kalerkantho


অনূর্ধ্ব-১৫ সাফ ফুটবলে জয়ই প্রত্যাশিত

ইকরামউজ্জমান

৯ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



অনূর্ধ্ব-১৫ সাফ ফুটবলে জয়ই প্রত্যাশিত

কয়েক বছর ধরে নারী ফুটবলাররা যেভাবে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে দেশকে তুলে ধরেছেন, গৌরবান্বিত করেছেন—এটা সামান্যতম কোনো বিষয় নয়। নারী ফুটবলাররা দেশের ক্রীড়াঙ্গনে একটা বড় শক্তি এবং পুরো সম্প্র্রদায়ের জন্য আলোকবর্তিকা। অথচ এই বিষয়টি নিয়ে সমাজ ও দেশের ক্রীড়াঙ্গন আগে কখনো ভাবেনি। নারীদের সামর্থ্য ও সম্ভাবনাকে ঘিরে একধরনের নেতিবাচক মনোভাব সব সময়ই লক্ষণীয় হয়েছে। পুরুষ ফুটবলে বেশ কয়েক বছর ধরে কৃষ্ণপক্ষ চলছে, সেখানে স্বপ্নবাজ আত্মপ্রত্যয়ী নারী ফুটবলাররা আন্তর্জাতিক চত্বরে বাংলাদেশের ফুটবলকে জাগিয়ে রেখেছেন। তাঁরা নতুন অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের বড় ভরসা নারী ফুটবল দল। মাঠে নারীদের ভূমিকা পুরুষদের তুলনায় অনেক অনেক বেশি উজ্জ্বল। জয়ের ক্ষুধা তাঁদের অনেক বেশি। তাঁরা জানেন, দেশের জন্য জয়ের মূল্য কত বেশি।

দেশে বিভিন্ন ‘ব্যাকগ্রাউন্ড’ থেকে উঠে এসে কিশোরী ও তরুণী ফুটবলাররা খেলার প্রতি অনুরক্ত হয়ে আত্মবিশ্বাস, সাহস, দৃঢ় মানসিকতা নিয়ে আমরা পারব, আমাদের পারতে হবে, দেশের জন্য কিছু করতে চাই—এই প্রত্যয় এবং ইচ্ছাশক্তিতে উজ্জীবিত হওয়াতেই স্বল্প সময়ের মধ্যে নারী ফুটবলাররা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। এটি দেশের মানুষের জন্য গর্ব এবং আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা। নারী ফুটবলাররা সবার চোখ খুলে দিয়েছেন। নেতিবাচক চিন্তাভাবনাকে পাল্টে ফেলে ইতিবাচক স্রোতে সবাইকে ধাবিত করেছেন। কয়েক বছর ধরে ফুটবলে গল্পের উপাদান তো শুধু নারী ফুটবলারদের মাঠ এবং মাঠের বাইরে  লড়াই। যে লড়াইয়ে তাঁরা হারতে চান না।

ফুটবলে নারীদের আগমনকে পরিবার, সমাজ সুনজরে দেখেনি! ক্রীড়া কর্তৃপক্ষও নারীদের অবহেলা করেছে ভীষণভাবে—এখন যত কথাই বলা হোক না কেন, অতীতকে তো মুছে ফেলা যাবে না। এর পরও নারীরা কিন্তু ফুটবল মাঠে এসেছেন, তাঁরা প্রতিকূল অবস্থাকে পরাজিত করে বাইরে এবং মাঠের লড়াইয়ে জিতেছেন।

নারী ফুটবল শক্তিশালী সামাজিক বিপ্লব। পরিবেশ ক্রমেই পাল্টে গেছে। পাল্টে গেছে পরিবার ও বৃহত্তর সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিন্তাভাবনা। নারী ফুটবলারদের ঘিরে এখন উচ্ছ্বাস, উৎসাহ, আলোচনার পেছনে কাজ করছে সবচেয়ে বেশি জয়ের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ। নারী ফুটবলাররা ভালো খেলছেন। ধারাবাহিকভাবে জয় উপহার দিচ্ছেন। খেলায় জয়টাই তো আসল বিষয়।

