kalerkantho


তিনিই বাংলাদেশ

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

১৫ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



তিনিই বাংলাদেশ

১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির কালো অধ্যায়ের সূচনা হয় ১৯৭৫ সালের এই দিনে। বাঙালি পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে এমন সব মানুষের জন্য ১৫ই আগস্ট অত্যন্ত মর্মান্তিক, বেদনাদায়ক ও গ্লানিকর দিবস। গত ৪৩ বছরে যে বিষয়টি বাংলাদেশে প্রমাণিত হয়েছে তা হলো, একটি জাতিরাষ্ট্র গঠনে একজন মহান নেতার ভূমিকা একক এবং অনন্য হয়ে ওঠে, যেটি ব্যতিরেকে কোনো জাতিরাষ্ট্র গঠন সম্ভব হয় না। ইতিহাস ঘাঁটলেই এর প্রমাণ মিলবে। কিন্তু ওই মহান নেতার মৃত্যুতে বা তাঁকে হত্যা করে ওই জাতিরাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটানো যায় না।

এক.

গত শতকের ষাটের দশকের শুরুতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বাধীন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং উপলব্ধি করেছিলেন তার জন্য প্রয়োজন হবে ভারতের সমর্থন ও সহযোগিতা। তখন থেকেই তিনি ভারতের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন। ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময়ে আগরতলায় পুলিশের আইজি ছিলেন ফণীন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, যিনি সবার কাছে নাথবাবু নামে পরিচিত ছিলেন। নাথবাবু উদ্যোগ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকে আগরতলায় এনে ত্রিপুরার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রনাথ সিংহের সঙ্গে বৈঠক করাবেন। তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লি গিয়েছিলেন এবং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের তৎকালীন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সব জানিয়েছিলেন। তখনই স্থির হয় মুজিবের সঙ্গে ভারতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি বৈঠক করাবেন। তিনি বৈঠকের স্থানও নির্ধারণ করেন। সেই সময়ে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী। লন্ডনে কমনওয়েলথ সম্মেলনে যান তৎকালীন তথ্য ও প্রচারমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। নাথবাবুই প্রথমে লন্ডনে গিয়ে দুই নেতার বৈঠক ঠিক করেন। স্থান ছিল লন্ডনের সাউদাম্পটন রোডে ড. তারাপদ বসুর বাড়িতে। তারাপদ বসু ইন্দিরা গান্ধীর স্বামী ফিরোজ গান্ধী ও ইন্দিরা দুজনেরই খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ওই বাড়িতেই বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে প্রথম সাক্ষাৎ হয়। সেই বৈঠকেই স্থির হয় পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান বেরিয়ে আসবে। ভারতের প্রখ্যাত প্রবীণ সাংবাদিক সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত লিখেছেন, ‘এ খবর ড. তারাপদ ও নাথবাবু দুজনেই আমায় বলেছেন। ১৯৬৬ সালে তাসখন্দে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী মারা যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী হন ইন্দিরা গান্ধী। ফলে কাজটা আরো সহজ হয়ে যায়। ইন্দিরা গান্ধী ও শেখ মুজিব, দুই নেতার দূত হিসেবে কাজ করতেন ফণীন্দ্রনাথ ব্যানার্জি ওরফে নাথবাবু। এই তথ্যগুলো ২০১৪ সালে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত।

দুই.

১৯৫৪-৫৫ সালের কথা। পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান চূড়ান্তকল্পে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা চলছে। পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যাজনিত যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে তার সুবিধা ও প্রভাব পাকিস্তানের রাজনীতিতে যেন না থাকে তার জন্য পাঞ্জাবি আমলা ও রাজনৈতিকচক্র অত্যন্ত সুকৌশলে ষড়যন্ত্রের চাল চালে। সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তান মিলে একটি প্রদেশ এবং পূর্ব পাকিস্তানকে আরেকটি প্রদেশ করার পরিকল্পনা নেয়। উভয় প্রদেশের জন্য জাতীয় সংসদে আসনসংখ্যা থাকবে সমান সমান, অর্থাৎ সংখ্যাসাম্য নীতি সংবিধানে সংযোজনের উদ্যোগ নেয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন পাকিস্তানের আইনমন্ত্রী এবং নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি। সোহরাওয়ার্দী সংখ্যাসাম্যের নীতি মেনে নিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান (তখনো বঙ্গবন্ধু হননি) এই সংখ্যাসাম্য নীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালাতে থাকেন। শেখ মুজিবের ভরসা ছিল মওলানা ভাসানী, যিনি তখনো পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি। কিন্তু দেখা গেল কী কারণে যেন ভাসানীও অতিসহজে সংখ্যাসাম্য নীতি মেনে নিলেন। ১৯৬৯ সালে জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুকে নমনীয় করার জন্য এবং বাঙালিদের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর ছদ্মবেশ হিসেবে সংখ্যাসাম্য নীতি বাতিল করে দেন। কিন্তু এই যতটুকু ছাড় ইয়াহিয়া দিলেন তার লাগাম নিজের হাতে রাখার জন্য ঘোষণা করলেন লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার বা এলএফও (সূত্র : অ্যান্থনি মাসকারেনহাস, ‘দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ)। তখন ভাসানীসহ পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য দলের অনেক নেতাই বলেছিলেন, লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারের অধীনে নির্বাচনে গিয়ে কোনো লাভ হবে না, জয়লাভ করলেও ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না। পাকিস্তানি সামরিক অফিসার সিদ্দিক সালিক তাঁর লিখিত ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থের প্রথম অনুচ্ছেদে উল্লেখ করেছেন, ‘শেখ মুজিব তাঁর জ্যেষ্ঠ নেতাদের নির্বাচনের আগেই বলেছিলেন, নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি এলএফও টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলবেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। ইয়াহিয়া খান সংখ্যাসাম্য নীতি বাতিল করার ফলে জাতীয় সংসদে সমগ্র পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ৩০০ আসনের মধ্যে জনসংখ্যার হিসাবে পূর্ব পাকিস্তান পায় ১৬২ আসন, আর সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তান পায় ১৪৮ আসন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২ আসনের মধ্যে আওয়ামী ১৬০ আসনে জয়ী হয়। সমগ্র পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিজয়ী দল হয়ে এককভাবে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের অধিকার পায়। সংখ্যাসাম্য নীতি বহাল থাকলে নির্বাচনে সমগ্র পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে আওয়ামী লীগ জয়ী হতে পারত না। তখন এককভাবে সরকার গঠনের দাবিও করতে পারত না।

তিন.

