kalerkantho


পাকিস্তান আরো বেশি সামরিকতন্ত্র ও উগ্রবাদের দিকে ঝুঁকছে

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

২৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



পাকিস্তান আরো বেশি সামরিকতন্ত্র ও উগ্রবাদের দিকে ঝুঁকছে

২৫ জুলাই পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচন সামনে রেখে এক বছর ধরে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যা ঘটছে তাতে নির্বাচনী ছদ্মবেশের আড়ালে সেখানে আরেকটি নীরব সামরিক অভ্যুত্থান ঘটতে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক। সবাই আশঙ্কা করছেন নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকারটি গঠিত হবে তার কায়ায় না হলেও সর্বদা ছায়ায় থাকবে পাকিস্তানের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সেনাবাহিনী। এক বছর ধরে সবকিছু সেভাবেই সাজানো হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বছরখানেক আগে পদচ্যুত হওয়া তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ তাঁর কন্যা মরিয়ম নওয়াজসহ এই কয়েক দিন আগে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে আছেন। দুর্নীতির অভিযোগে মামলার রায় হওয়ার আগেই পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট সৎ ও বিশ্বস্ত না হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে নওয়াজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রীর আসন থেকে সরিয়ে দেন। এ ঘটনাকে তখন অনেকেই আখ্যা দিয়েছিলেন বিচার বিভাগীয় অভ্যুত্থান হিসেবে, যার সবকিছু ঘটেছে সেনা কর্তৃপক্ষের অঙ্গুলি হেলনে।

‘সৎ ও  বিশ্বস্ত’—এ দুটি বিমূর্ত শব্দ পাকিস্তানের সংবিধানে যুক্ত করেছিলেন দেশটির সবচেয়ে কট্টরপন্থী সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউল হক। পদচ্যুত হওয়ার পর কিছু হাঁকডাক ছাড়লেও কিছুদিনের মধ্যে নওয়াজ শরিফ লন্ডনে চলে যান। নওয়াজের উত্তরসূরি হিসেবে গণ্য মেয়ে মরিয়ম নওয়াজও বাবার সঙ্গে লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। এর মধ্যে দুর্নীতির অভিযোগে আদালত নওয়াজ শরিফকে ১০ বছর এবং মরিয়ম নওয়াজকে সাত বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন। দণ্ড মাথায় নিয়ে পিতা-কন্যা পাকিস্তানের বিমানবন্দরে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়েছে। এ সম্পর্কিত যা কিছু ঘটছে তা দেখে সবাই মনে করছেন পাকিস্তানের ক্ষমতায় বসানো ও নামানোর রশি যাদের হাতে সেই সেনাবাহিনী নওয়াজ শরিফ ও তাঁর পরিবারের  কাউকে আর ক্ষমতায় দেখতে চাইছে না। নওয়াজ ও তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরিকে জেলে  ঢোকানো হয়েছে। তার সঙ্গে নতুন করে নওয়াজের ছোট ভাই পাঞ্জাবের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, শাহবাজের ছেলে এবং দলের অন্য সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদী তত্পরতার অভিযোগ এনে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা করা হয়েছে।

নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে এ পর্যন্ত সব রকম জরিপে নওয়াজ শরিফের দল এগিয়ে থাকলেও তাতে কোনো কাজ হবে না। কারণ তিনবার নওয়াজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও ক্ষমতাধর সেনা কর্তৃপক্ষকে তুষ্ট করতে ব্যর্থ হয়ে তিনবারই মেয়াদপূর্তির আগে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন বিধায় সবাই মনে করছেন আর কোনো সুযোগ নওয়াজ শরিফকে দেওয়া হবে না। অনেকে বলছেন, নওয়াজ শরিফের ভাগ্য ভালো, তাঁকে প্রয়াত বেনজির ভুট্টোর মতো করুণ ট্র্যাজেডি বরণ করতে হয়নি। ২০০৭ সালে এ রকম জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে তখন ক্ষমতায় থাকা জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বিরাগভাজন বেনজির ভুট্টো নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দুবাই থেকে দেশে ফিরলে বিমানবন্দরের অভ্যর্থনা পদযাত্রার মিছিলের মধ্যে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। সে সময় দেশে ফেরার আগমহৃর্তে নিজের এক ব্যক্তিগত পশ্চিমা সাংবাদিক বন্ধুকে বেনজির লিখেছিলেন, আমার মৃত্যু হলে তার জন্য পারভেজ মোশাররফই দায়ী থাকবেন। ওই সাংবাদিককে বেনজির আরো লিখেছিলেন, ‘আমি মৃত্যুকে মাথায় নিয়ে দেশে ফিরছি। কারণ আমার হাতে এ সময় আর কোনো বিকল্প নেই। এ সময় দেশে না ফিরলে অবধারিতভাবে আমার রাজনৈতিক মৃত্যু হবে। আর দেশে ফিরলে জীবন্মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বেঁচে গেলে রাজনীতি ও জীবন দুটিই বাঁচবে। অন্যদিকে মৃত্যু হলে তা হবে রাজনৈতিক মৃত্যুর চেয়ে অনেক বেশি শ্রেয়। তাই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানোর জন্যই আমি পাকিস্তানে ফিরে যাচ্ছি।’ বেনজির বাঁচতে পারেননি। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর মিছিলের মধ্যে মোল্লা মেহসুদ নামের এক জঙ্গির গুলিতে ২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর নিহত হলেন বেনজির ভুট্টো। বেশির ভাগ মানুষ মনে করেন, সবকিছু ঘটেছে সামরিক শাসক পারভেজ  মোশাররফের অঙ্গুলি হেলনে।

এবারের ঘটনায় ইচ্ছা করলে নওয়াজ শরিফ লন্ডনে থেকে গিয়ে গ্রেপ্তার ও জেল-জরিমানা আপাতত এড়াতে পারতেন। কিন্তু পত্রিকায় দেখলাম নওয়াজ শরিফ বলেছেন, নিজের রাজনৈতিক মৃত্যু ঠেকাতেই সব ঝুঁকি নিয়ে তিনি দেশে ফিরেছেন। তবে রাজনীতি ও জীবনকে নওয়াজ শরিফ আদৌ রক্ষা করতে পারবেন কি না তা দেখার জন্য আমাদের হয়তো আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তিনি ও তাঁর  পরিবারের কেউ যে আর ক্ষমতায় আপাতত আসতে পারছেন না, তা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। ১৯৯৯ সালে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে উত্খাত হওয়ার অব্যবহিত পর সেবার ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল পারভেজ মোশাররফ তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সৌদি রাজ কর্তৃপক্ষের কৃপায় সেবার রক্ষা পেয়ে যান। সেনাবাহিনীর আস্থাভাজন না হতে পারায় এর আগে বেনজির ভুট্টো দুবার এবং এবার নিয়ে নওয়াজ শরিফ তিনবার মেয়াদপূর্তির আগে ক্ষতাচ্যুত হলেন। ২০১৩ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেওয়ার পরপরই নওয়াজ শরিফ বলেছিলেন, তিনি পাকিস্তানের মানুষকে জানিয়ে দিতে চান যে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি রাষ্ট্রের বস, সেনাবাহিনী নয়। অনেক বিশ্লেষক এখন বলছেন, আসলে সেদিনই নওয়াজ শরিফের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। এত দিন ছিল শুধু সময় গণনা এবং ক্ষেত্র প্রস্তুতের পালা।

চার বছরের মাথায় অনৈতিকতার অভিযোগে পদচ্যুত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে লন্ডন থেকে ফিরে নওয়াজকে শুধু কারাজীবনই নয়, রাজনীতি থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়েছে।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরে যা ঘটছে, তাতে পুরো অঞ্চলের জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ সৃষ্টি হয়েছে। যে মুহূর্তে নওয়াজ ও তাঁর মেয়েকে জেলে নেওয়া হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তথাকথিত ভালো জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের (যেসব সন্ত্রাসীকে ভারত ও আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়) মূলধারার রাজনীতিতে পুনর্বাসন করছে। ২০০৮ সালে ভারতের মুম্বাইয়ের তাজ হোটেলে জঙ্গি আক্রমণের প্রধান আসামি মাওলানা হাফিজ সাঈদকে শুধু মুক্তিই দেওয়া হয়নি, তাঁর নেতৃত্বে আল্লাহু আকবার তেহরিক নামের একটি দল খুলে সেই দলকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথও  প্রসারিত করা হয়েছে। নওয়াজ শরিফ যেদিন পাকিস্তানে ফিরলেন, সেদিন ১৩ জুলাই শুক্রবার বেলুচিস্তানে একটি নির্বাচনী প্রচার সমাবেশে জঙ্গিদের আক্রমণে ১২৮ জন নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছে। এই আক্রমণের টার্গেট হয়েছে বেলুচিস্তান আওয়ামী পার্টি (বিএপি), যারা উদার গণতান্ত্রিকপন্থী এবং পাকিস্তানের মোল্লা ও মিলিটারি অক্ষশক্তির বিরোধী। এই হত্যার উন্মাদনা বন্ধে সরকার বা সেনাবাহিনীর কাউকেই তেমন সক্রিয় ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি।

