kalerkantho


শতরং

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আসল দুশ্চিন্তা

মোস্তফা মামুন

২০ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আসল দুশ্চিন্তা

গল্পটা আগেও বলেছি। তবু আবার বলি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির ছবি বোঝাতে এর চেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ আর হয় না।

নব্বই দশকের শেষ ভাগ পর্যন্ত ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের একচেটিয়া রাজত্ব ছিল। সেই সময় বহু বছর পর ক্ষমতায় এলো আওয়ামী লীগ। তখন ক্যাম্পাস আর ছাত্ররাজনীতির শক্তিটা এত বেশি যে ক্যাম্পাস বিরুদ্ধে রেখে সরকার চালানো খুব কঠিন। ক্যাম্পাসে শক্তি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত স্বাভাবিক। তার অংশ হিসেবে অনেক জটিল অঙ্ক সমাধান করে হলগুলো দখল করা হলো একে একে। মুহসীন হল দখলের পরের ঘটনা। সকালবেলা বিস্মিত হয়ে দেখি আগের রাতে যারা ‘শহীদ জিয়া লও লও লও সালাম’ স্লোগান দিয়ে মুখর করে রেখেছিল চারদিক, তাদের একজন জিয়ার ছবি ভাঙছে। চেনামুখ, কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই হেসে বলল, ‘ছাত্রলীগে যোগ দিয়ে দিলাম।’

‘কাল না বলেছিলে জীবন দেবে তবু ছাত্রলীগকে হলে আসতে দেবে না।’

‘এ জন্যই তো নিজেরাই ছাত্রলীগ হয়ে গেলাম। হলের শৃঙ্খলাও থাকল। আমরাও থাকলাম।’

জিয়ার ছবি ছিঁড়ে। বঙ্গবন্ধুর ছবি ওড়ে। ছাত্রদল হয়ে যায় ছাত্রলীগ। লেবাসটা বদলায়। মুখগুলো একই রয়ে যায়।

আদর্শহীন এই রাজনীতির সঙ্গে গুণ্ডামির খুব একটা পার্থক্য নেই। সেই গুণ্ডামির চূড়ান্ত রূপ বোধ হয় আমরা এখন দেখছি। শিক্ষকদের দিকে তেড়ে যেতেও এদের দ্বিধা হয় না। সহপাঠী ছাত্রীদের ওপর হামলা করা এই কাপুরুষদের কাছে বীরত্বের নাম।

আরেকটা গল্প বলি। একদিন হঠাৎ খবর পেলাম এস এম হলে কিছু আত্মগোপনকারী শিবিরকর্মীকে পিটিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দু-একজন চেনা। আশ্চর্য হয়ে গেলাম এই ভেবে যে এরা শিবির হবে কেন? কোনো দিন তো সেই রকম কোনো মনোভাবের প্রকাশ দেখিনি। হাসপাতালে গিয়ে কিছু সহানুভূতিও দেখিয়ে এলাম। কয়েক বছর পর জানলাম তাদের কয়েকজন সত্যিই শিবির করত। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা হল শাখার গোপন কমিটির সভাপতি বা সম্পাদক কিছু একটা ছিল। বিস্মিত হয়ে গেলাম এই ভেবে যে যাদের সাধারণ ছাত্রের চেয়ে অন্য কিছু ভাবিনি তারা তলে তলে অন্য মিশনে ব্যস্ত ছিল। সেদিন বুঝলাম ক্যাম্পাসের রাজনীতিতে বাইরে থেকে যা দেখা যায় সেটাই পুরো ছবি নয়। অনেক রাজনীতির জটিলতা এখানে; ক্রিয়াশীল বহু রকম শক্তি। হয়তো কোটা আন্দোলনে অন্য কেউ ফায়দা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছে, কয়েক বছর পর হয়তো আসল সত্যটা জানব, কিন্তু তাহলেও তো এটা অস্বীকারের উপায় নেই যে এই দাবির সঙ্গে সাধারণ ছাত্রদের উল্লেখযোগ্য অংশের সম্পৃক্তি আছে। আর অন্য উদ্দেশ্য থাকলেও ছাত্রলীগ বা কোনো সংগঠনের আইন হাতে তুলে নিয়ে তাদের মারধরের অধিকার জন্মায় না।

জাভেদ ভাই যুক্তিগুলো মন দিয়ে শুনে বললেন, ‘তাহলে তুমি বলতে চাইছ ছাত্ররাজনীতি চূড়ান্ত অধঃপতনে চলে গেছে। তাই তো!’

‘অনেকটা তাই।’

‘আমি একমত না।’

জাভেদ ভাই আমার যেকোনো যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করাকে পবিত্র দায়িত্ব মনে করেন। খুব একটা গুরুত্ব দিতে চাইছিলাম না। আমাকে উদাসীন দেখে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন, ‘শোনো ছাত্ররাজনীতি নিয়ে অনেক বড় বড় কথা হয়, কিন্তু ভেতরে এই ক্লেদ সব সময়ই ছিল। এরশাদের সময় হলে বোমা বানাতে গিয়ে ছাত্ররা মারা যেত। গোলাগুলি হতো যখন-তখন। তার আগে পাকিস্তান আমলে এনএসএফ ক্যাম্পাসকে জিম্মি করে রেখেছিল।’

বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘আপনি তাহলে এসবকে জাস্টিফাই করছেন?’

