kalerkantho


স্মরণ

শহীদ কর্নেল আবু তাহের দিবস

মুশতাক হোসেন

২১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



শহীদ কর্নেল আবু তাহের দিবস

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সংঘটিত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান ও ১৯৭৬ সালের জুন-জুলাইয়ে কর্নেল আবু তাহেরের গোপন বিচার নিয়ে প্রচুর তর্কবিতর্ক হয়েছে এবং হচ্ছে। যদিও ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই কর্নেল তাহেরের ফাঁসিকে কেউই যুক্তিপূর্ণ ও সঠিক মনে করেনি, এমনকি সেই গোপন ট্রাইব্যুনালে দায়িত্বরত সরকারপক্ষের লোকজনও নয়। এখন বলা হয়, জেনারেল জিয়া ফাঁসির আগে উচ্চপর্যায়ের সেনা কর্মকর্তাদের বৈঠক ডাকলে সবাই তাহেরের ফাঁসির দাবি তোলেন—এ তথ্যও সঠিক নয়। মূলত ফাঁসির সিদ্ধান্ত আগেই ঠিক করে রেখে সেটা জানিয়ে দেওয়া ও ফাঁসির সম্ভাব্য বিরুদ্ধাচরণকারীদের হুমকি দেওয়ার জন্য সেই সভা ডাকা হয়েছিল বলে পরবর্তী সময় জানা গেছে।

১৯৭৬ সালের গোপন বিচারের বিরুদ্ধে রিট আবেদন করা হলে মহামান্য বাংলাদেশ হাইকোর্ট ওই গোপন বিচার পর্যালোচনা করে ২০১১ সালের ২২ মার্চ সেই গোপন বিচারকে বাতিল করে এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন। ফলে গোপন বিচারের বৈধতা নিয়ে তর্কবিতর্কের অবসান হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিচারের নামে প্রহসনকে প্রতিরোধ করতে হলে ২০১১ সালের রায়কে আমাদের বারবার স্মরণ ও বিশ্লেষণ করা দরকার।

২০১০ ও ২০১১ সালে চারজন রিট পিটিশনকারী যেসব বিষয়ের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেছিলেন সেগুলো হলো—১. সারা বাংলাদেশে সামরিক শাসন জারি করার ২০ আগস্ট ১৯৭৫ তারিখের ঘোষণা; ২. ১৪ জুন ১৯৭৬ তারিখে বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত ১৯৭৬ সালের সামরিক আইনবিধি নম্বর ১৬; এবং ৩. বিশেষ সামরিক আইন আদালতের বিশেষ সামরিক আইন মামলা নম্বর ১-এ ১৯৭৬ সালের ১৭ জুলাইয়ের রায় ও আদেশ। দুটি রিট আবেদনকারীদের সবাইকে এবং দুজন আবেদনকারীর (লুত্ফা তাহের ও ফাতেমা ইউসুফ) স্বামীকে ওই আদালত দণ্ডবিধির ১২১ক ধারায় শাস্তি প্রদান করে। চারটি রিট আবেদন একই ধরনের হওয়ায় আদালত একসঙ্গে রিট আবেদনগুলোকে বিবেচনা করেন।

প্রথম রিট আবেদনের (২০১০ সালের ৭২৩৬ নম্বর) গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে :

২০ আগস্ট ১৯৭৫ তারিখে সারা বাংলাদেশকে একটি তথাকথিত ঘোষণা দ্বারা তথাকথিত সামরিক শাসনের অধীনস্থ করা হয়। জনৈক খন্দকার মোশতাক আহমদ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সব ও পূর্ণ ক্ষমতা দখল করেন। ওই তথাকথিত সরকার তথাকথিত ঘোষণার ক্ষমতাবলে ১৯৭৫ সালের ২৩ নভেম্বর কর্নেল আবু তাহেরকে গ্রেপ্তার করে। অন্যদেরও একই তথাকথিত ক্ষমতাবলে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয় একটি তথাকথিত এফআইআরের বরাতে। ১৯৭৬ সালের ৪ জুন মোহাম্মদপুর থানায় দণ্ডবিধির ১২১ক ধারা ও একই দণ্ডবিধির অন্যান্য ধারা উল্লেখ করে এ এফআইআর দায়ের করা হয়। এ এফআইআরের ভিত্তিতে একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় লে. কর্নেল (অব.) আবু তাহের বীর-উত্তমকে মৃত্যুদণ্ড, ফ্লাইট সার্জেন্ট (অব.) আবু ইউসুফ খান বীরবিক্রম ও মেজর (অব.) এম এ জলিলকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্য অভিযুক্তদের বিভিন্ন মেয়াদের শাস্তি দেওয়া হয়।

তথাকথিত ট্রাইব্যুনালটি গঠিত হয় ১৯৭৬ সালের তথাকথিত সামরিক আইনবিধি ১৬-এর অনুচ্ছেদ ৩(৪) অনুযায়ী। এ বিধি জারি হওয়ার আগে অথবা পরে যেকোনো অপরাধের বিচার করার ক্ষমতা দেওয়া হয় এই তথাকথিত ট্রাইব্যুনালকে। দণ্ডবিধির সপ্তম ও অষ্টম অধ্যায়ে বর্ণিত অপরাধকেও তথাকথিত এই ট্রাইব্যুনালের আওতাধীন করা হয় সামরিক বিধির ৩(৪)ক অনুচ্ছেদ দ্বারা। এ তথাকথিত বিধি ট্রাইব্যুনালকে ক্ষমতা দেয় চেয়ারম্যানের ইচ্ছা অনুযায়ী গোপনে বিচারকাজ করার। এ তথাকথিত বিধি ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলকে একেবারে আটকে দেয়। বিধির অনুচ্ছেদ ৪(১০) বলে যে চেয়ারম্যান মামলার সঙ্গে সম্পর্কিতদের মামলার তথ্য গোপন রাখতে শপথ পড়াবেন।