নারী ফুটবলে সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো এই ক্ষেত্রে নতুন নতুন খেলোয়াড় কোনো সমস্যা নয়। দেশে খেলোয়াড়ের অভাব নেই। শুধু নিখাদ সোনার টুকরাগুলো চিনে নিতে হবে। এরপর তাঁদের মেজে-ঘষে ছাঁচমাফিক তৈরি করতে হবে। যেটা এখন করা হচ্ছে। প্রতিবছর দেশজুড়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়েদের জন্য বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সর্বশেষ আসরে অংশ নিয়েছে ৬৪ হাজার ৬৮৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রায় ১১ লাখ মেয়ে। মেয়েদের এই ফুটবল প্রতিযোগিতা সামাজিক পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। অনূর্ধ্ব-১৪, ১৫, ১৬ ও ১৮ সব দলের প্রায় ৯৬ শতাংশ খেলোয়াড় যাঁরা বঙ্গমাতা ফুটবলের মাধ্যমে চিহ্নিত হয়ে বড় ‘প্ল্যাটফর্মে’ আসার সুযোগ পেয়েছেন।

আজ ৯ আগস্ট ভুটানে শুরু হতে যাচ্ছে দ্বিতীয় সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপ। আজই বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ দল খেলবে পাকিস্তানের বিপক্ষে। গত বছর ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপ। আমাদের দল দাপটের সঙ্গে খেলে ফাইনালে ভারতকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। বাংলাদেশ দল শুধু চ্যাম্পিয়ন হয়নি, অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। বাংলাদেশের গোলের জালে একটি বলও ঢোকেনি। সার্কভুক্ত ছয় দেশের এবারকার চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ দলের একমাত্র লক্ষ্য চ্যাম্পিয়ন হয়ে শিরোপা ধরে রাখা। দলের কোচ এবং খেলোয়াড় শিরোপা জয় ছাড়া অন্য কিছু ভাবছেন না। মারিয়া, আঁখি, মাহমুদা, রূপা তহুরা, শামসুন্নাহার, সোহাগী, সাজেদা—সবার এক কথা, ‘আমাদের সামর্থ্য আছে ভালো খেলার, আমরা মাসের পর মাস কঠোর পরিশ্রম করে অনুশীলন করেছি। প্রস্তুতি খুব ভালো হয়েছে। প্রথমবারের তুলনায় আমরা এবার অনেক বেশি উজ্জীবিত এবং অভিজ্ঞ। নিজেদের দুর্বলতাগুলোকে সংশোধিত করতে পেরেছি। প্রতিপক্ষ অবশ্যই শক্তিশালী, তবে তাদের হারানো খুবই সম্ভব। আমরা মাঠে একটি দল হয়ে প্রতিটি খেলায় লড়ে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করেই শিরোপা ধরে রাখব। একনাগাড়ে সমানতালে ৯০ মিনিটেরও বেশি খেলায় আমরা অভ্যস্ত। ক্লান্তি কখনো আমাদের পিছিয়ে রাখতে পারবে না। ভুটানে দেশের জাতীয় দলের পরাজয়ের পর ফুটবল বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। এই ভুটান থেকেই শিরোপা জয়ের জন্য আমরা মুখিয়ে আছি।’

গত চ্যাম্পিয়নশিপে যে ২৩ জনের দল ছিল সেখান থেকে ১৮ জন আছেন এবারকার দলে, নতুন যোগ হয়েছেন পাঁচজন ফুটবলার। অনূর্ধ্ব-১৫ দলের নারী ফুটবলার সেই গত বছর ডিসেম্বর মাসের পর ছুটি কাটিয়ে ফিরে আসার পর থেকে অনুশীলন ও ম্যাচ খেলার মধ্যেই ছিল দলটি। গত এপ্রিলে হংকংয়ে চার দেশের টুর্নামেন্টেও চ্যাম্পিয়ন হয়েছে এই দল। বিজয় খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। হংকংয়ের টুর্নামেন্টে লক্ষণীয় হয়েছে খেলোয়াড়দের মধ্যে গোল করার ‘অ্যাভিলিটি’ এবং তাড়না যথেষ্ট বেড়েছে। বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় গোল পেয়েছেন। এই ইতিবাচক বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে চলতি আসরে। তা ছাড়া খেলোয়াড়দের ‘স্ট্যামিনা’ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।

নারী ফুটবল দলের প্লাসপয়েন্ট হলো দলগত সংহতি। মাঠে একে অপরের পাশে দাঁড়ান। একে অপরকে সাহায্য করেন। যেহেতু লম্বা সময় ধরে একসঙ্গে সবাই অনুশীলন করেন এবং খেলেন এতে দলের মধ্যে বোঝাপড়া চমৎকার। নারী দলের যে বিষয়টি নজর কাড়ে সেটি হলো সবাই মিলে জান বাজি রেখে দেশের মুখ উজ্জ্বল করার জন্য প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত লড়াই করা।

 

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক



মন্তব্য