকাস করতে চান ম্যাটিস।

ম্যাটিসের মন্তব্য এমন একসময় সামনে এলো, যখন সিএনএন, ওয়াশিংটন পোস্টসহ যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম জানায়, উত্তর কোরিয়ার গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক জেনারেল এবং কিম জং উনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কি ইয়ং চোলের একটি যুদ্ধংদেহী মনোভাবসম্পন্ন বার্তা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওকে পাঠিয়েছেন। চোল পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ আলোচনার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তির বরাত দিয়ে সিএনএন জানায়, নিরস্ত্রীকরণসংক্রান্ত আলোচনা ভেঙে পড়তে পারে। সমঝোতায় পৌঁছতে না পারলে উত্তর কোরিয়া আবারও পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পগুলো চালু করবে।

ট্রাম্প গত সপ্তাহে অনেকটা আকস্মিকভাবেই পম্পেওর সর্বশেষ পিয়ংইয়ং সফর বাতিল করে দেন। পম্পেও রওনা হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে এ সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প। পম্পেওর সঙ্গে উত্তর কোরিয়া বিষয়ক নবনিযুক্ত বিশেষ দূত স্টিফেন বেইগ্যানও ছিলেন। ওই সময় এর কারণ হিসেবে ট্রাম্প জানান, নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে পর্যাপ্ত অগ্রগতি হয়নি।

বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উত্তর কোরিয়ার পরমাণু এবং ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ ক্ষেত্রগুলো সক্রিয় রয়েছে। সিঙ্গাপুরে উন যে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাক্ষেত্রটি নিরস্ত্র করার প্রতিশ্রুটি ট্রাম্পকে দিয়েছিলেন, সেটির কাজও থেমে আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হচ্ছে পুরস্কার—অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা বা কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন হবে নিরস্ত্রীকরণের পরের পদক্ষেপ। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া তাদের ছাড় দেওয়ার তাৎক্ষণিক ফল পেতে আগ্রহী। ১৯৫০-৫৩ সালে কোরিয়া যুদ্ধ শেষ হয় একটি অস্ত্রবিরতির মধ্য দিয়ে। এর পরিবর্তে একটি শান্তিচুক্তিরও দাবি তুলেছে পিয়ংইয়ংয়ের রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম। ওয়াশিংটন এক্ষুনি এ ব্যাপারে আগ্রহী নয়। বোঝাই যায়, তারা বিষয়টিকে হাতের পাঁচ হিসেবে রাখতে চায়।

তবে তার পরও খোদ ট্রাম্পের কোনো সমালোচনা করেনি উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। ট্রাম্পও উত্তর কোরিয়ার নেতার ব্যাপারে সম্মান রেখে কথা বলেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইন সেপ্টেম্বরে কিমের সঙ্গে সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য পিয়ংইয়ংয়ে যাবেন। তিনি উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে চাইছেন।

কুকমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তর কোরিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই ল্যাংকভ বলেন, “মুনের জন্য এ পরিস্থিতি চরম অস্বস্তিকর। মুন ও দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য স্বল্পকালীন বিচারে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, উত্তর কোরিয়া নয়। যদি আগামীকাল সিউলে বোমা হামলা শুরু হয়, তাহলে বিষয়টির অর্থ এমন হবে না যে উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়াকে দখল করতে চাইছে। তার কারণ হবে, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ‘ব্লাডি নোস’ অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।” তার পরও সিউলভিত্তিক এই রুশ বিশেষজ্ঞ আশা করেন, আগামী কয়েক মাস কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি বিরাজ করবে। কারণ আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে ট্রাম্প ব্যস্ত থাকবেন। তবে তাতে ঝুঁকি আছে বলে তিনিও স্বীকার করেন। ‘প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রাম্প কি আবার মারমুখী হয়ে উঠবেন, নাকি বর্তমানে চলমান নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া যত দিন সম্ভব অব্যাহত রাখবেন। তাঁর ব্যর্থতা অবধারিত হলে তিনি প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আমরা চরম ঝুঁকিতে পড়ব।’

সূত্র : এশিয়া টাইমস

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ



মন্তব্য