‘না জাস্টিফাই করছি না। আমি বরং দেখতে চাই অন্যভাবে। ক্যাম্পাস বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির মধ্যে পঙ্কিলতা সব সময় ছিল। সেটা নতুন নয়। নতুন অন্য একটা জিনিস।’

‘কী জিনিস নতুন?’

‘সামগ্রিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান।’

‘পড়াশোনার কথা বলছেন। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাচ্ছে...’

‘আরে না। শুধু পড়াশোনা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মাপার চেষ্টা করে যারা, তারা অতি উচ্চপর্যায়ের আহাম্মক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে অনন্য তার সামগ্রিকতার জন্য। তার সাংস্কৃতিক চরিত্র, নিজেকে প্রকাশ আর আবিষ্কারের যে বিশাল ক্ষেত্র সেটাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদা করে রেখেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন তার সেই শক্তি বা চরিত্র হারিয়ে ফেলছে। এটাই হচ্ছে চিন্তার বিষয়।’

‘কথায় যুক্তি আছে। তবে আরেকটু বুঝিয়ে বলুন।’

‘বোঝার হলে ছোট্ট একটা ঘটনা দিয়েই বুঝবে। ক্যাম্পাসকে আমরা ধরি মুক্তচিন্তা বা মুক্ত চলাচলের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। কিন্তু সেই ক্যাম্পাসে এখন দুটি ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে রিকশায় চললে অন্যরা তাদের মারতে আসে। সাবেক ছাত্র তাদের পরিবার নিয়ে ক্যাম্পাসে ঘুরতে গিয়ে আক্রমণের শিকার হয়। আমার কাছে তো মনে হয় এগুলো এই রাজনীতির হানাহানির চেয়ে অনেক বিপজ্জনক খবর।’

‘কিন্তু যারা মারধর করছে তারাও তো শুনেছি সরকারি ছাত্র সংগঠনের সদস্য। তাদেরই অপকীর্তি।’

‘এখানেই তো ঘটনাটা। আগে যারা রাজনীতি করত তারা ভালো-মন্দ যা-ই করুক রাজনীতির অঙ্ক নিয়ে ভাবত। অন্য সব, মুক্তচিন্তার চর্চা, সাংস্কৃতিক আন্দোলন এগুলোতে ওরা মাথা ঘামাত না। আর সাধারণ ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র-ঐতিহ্য রক্ষায় সচেতন ছিল। সাধারণরা সাধারণত ছিল প্রগতিশীল, নতুন চিন্তা আর সংস্কৃতির পক্ষে। এখন পুরোপুরি সে রকম নয়। এখানেই পরিবর্তন এবং এখানেই পতন।’

জাভেদ ভাই একটু থেমে বিষণ্ন গলায় বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র হিসেবে আর সবার মতো আমারও একটা অহংকার আছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে নতুন করে ভাবতে হবে।’

জাভেদ ভাইয়ের শেষ কথাটায় একটা অদ্ভুত কষ্ট টের পাই। আর কষ্টটা নিজের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। এই ঢাকা শহরের সব জায়গায় ভিড়-যানজট-হানাহানি। সম্পদ আর ক্ষমতার নেশায় মত্ত হয়ে যাওয়া মানুষদের ছাপিয়ে এই ক্যাম্পাসে ঢুকে যখন দেখি কোনো পাঠচক্রের সদস্যরা গোল হয়ে বসে বিশ্বসাহিত্য নিয়ে আলোচনা করছে কিংবা কোনো দরদি মানুষ টাকা তুলছে মঙ্গাপীড়িতদের জন্য কিংবা কোনো আত্মমগ্ন শিল্পী ছবির হাটে এসে দাঁড়িয়েছেন নিজের শিল্পকর্ম নিয়ে, তখন ঠিক একটা ভরসা মেলে। সব কিছু শেষ হয়ে যায়নি।

ঝকঝকে গাড়ি থেকে নামা ছাত্রী মফস্বল থেকে এসে টিউশনি করে চলা তরুণের সঙ্গে পা মিলিয়ে চলে, কেউ তাদের স্বাধীনতায় নাক গলাতে আসে না। উষ্কখুষ্ক চুল আর এলোমেলো পোশাকের কয়েকজন সমাজ বদলে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে নিশ্চিন্তে চলে চারুকলার দিকে এবং কেউ তাদের পথ আগলে অন্য উদ্দেশ্য খোঁজে না—এই তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্রের নিজস্বতা। সেই ছবিটা আক্রান্ত হলে আর দশটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্থক্যটা কী! তখন তো তাকেও মাপা হবে ফার্স্ট ক্লাস, জিপিএর কাগুজে হিসাব দিয়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক উপাচার্য একবার গর্ব করে বলেছিলেন, ‘উইদাউট ঢাকা ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ইজ এ বিগ জিরো।’

হায়, এখন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই ‘বিগ জিরো’ হতে চলেছে!

 

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

 



মন্তব্য