এ তথাকথিত ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল সেনাবাহিনীর একজন কর্নেল (ইউসুফ হায়দার, যিনি চেয়ারম্যান ছিলেন), বিমানবাহিনীর একজন উইং কমান্ডার, নৌবাহিনীর একজন ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার ও দুজন ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা। ১৮ জুন ১৯৭৬ তথাকথিত ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে  সিরাজুল আলম খান, শরীফ নুরুল আম্বিয়াসহ ১১ ব্যক্তিকে ২১ জুন ১৯৭৬ তারিখের আগে ট্রাইব্যুনালের কাছে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেন। যে মামলায় কর্নেল আবু তাহের (অব.) ও অন্যদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, সেই মামলার সূত্রেই তাঁদের আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়।

সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সঙ্গে এ মামলা চলে। যদিও সব অভিযুক্তের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করতে দেওয়া হয়; কিন্তু লুত্ফা তাহের ও ফাতেমা ইউসুফকে কখনোই ট্রাইব্যুনালে আসতে দেওয়া হয়নি। তথাকথিত গোপনীয়তার শপথের কারণে মামলার কোনো কিছুই এ দুজন জানতেন না। লুত্ফা তাহের তাঁর স্বামীর সঙ্গে দেখা করার জন্য বারবার লিখিত আবেদন করেও সাড়া পাননি। শুধু পত্রিকার মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে তাঁর স্বামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে। স্বামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশের খবর জানার পর তখনকার তথাকথিত রাষ্ট্রপতি, তথাকথিত প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও তথাকথিত উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসকদের কাছে লুত্ফা তাহের মৃত্যুদণ্ডাদেশ নিশ্চিত করা বন্ধ করতে এবং মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর স্থগিত করতে দরখাস্ত দেন। জবাবে তাঁকে জানানো হলো যে রাষ্ট্রপতির পক্ষে লুত্ফা তাহেরের আবেদন গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

২১ জুলাই ১৯৭৬ কর্নেল আবু তাহের (অব.) বীর-উত্তমের তথাকথিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাঁর মরদেহ পিকআপ গাড়িতে বের করা হয়। অতঃপর হেলিকপ্টারে করে তাঁর গ্রাম নেত্রকোনার পূর্বধলা থানার কাজলা গ্রামে নেওয়া হয়, যেখানে তিনি সমাধিস্থ হন।

১ নম্বর রিট আবেদনকারী অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ও আবু ইউসুফ খান বীরবিক্রমকে ১৯৮০ সালের জুন মাসে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু তখন থেকে আজ পর্যন্ত তাঁদের মুক্তির কোনো সরকারি আদেশের কাগজপত্র দেওয়া হয়নি। ওই মামলার রায়ের কোনো কাগজ বা সত্যায়িত অনুলিপি, অভিযোগনামা, সাক্ষীদের সাক্ষ্য, অভিযুক্তদের বক্তব্য বা মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো দলিলপত্রই কাউকে দেওয়া হয়নি। অথচ এগুলো পাওয়ার জন্য রিট পিটিশনকারীরা বহু চেষ্টা করেছেন।

জাতীয় সংসদের এক তথাকথিত আইন, সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী, ৭ এপ্রিল ১৯৭৯ তারিখে পাস হয়। এ আইনে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ৯ এপ্রিল ১৯৭৯ পর্যন্ত সামরিক শাসনামলে যত আইনবিধি, সামরিক আদালতে বিচারের রায় ইত্যাদি জারি করা হয়েছে, যত কাজ করা হয়েছে, এমনকি সামরিক ফরমানবলে করা সংবিধানের সংশোধনী—সেগুলো সব অনুমোদিত ও সংবিধানের অংশ বলে গণ্য করা হয়। এ তথাকথিত পঞ্চম সংশোধনী ২০০৬ সালে হাইকোর্ট বাতিল ঘোষণা করেন, যা ২০০৬ সালের বাংলাদেশ ল টাইমসের বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশ করা হয়েছে। আপিল বিভাগে এর বিরুদ্ধে লিভ পিটিশন দায়ের করা হলে আপিল বিভাগ তা খারিজ করে দেন, তবে ছোটখাটো কিছু ত্রুটি সংশোধন করে রায়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

রিট পিটিশনকারীরা বলেন, যেহেতু গোটা পঞ্চম সংশোধনীই বাতিল হয়েছে, তাই সামরিক শাসনামলে গঠিত তথাকথিত ট্রাইব্যুনালের গোপন বিচারও অবৈধ। এ যুক্তিতে হাইকোর্টে রিট পিটিশনটি শুনানির জন্য গ্রহণ করেন এবং ২২ মার্চ ২০১১ সালে রায় প্রদান করেন।

 

লেখক : ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কর্নেল তাহের সংসদের সহসভাপতি

 



মন্তব্য