kalerkantho


যারা ‘জাতিরাষ্ট্রআইন’ করেছে তারা অপরাধী

ওদেহ্ বিশারাত

৯ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



যারা ‘জাতিরাষ্ট্রআইন’ করেছে তারা অপরাধী

কোনো হাজাম (খতনাকারী) যদি তার দপ্তরের দরজায় বা কর্মস্থলে তার পেশার প্রসারের স্বার্থে পুরুষ লিঙ্গের ছবিসহ বিজ্ঞাপনমূলক বোর্ড ঝুলিয়ে দিত, তাহলে যৌক্তিকভাবেই আমরা ধরে নিতাম, ওই দিনই তার দপ্তর বা কর্মস্থল বন্ধ করে দেওয়া হতো। ওই এলাকার লোকদের খুবই সহনশীল ভাবা হতো, যদি তারা ওই হাজামকে এলাকাছাড়া না করত। এমন অনেক পেশা বা কাজ বা চিন্তা থাকে, যা ঘটা করে ঘোষণা করার বিষয় নয়; অবশ্য বিধিবদ্ধ উপায়ে কোথাও সে কথা জানানোর আবশ্যকতা থাকলে জানাতে হবে বৈকি।

কোনো চোরের কাছ থেকে কখনো কোনো বিজনেস কার্ড (পেশা-পরিচিতি কার্ড) কেউ পেয়েছেন কি, যাতে লেখা রয়েছে : ‘জন ডো অ্যান্ড সন্স—আমরা সব ধরনের গাড়ি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি করে থাকি।’ আপনি কি ভাবতে পারেন, কোনো বর্ণবাদী আপনার কাছে এসে গর্বের সঙ্গে তার পরিচয় দেবে—‘আমি বর্ণবাদী জন ডো।’ বাস্তবে উল্টোটাই করবে সে, নিজেকে গর্বিত দেশপ্রেমিক দাবি করে বলবে, ‘জাতিকে শুচিশুদ্ধ রাখার মহান ব্রত পালন করছি।’

ইসরায়েলের দক্ষিণপন্থীরা সব ধরনের যুক্তি-বুদ্ধির বিপরীতে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে এই অলঙ্ঘ্য রীতি-নীতি তারা ভাঙবেই। বিদ্যমান ব্যবস্থার সমস্যা কী? ৭০ বছর ধরে সরকার আরবদের সঙ্গে যাচ্ছেতাই করছে। একই সঙ্গে যে-ই ইসরায়েলে প্রবেশ করছে তাকে বলা হচ্ছে, এ দেশ মানবতাপ্রিয়, জাতিগুলোর প্রকৃত বাতিঘর; এ অন্ধবিশ্বাসে তাকেও বিশ্বাসী করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই মোহিনী মন্ত্র আওড়ানোর আর সুযোগ নেই। ‘জাতিরাষ্ট্র আইন’ পাস করার পর ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ণবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে; এখন এটাই তার পরিচয়। টুইটারে প্রবীণ কূটনীতিক আলন লিয়েল মন্তব্য করেছেন, শুধু বর্ণবাদের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়েছিল বর্ণবাদকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার কারণে।

কখন কী করতে হবে তার জন্য হাজামের উদাহরণ টানার দরকার নেই। ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠারা যা করেছেন সেটা বোঝাই যথেষ্ট। ইসরায়েলের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে আমি বিস্ময়াভিভূত হয়েছিলাম। এটা কী করে সম্ভব হয়েছিল! ১৯৪৮ সালের রক্তঝরা সময়ে ‘য়িষুব’ (রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগের ইহুদি বসতি তথা সিরিয়া উসমানী শাসনাধীনে যাওয়ার পর থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত ইহুদি বসতি—বি.স.) নেতারা সম্মিলনী চেতনা ধারণ করেছিলেন; তাঁরা মানবিকতাবোধসম্পন্ন একটি দলিল রচনা করেছিলেন। ইসরায়েলের আরব অধিবাসীদের প্রতি তাঁরা অঙ্গীকার করেছিলেন যে তারাও সমমর্যাদায় নাগরিকত্ব পাবে এবং রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব পাবে (অবশ্য স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে সে অঙ্গীকার উবে গিয়েছিল)।

একসময় আনাড়ির মতোই ভেবেছিলাম, দাভিদ বেন গুরিয়ন (ইসরায়েলের প্রধান প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী—বি.স.) মুহূর্তে মরমি চেতনাসম্পন্ন হয়ে উঠেছিলেন; হঠাৎ তাঁর জিনে মানবতা জায়গা করে নিয়েছিল। পরে আইনজ্ঞ এহুদ এলিয়াভের একটি লেখা পেলাম। ওই লেখায় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের নাগরিক অধিকারবিষয়ক অনুচ্ছেদ ও জাতিসংঘের ১৯৪৭ সালের বিভক্তি পরিকল্পনার পার্ট-সির (ঘোষণা) ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বলেছেন তিনি। বেন গুরিয়ন বুঝেছিলেন, বিশ্ব কী চায় এবং তাঁর কাছে কী প্রত্যাশা করে। সেভাবেই কাজ করেছিলেন তিনি। অতঃপর বিশ্ব নিজগুণে বিষয়টি ভুলে গেল এবং পরবর্তী সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের বিষয়ে আলোচনা শুরু করল।

জাতিসংঘের বিভক্তি পরিকল্পনায় আরো বলা হয়েছে, (ইসরায়েলের) স্বাধীনতার ঘোষণায় অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো রাষ্ট্রের মৌলিক আইন। অন্য কোনো আইন বা বিধি বা প্রশাসনিক নির্দেশ এসবের ঊর্ধ্বে স্থান পাবে না। জাতিসংঘ ঘোষণার ১ ও ২ অনুচ্ছেদের বিভিন্ন ধারার নিশ্চায়ক। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অনুমোদন ছাড়া এসব ধারায় পরিবর্তন আনা যাবে না। কোনো অনুচ্ছেদ বা ধারার প্রয়োগ বা ব্যাখ্যাসংক্রান্ত বিরোধ দেখা দিলে (কোনো এক পক্ষ থেকে) বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে উপস্থাপন করতে হবে।

‘জাতিরাষ্ট্র আইন’ ইসরায়েলের ভিত্তি আইনকে স্থানচ্যুত করছে, অথচ ভিত্তি আইন নিয়ে নাড়াচাড়া না করার কথা বলেছে জাতিসংঘ। আমার মতে, যারা ‘জাতিরাষ্ট্র আইন’ পাস করেছে তারা অপরাধী। সাধারণ অপরাধী নয়, আন্তর্জাতিক অপরাধী। তাদের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে সোপর্দ করা অত্যাবশ্যক। যে রাষ্ট্র তার স্বাধীনতার ঘোষণার মৌলিক বিষয় থেকে সরে দাঁড়ায়, সে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বৈধতা হারায়। জাতিসংঘের শরণাপন্ন হওয়া এবং ক্ষমতার অপচর্চাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানোর অধিকার ইসরায়েলের আরব ও গণতন্ত্রমনা ইহুদিদের রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মহলের কাছে ইসরায়েলকে ইহুদি জাতিরাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানোর কোনো নৈতিক ভিত্তি নেতানিয়াহুর নেই। ‘জাতিরাষ্ট্র আইন’ পাসের পর একটি ঘোষিত বর্ণবাদী রাষ্ট্রকে কে স্বীকৃতি দিতে যাবে!

 

লেখক : ইসরায়েলি দৈনিক হারেেসর প্রদায়ক

সূত্র : দ্য হারেৎস অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

 



মন্তব্য