ছয় দফা গ্রহণ ও ঘোষণার বেলায়ও দেখা যায় বঙ্গবন্ধুকে একলা চলতে হয়েছে। তখনকার আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাসহ পূর্ব পাকিস্তানের সব রাজনৈতিক নেতা ছয় দফার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাঁদের মতে, এটা বিচ্ছিন্নতাবাদিতা ও দেশদ্রোহের শামিল। আইয়ুব খান সবাইকে ফাঁসিতে  ঝুলাবে। সে সময় বঙ্গবন্ধু একাই এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ছয় দফাকে অবলম্বন করে তাজউদ্দীন এবং অন্য অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাদের নিয়ে আওয়ামী লীগকে নতুনভাবে পুনর্গঠিত করা হয়। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু ছয় দফার ওপর সম্পূর্ণ অনড় থাকার কারণেই ইয়াহিয়া ব্যর্থ হয়ে পাকিস্তানে ফিরে যান। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। তাই এটা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য যে ছয় দফাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য এক নম্বর অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। নেতৃত্বের বিচারে এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধুর একার।

চার.

ষাটের দশকে ছয় দফা উত্থাপনের পর আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুর সামনে বন্দুক তাক করার ভান করলেও পেছনে হাজারো লোভনীয় প্রস্তাব নিয়ে দেন-দরবার করার চেষ্টা করেছেন। আইয়ুব খান প্রস্তাব দিয়েছিলেন মোনেম খাঁর পরিবর্তে শেখ মুজিবকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর করা হবে। একই সঙ্গে আইয়ুবের ছেলে গওহর আইয়ুবের মালিকানাধীন গান্ধারা (বর্তমানে বাংলাদেশের প্রগতি) ইন্ডাস্ট্রিজের ৪৯ শতাংশ শেয়ার বঙ্গবন্ধুকে দেওয়া হবে। এই শেয়ার কেনার টাকার ব্যবস্থাও আইয়ুব খান করবেন। এই প্রস্তাব বঙ্গবন্ধু একাই শুধু ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন তা-ই নয়, বেগম মুজিব প্রস্তাবকারীকে বলেছিলেন, শেখ মুজিবকে মোনেম খাঁ বানানোর চেষ্টা করবেন না (আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী—ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা, পৃ. ১৩০)।

পাঁচ.

ইয়াহিয়া খানের এলএফও এবং ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর দক্ষিণ বাংলায় ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের অজুহাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নেতারা নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং নির্বাচন স্থগিত করার দাবি তোলেন। মওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খান, ইউছুফ আলী চৌধুরী, কৃষক শ্রমিক পার্টির সভাপতি এস এম সোলায়মান নির্বাচনে ভোট দেননি (ইত্তেফাক, ১০ ডিসেম্বর, ১৯৭০)। কিন্তু নির্বাচন স্থগিত করার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দৃঢ় প্রতিবাদ এবং বঙ্গবন্ধুর আপসহীন অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত সঠিক সময়ে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তখন নির্বাচন না হলে বাংলাদেশ কি একাত্তরে স্বাধীন হতো?

ছয়.

আজকের বাংলাদেশের বিরাজমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধুকে শুধু পোস্টার, সাইনবোর্ড ও বক্তৃতার কথামালার মধ্যে সীমিত ও সাজিয়ে রাখলে তাঁর পরিপূর্ণ মূল্যায়ন হবে না। বঙ্গবন্ধু একটি দর্শন ও আদর্শের নাম, সেটির সুবিধা সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। একই সঙ্গে ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার, মিথ্যাচার ও ইতিহাস বিকৃৎতি থেকে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে হবে। বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-দর্শন আমরা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে পারিনি বলেই আজ রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রনীতিতে ভয়াবহ অবক্ষয় ঘটেছে। এটা আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা। কথায় আছে, দেরি হলেও এখন দ্রুত শুরু করতে পারলে ভালো। তবে আপাতত দ্রুত আরেকটি কাজ শুরু করা যায়। বিশেষ বিশেষ টিম গঠন করা যায়, যে টিমের সদস্যরা হবেন বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দর্শনের উপলব্ধিতে ভরপুর, মানবসভ্যতা ও ইতিহাস সম্পর্কে সমৃদ্ধ এবং নতুন প্রজন্মের সব কৌতূহল ও প্রশ্নের জবাব দিতে সক্ষম। টিম সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুলের ছাত্রদের বোঝাতে সক্ষম হবে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে চলমান বিশ্ব বাস্তবতায় তারা নতুন প্রজন্ম কিভাবে বৈষয়িকভাবে এবং আত্মিকভাবে লাভবান হবে। নতুন প্রজন্ম বুঝবে পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা থাকলে সারা বিশ্ব হবে তাদের কর্মস্থল, অবারিত হবে তাদের চলার পথ।

লেখক : কলমিস্ট, নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক



মন্তব্য