kalerkantho


স্মরণ

এখনো অমলিন শামসুর রাহমান

তুহিন ওয়াদুদ

১৭ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



এখনো অমলিন শামসুর রাহমান

শামসুর রাহমান তিনটি শাসনকালে বেড়ে উঠেছেন। ব্রিটিশ-পাকিস্তান-বাংলাদেশ। ব্রিটিশ শাসনের কালে তাঁর বেড়ে ওঠা। শৈশব-কৈশোর কেটেছে ব্রিটিশ পর্বেই। ১৯২৯ সালে জন্মেছেন। প্রায় ১৮ বছর দেখেছেন ব্রিটিশ শোষণ। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ হওয়ার পর পাকিস্তানের অংশ হয় বর্তমান বাংলাদেশ। সবার মতো শামসুর রাহমানও ভেবেছিলেন মুক্তি এসেছে। আবার সবার মতোই আশাহত হন পাকিস্তান সরকারের পৈশাচিকতায়। সমাজ ও রাজনীতি সচেতন কবি শামসুর রাহমান তাই তাঁর লেখায় শোষণ-পীড়নকে তুলে এনেছেন। পাকিস্তানি শোষণের কাল শেষ হয় ১৯৭১ সালে। জন্ম নেয় বাংলাদেশ। আর এভাবেই তিন দেশের, তিন শাসনের অধীনে কেটে যায় তাঁর জীবন। ব্রিটিশ উপনিবেশ, নব্য পাকিস্তানি উপনিবেশ শেষে নিজেদের একটি দেশ পাওয়া। সেই দেশেরও অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখে গেছেন।

শামসুর রাহমান বাংলা সাহিত্যের কবিতাঙ্গনে দীর্ঘকাল প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ২০০৭ সালে প্রয়াত হওয়ার পরও বাংলা কবিতাঙ্গনে তাঁর প্রভাব কমেনি। বরং যতই তাঁর কবিতা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, পর্যালোচনা হচ্ছে ততই তাঁর কবিত্ব শক্তির গভীরতা যাচাই করা যাচ্ছে।

শামসুর রাহমান আমৃত্যু কাব্য সাধনায় নিবেদিত ছিলেন। নাগরিক কবি অভিধায় তাঁকে সিক্ত করা হলেও তিনি মূলত জীবনবাদী লেখক। চিন্তার অপার স্বাধীনতাকেই তিনি বরণ করেছিলেন তাঁর লেখনীতে। মুক্তবুদ্ধির চর্চা করায় প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী তাঁকে ভীত-সন্ত্রস্ত করার চূড়ান্ত চেষ্টা করলেও তিনি নিজ মতে ছিলেন অনড়। অকুতোভয় এ কবি অন্যদেরও অনুপ্রেরণার আধারে পরিণত হয়েছিলেন।

শামসুর রাহমান লিখেছেন অনেক বিষয় নিয়ে। নগরজীবন তাঁর লেখায় প্রাধান্য লাভ করেছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছেন। তাঁর লেখায় ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, সমকালীন রাজনীতি সবটাই স্থান পেয়েছে। সর্বসাধারণ শামসুর রাহমানকে চেনে কয়েকটি কবিতার আলোকে। ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’ বাঙালির মুখে মুখে উচ্চারিত একটি  কবিতা। তাঁর আরেকটি অমর কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’। নিশ্চয়ই জানা আছে শামসুর রাহমান একসঙ্গে বসেই এ দুটি কবিতা লিখেছেন। একই সঙ্গে একই বিষয় নিয়ে লেখা দুটি কবিতা পাঠকপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছানো শুধু বাংলা সাহিত্যেই নয়, বিশ্বসাহিত্যেও বিরল।

শামসুর রাহমান বেড়ে উঠেছেন শহরে। ফলে তাঁর লেখায় নগরজীবনের প্রাধান্য বেশি। তিনি পেশায় ছিলেন সাংবাদিক। ফলে সারা দেশের সমকালীন জীবন সম্পর্কে ছিলেন জ্ঞাত। সে কারণে সমকালীন সমাজও তাঁর লেখায় প্রাণিত হয়ে উঠেছে।

শামসুর রাহমানের সবচেয়ে বড় অর্জন তাঁর কবিতাগুলো। এর বাইরেও তিনি বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে বিজ্ঞানমনস্ক ভাবনাকে সম্প্রসারিত করতে তিনি যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছেন।

যখন শামসুর রাহমান কাব্যসাহিত্যে প্রবেশ করেন তখন বাংলাদেশ পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ। মসনদে ছিল শোষণ-নিপীড়ক সরকার। যখন রাজনীতিবিদরা পর্যন্ত কোণঠাসা তখনো শামসুর রাহমান তাঁর লেখনী বজায় রেখেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জেল থেকে মুক্ত করতে যে গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় সেই গণ-অভ্যুত্থানে আসাদ মৃত্যুবরণ করেন। তখন শামসুর রাহমান লিখেছেন ‘আসাদের শার্ট’ শীর্ষক কবিতা।

ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে ঘটনার যে পারম্পর্য সেই ঘটনার ধারাবাহিকতা মিলিয়ে শামসুর রাহমানের কবিতা পাওয়া যাবে। ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর লেখা আছে। শোষক পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তিনি কলম সচল রেখেছিলেন। গণ-অভ্যুত্থান আছে তাঁর লেখায়। মুক্তিযুদ্ধ বিস্তৃতভাবে উঠে এসেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর কবিতার উপজীব্য হয়েছে। স্বৈরাচারবিরোধিতায় তাঁর কলম থেমে থাকেনি। একদিকে ইতিহাসের বিনির্মাণ আর তার সঙ্গে সঙ্গে চলেছে শিল্পের বিনির্মাণ। ইতিহাস আর কবিতা চলেছে সমান্তরাল। তাই বলে জ্বলন্ত রাজনীতিই শুধু তাঁর লেখার বিষয় হয়ে ওঠেনি। রাজনীতির কশাঘাতে ক্ষুধার্ত মানুষও তাঁর লেখায় উঠে এসেছে।

শামসুর রাহমানের কবিতায় সুখ-দুঃখের অনুভূতিজাত বয়ান থাকলেও দুঃখবোধই অধিক।

একে একে লিখে গেছেন অনেক কাব্যগ্রন্থ। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে—‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’, ‘দুঃসময়ের মুখোমুখি’, ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’, ‘রৌদ্র করোটিতে’, ‘নিজ বাসভূমে’, ‘বন্দি শিবির থেকে’, ‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে’, ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’, ‘কবিতার সঙ্গে গেরস্তালি’, ‘মাতাল ঋত্বিক’, ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’, ‘নিরালোকে দিব্যরথ’, ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’ প্রভৃতি।

শামসুর রাহমান বেঁচে থাকবেন বিভিন্ন শ্রেণির পাঠকের কাছে বিভিন্নভাবে। যাঁরা সামান্য পড়েন তাঁদের কাছে জনপ্রিয় গণমুখী কবিতায় বেঁচে থাকবেন তিনি।

তিনি প্রচুর স্বীকৃতি সম্মাননা পেয়েছেন। আদমজী পুরস্কার (১৯৬৩), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৯), একুশে পদক (১৯৭৭)সহ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হন এ কালজয়ী কবি। ১৭ আগস্ট এ মহান কবির প্রয়াণ দিবস। কালজয়ী শামসুর রাহমানের প্রয়াণ স্মরণে বিনম্র প্রণতি।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক

বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর



মন্তব্য