পরিস্থিতি মূল্যায়নে পাকিস্তানি বিশ্লেষকরা বলছেন, দেখেশুনে মনে হচ্ছে বর্তমান সেনা কর্তৃপক্ষ পেছন থেকে জেনারেল জিয়াউল হকের দেখানো পথে হাঁটছে। পাকিস্তানের রাজনীতিতে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পরিবারের কর্তৃত্ব হ্রাস করার জন্য জেনারেল জিয়াউল হক ইসলামিস্ট কট্টরপন্থীদের সঙ্গে নিয়ে পাঞ্জাবের প্রভাবশালী শিল্পপতি পরিবারের উদীয়মান স্টার নওয়াজ শরিফকে টেনে এনে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। প্রায় ৩৮ বছর পর বর্তমান সেনা কর্তৃপক্ষ একই কৌশলে কট্টর ইসলামিস্টদের সহযোগিতায় নওয়াজ শরিফ ও তাঁর পরিবারকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করে তদস্থলে সাবেক ক্রিকেটার উগ্র মতাবলম্বী ইমরান খানকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। এর আলামত নওয়াজ শরিফ ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার অব্যবহিত পরই পাওয়া যায়। ভারতের সঙ্গে দহরম-মহরম এবং দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিচ্ছেন—নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলে ইমরান খানের দল বিশাল জনসমাবেশের মাধ্যমে প্রায় তিন মাস ইসলামাবাদের সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে রাজধানীকে প্রায় অচল করে দিয়েছিল। তখন সবাই বলেছেন, সেনা কর্তৃপক্ষের ছত্রচ্ছায়ায় ও নির্দেশে ইমরান খান ওই কর্মসূচি পালন করছেন। তারপর একসময় দেখা গেল প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ সেনা সদরে এসে সেনাপ্রধানের সঙ্গে দেখা করলে ইমরান খানের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। সুতরাং তাবৎ বিশ্লেষকদের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। তাই ২৫ জুলাই নির্বাচনের মাধ্যমে মোল্লা ও মিলিটারির সমর্থনপুষ্ট হয়ে যেকোনো ম্যাকানিজমেই হোক ইমরান খান ও তাঁর দল পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসছে বলে সবাই ধারণা করছেন। আর তা যখন হবে, তখন সামরিক অভ্যুত্থান ব্যতিরেকেই সামরিক বাহিনী কর্তৃক আরেকবার নিজ দেশ পাকিস্তান দখলের কাজ সম্পন্ন হবে।

ইমরান খান তাঁর রাজনীতির শুরু থেকেই অত্যন্ত উগ্রপন্থী মনোভাব ব্যক্ত করে আসছেন এবং তাঁর ভাষা ও বক্তব্যের সঙ্গে মোল্লা আর মিলিটারির ভাষা ও বক্তব্যের কোনো পার্থক্য নেই। নওয়াজ শরিফ ও বেনজির ভুট্টোকে পোষ মানাতে না পেরে পাকিস্তানের সেনা কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত পাপেট মনে করছে ইমরান খানকে। পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থার এই নতুন সংস্করণে নতুন জোশে শক্তিশালী হবে লস্কর-ই-তৈয়বা নেতা মাওলানা হাফিজ সাঈদ, জইশ-ই-মোহাম্মদ নেতা মাওলানা মাসুদ আজহার এবং তালেবান গোষ্ঠী। তাই সবকিছু মিলে মনে হচ্ছে পাকিস্তান ভবিষ্যতে আরো সামরিকতন্ত্র ও উগ্রবাদের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। এর পরিণতিতে আফগানিস্তান ও ভারতের অভ্যন্তরে জঙ্গি তত্পরতার আশঙ্কা আরো বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের জন্যও তাতে উদ্বেগের কারণ রয়েছে। কারণ আমাদের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই যে ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

 

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

sikder52@gmail.com



মন্তব্য