kalerkantho


মিয়ানমারের সেনাদের শাস্তি হতেই হবে

কেরি কেনেডি

৭ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



মিয়ানমারের সেনাদের শাস্তি হতেই হবে

সম্প্রতি মিয়ানমার ও বাংলাদেশে ১০ দিন কাটিয়ে এসেছি। সফরকালে রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার ব্যাপারে আশ্রয়প্রার্থী, মানবাধিকারকর্মী ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি।

মিয়ানমারের জনগণের প্রতি আমাদের সমর্থন রয়েছে। আমরা নিজেদের মিয়ানমারের বন্ধু মনে করি। আমরা চাই না, এ দেশ আবার সেই পুরনো নিঃসঙ্গতা আর নিষেধাজ্ঞার দিনগুলোতে ফিরে যাক। আমাদের বিশ্বাস, যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমার সম্পর্ক আরো দৃঢ় করার মধ্য দিয়ে পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে পারবে। কিন্তু মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর অপরাধের বিচার না হওয়া পর্যন্ত এ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের আশ্রয়শিবির এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুশিবিরে আমরা রোহিঙ্গা নারী-পুরুষদের কাছ থেকে যা শুনেছি এবং যেসব প্রমাণ দেখেছি, সেসবই গণহত্যার নির্দেশক। সরকারি সূত্র থেকে আমরা যা শুনেছি, তা কোনোভাবেই ওই সব প্রমাণকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে খণ্ডন করতে পারেনি।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয়শিবিরটি কক্সবাজারে। সেখানে দুই দিন ধরে আমরা সাক্ষ্য-প্রমাণ জোগাড় করেছি। সেখানে যেসব নারীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, তারা তাদের পরিবার, ফেলে আসা বাড়িঘর আর শিবিরের জীবনযাপন নিয়ে কথা বলেছে। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছি।

৩৬ বছর বয়সী এক নারী বলেছেন, ‘আমার বাড়ি নিরাপত্তা ফাঁড়ির কাছেই। ২৫ আগস্ট দুপুর ১২টায় ওরা গোলাগুলি শুরু করে। দিনরাত ওরা গুলি চালিয়েছে; থেমেছে ভোর ৫টায়। আমি ১২ জনকে গুলি খেয়ে মরতে দেখেছি। ওরা আমাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। জ্বলন্ত বাড়িঘর থেকে লোকজন যখন পালাতে শুরু করল তখন সুন্দরী নারীদের আটক করে ওরা। আমি জানতাম, ওদের ধর্ষণ করা হবে। ওরা আমাকে ধর্ষণ করেনি। কারণ আমি রাখাইন ভাষায় কথা বলতাম এবং দোভাষী হিসেবে কাজ করতাম। ধরে নিয়ে যাওয়া দুজন নারীকে আমি চিনতাম। পরে জানতে পারলাম, তারা মারা গেছে।’ কক্সবাজারের আরেক শিবিরের এক নারী জানিয়েছে, তাকে অনেক সেনা ধর্ষণ করেছে। তার এখনো রক্তপাত হয়। কাপড় সরিয়ে সে আমাদের তাজা রক্ত দেখাল। হত্যা, গণধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ—সব কথা সে আমাদের জানাল।

আমি ও আমার মেয়ে কারা যখন নারীদের সঙ্গে কথা বলছিলাম তখন আমাদের সহকর্মীরা পুরুষদের সঙ্গে কথা বলছিল। গণকবর, পুড়ে যাওয়া গ্রাম, মেয়েকে গণধর্ষণের সময় মা-বাবাকে দেখতে বাধ্য করা, দুধের শিশুকে মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করে ফেলা—বীভৎস সব কাহিনি বলেছে তারা।

এত কিছুর পরও এসব মানুষ বাড়ি ফিরতে চায়, মিয়ানমারের নাগরিকত্ব পেতে চায়। বাচ্চাদের জন্য ভালো স্কুল আর পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার চায়। মিয়ানমারের সবখানে অবাধ যাতায়াতের অধিকার চায়। প্রতিবেশীর কাছে শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব আর পুলিশের কাছে নিরাপত্তা পেতে চায়। তারা রাখাইনে ফিরতে চায়।

‘ফর্টিফাই রাইটস’ নথিপত্র প্রকাশ করেছে। মিয়ানমার সরকারের আর মিথ্যা বলার কোনো মানে হয় না। রোহিঙ্গারা নিজেদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে বাংলাদেশে পাড়ি জমিয়েছে—এমন ভাষ্য নির্জলা মিথ্যাচার। সত্যিটা এখন পরিষ্কার। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ২০১৭ সালের শুরুতেই রাখাইনজুড়ে সেনা মোতায়েন করে, রোহিঙ্গাদের ঘরে ঘরে গিয়ে আঘাত করার মতো ধারালো অস্ত্রসহ সব অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করে, সুপরিকল্পিতভাবে তাদের সবাইকে নিরস্ত্র করে। ঠিক ওই সময়েই রোহিঙ্গাদের গ্রামের কাছের বিভিন্ন এলাকায় অন্য নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেয়। হামলার সুবিধার্থে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ির সব বেড়া ভেঙে দেয়; খাবার সরবরাহ বন্ধ করে করে দেয়। রোহিঙ্গাদের নির্মূল করার জন্য তারা কত কি করেছে—এগুলো কিছু উদাহরণ মাত্র।

গত আগস্টের ঘটনা মারাত্মক ভীতিকর। মিয়ানমারজুড়ে, বিশেষত রাখাইনে সরকারের নির্যাতনের চিত্র যারা নথিবদ্ধ করে আসছে, সেসব মানবাধিকারকর্মী কিন্তু অতটা বিস্মিত নন। তাদের কাছে এটা দশক দশক ধরে চলা নির্যাতনের ঘটনায় নতুন সংযোজন মাত্র। অপরাধের শাস্তি না হওয়ায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অত্যাচারের মাত্রা বাড়ানোর সাহস পেয়েছে। এ অপরাধের শাস্তি কি হবে না? আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি রুখে দাঁড়াবে না?

মিয়ানমারে যা ঘটেছে সে ব্যাপারে সত্যি কথা বলতে অনেকে ভয় পাচ্ছে। আমি বলতে চাই, এটা গণহত্যা। আমাদের হাতে থাকা প্রমাণ সে কথাই বলে। মানবাধিকার পরিষদ, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনও এটাকে গণহত্যা অ্যাখ্যা দিয়েছে। রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটস ন্যায়বিচার দাবি করছে। ধর্ষক ও কসাইদের অবশ্যই বিচার হতে হবে। না হলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখে যেতে হবে। প্রত্যেক রোহিঙ্গাকে তার বাড়িতে নিরাপদে ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত, তাদের নাগরিকত্বের দাবি স্বীকৃত না হওয়া পর্যন্ত আমরা ক্ষান্ত হব না। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ভেবেছে, তাদের কোনো শাস্তি হবে না। তারা যে ভুল ভেবেছে, সেটা বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।

লেখক : রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটসের সভাপতি, মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী

সূত্র : এশিয়া টাইমস অনলাইন

ভাষান্তর : শামসুন নাহার



মন্তব্য