kalerkantho


ফিলিস্তিনিদের জন্য কুশনারের ‘মহান চুক্তি’

রবার্ট ফিস্ক

১৩ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



ফিলিস্তিনিদের জন্য কুশনারের ‘মহান চুক্তি’

ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর বোধোদয় অর্থহীন, তবে অনেক ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া ঘটনা সত্যটা জানিয়ে দিয়ে যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করেছেন। বঞ্চিত হয়েছে ফিলিস্তিনিরা। শহরের পূর্বাঞ্চলে তাদের রাজধানী প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ছিল; ট্রাম্পের ঘোষণায় তারা ক্ষুব্ধ। মাহমুদ আব্বাস আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চান না। প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বলেছেন, ‘প্রতিবছর আমরা ফিলিস্তিনিদের শতকোটি ডলার দিই। কিন্তু তাদের কাছ থেকে কোনো প্রশংসা বা শ্রদ্ধা পাই না।’ এটাই তাঁর মনের কথা। অকৃতজ্ঞ ও হতভাগ্য ফিলিস্তিনিদের এর জন্য মূল্য শোধ করতে হচ্ছে। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ত্রাণ তহবিল থেকে ৩০ কোটি ডলার কেটে রেখে ফিলিস্তিনিদের জন্য বরাদ্দ দিয়েছেন মাত্র ছয় কোটি ডলার।

৫৩ লাখ ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুর জন্য ত্রাণ সংগ্রহের কাজ করে জাতিসংঘের রিলিফ অ্যান্ড ওয়ার্কস এজেন্সি। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সমন্বয় করতে কর্মী ছাঁটাই শুরু করেছে তারা। সম্প্রতি শুধু গাজা থেকেই তারা ১১৩ কর্মীকে বাদ দিয়েছে। তারা ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের নিয়ে কাজ করছে ১৯৪৯ সাল থেকে। বর্তমানে তাদের ঘাটতির পরিমাণ চার কোটি ৯০ লাখ ডলার। ফলে ৩০ হাজার ফিলিস্তিনি চিকিৎসক, নার্স, শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মী বেকার হয়ে পড়েছে। এর চেয়েও বড় হুমকি—গাজার দরিদ্র লোকগুলো অভুক্ত থাকবে।

ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের জন্য একটি শান্তিচুক্তি প্রস্তুত করেছেন তিনি। বলা হয়েছে, এতে দুই পক্ষই সমান সুযোগ পাবে। আমি আগেও বলেছি, এটি হলো শান্তির জন্য ভূমি নয়; বরং শান্তির জন্য নগদ অর্থ। জেরুজালেমে ফিলিস্তিনের রাজধানী প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ডলার। এই বিনিময়ে শেষ হবে ইসরায়েলের উপনিবেশ ও ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমিতে ফেরার অধিকার। এটিই সত্যিকার অর্থে ট্রাম্পীয় সমাধান।

পর্দার আড়ালে যা ঘটে চলেছে, তা এই ‘চুক্তিকে’ আরো কঠিন করে দিয়েছে। ট্রাম্প প্রথমত জেরুজালেমকে ইসরায়েলের হাতে সমর্পণ করেছেন। এ নিয়ে ফিলিস্তিনিরা অভিযোগ করতে শুরু করলে তিনি তাদের ত্রাণ সহায়তায় কাটছাঁট করেন। তরুণ জ্যারেডের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেই হয়! তাঁর কারণেই ট্রাম্প ফিলিস্তিনিদের অর্থ দিতে রাজি হয়েছেন। যদিও তা শর্তসাপেক্ষ—ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ, অসহযোগ, ইহুদিবিরোধিতা, রাষ্ট্রের দাবি, মর্যাদা ও ঔপনিবেশিকতা সমাপ্তির দাবি ছাড়তে হবে।

চুক্তি মানলে ফিলিস্তিনিদের হৃদয় হয়তো খালি হয়ে যাবে, তবে পেট ভরা থাকবে। তাদের আশার হয়তো মৃত্যু ঘটবে, তবে তাদের ব্যাংক হিসাব ফাঁকা থাকবে না। নতুন সুযোগ...ভালো বেতনের চাকরি এবং উন্নত জীবনের সম্ভাবনা রয়েছে তাদের। এই উন্নতিও আমাদের বুঝতে হবে!

এখন চারপাশে এত লোভনীয় জিনিস ছড়িয়ে আছে যে এখানে আর জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ ওই অঞ্চলে আর কোনো দারিদ্র্যক্লিষ্ট শরণার্থী থাকবে না। শরণার্থীরা ধনী হয়ে না গেলেও তাদের অবস্থা ভালো হবে। তারা সবাই ভালো চাকরি করবে, তাদের জীবনযাপনও উন্নত হবে। কাজেই ইসরায়েলের ভূমি চুরি নিয়ে কথা বলার কী দায় থাকতে পারে তাদের!

এই সমীকরণ লুকানো অসম্ভব। ফিলিস্তিনিরা রাজনৈতিক আদর্শ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শান্তি আলোচনায় বসতেও নারাজ তারা। কাজেই তাদের দরিদ্র থাকা অনেকটাই ইচ্ছাকৃত? ট্রাম্প বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তি আলোচনার আর ইচ্ছা নেই। তাদের ভবিষ্যতে আমরা কেন এত অর্থ ঢালব?’

গাজার জনসংখ্যা ২০ লাখ; অর্ধেকই জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থার ওপর নির্ভরশীল। এই জনসংখ্যার অন্তত ৪৪ শতাংশ বেকার। ত্রাণ সংস্থার এক কর্মী বলছিলেন, ফিলিস্তিনের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে।

সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখাচ্ছে সৌদি আরব, আমিরাত এবং মিসরীয়রাও। বিদ্যুৎ স্টেশনগুলোর জন্য অর্থ দেবে আবুধাবি, রাফায় শুল্কমুক্ত দোকান খুলবে মিসর আর সৌদি আরব ফিলিস্তিনে কম্পানি খুলবে। হয়তো এগুলোর সবই স্বপ্ন।

স্বপ্ন অতীতেও দেখানো হয়েছে—পশ্চিম তীরকে দুবাই ও গাজাকে সিঙ্গাপুর বানানোর স্বপ্ন। শিমন প্যারেজ একসময় এই স্বপ্নে হাওয়াও দিয়েছেন। জন কেরিরও অনুমোদন ছিল। পাঁচ বছর আগে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে কেরি এক প্রস্তাবে ৪০০ কোটি ডলারের পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। তখনো ফিলিস্তিনের ক্ষমতায় আব্বাসই ছিলেন। তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা শুরু করবেন বলে জানিয়েছিলেন। কেরি ফিলিস্তিনের জন্য সবল ও টেকসই বেসরকারি অর্থনৈতিক খাতের পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। অসলো চুক্তি সইয়ের পর এটিই ছিল সবচেয়ে বড় ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রস্তাব। কেরি আব্বাসের সম্মতির বিনিময়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথাও বলেছিলেন।

ট্রাম্পের ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’তে এমন দুর্দান্ত কিছু নেই। বরং পশ্চিম তীরের পাহাড়ের চূড়াগুলোতে আরো ইহুদি বসতি স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

সূত্র : দি ইনডিপেনডেন্ট

লেখক : সাংবাদিক, মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ



মন্তব্য