kalerkantho


আন্ত আটলান্টিক বিরোধ ও নতুন বিশ্ব-বাস্তবতা

ক্রিস্টিনা লিন

১৯ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



আন্ত আটলান্টিক বিরোধ ও নতুন বিশ্ব-বাস্তবতা

বুকের ওপর আড়াআড়ি হাত রেখে বসে আছেন ট্রাম্প, আর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল এবং অন্য নেতারা তাঁকে ঘিরে ধরে আছেন—জুনের ৯ তারিখে জি-৭ সম্মেলনের এ ছবিটি ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছবিটি ওয়াশিংটন ও বার্লিনের মধ্যে এবং অন্য মিত্রদের সঙ্গে চলমান বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের স্মারক। ১১-১২ জুলাই ন্যাটো সম্মেলনেও এ সম্পর্কের ধারাবাহিকতা দেখা গেছে।

ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প বিরক্তি প্রকাশ করে বলেছেন, ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য ব্যয়ের বোঝা বহন করতে গিয়ে মার্কিন জনগণের ওপর চাপ পড়ছে, এটা অন্যায়। দশকের পর দশক ধরে ইউরোপীয় মিত্ররা প্রতিরক্ষা বাবদ নামকাওয়াস্তে বাজেট বরাদ্দ করছে। এ ধারা চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হবে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে আটলান্টিকের দুই পারেই সভা-সেমিনারে ও গণমাধ্যমে ট্রাম্পকে তুলাধোনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ট্রাম্প হলেন গোলমালের শিরোমণি। তিনি মার্কিন নেতৃত্বাধীন উদারনৈতিক বিশ্বব্যবস্থাকে খাটো করছেন, ন্যাটো ও আন্ত আটলান্টিক মৈত্রীকে অবজ্ঞা করছেন, বার্লিনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছেন ও জার্মানির রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের প্রয়াস করছেন। তিনি ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের সঙ্গে আন্তরিকতার সম্পর্ক নষ্ট করছেন বলে গণমাধ্যমে বিলাপ করা হচ্ছে।

যা-ই হোক, এখনই এত বিলাপের কিছু নেই। আন্ত আটলান্টিক বিরোধকে সুগঠিত কিছু বলা যাবে না, এটাকে বরং ভিনগ্রহবাসীদের মধ্যে ভুল যোগাযোগ ও ভুল-বোঝাবুঝিসংক্রান্ত সমস্যা বলা যেতে পারে। নিঃসন্দেহে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার জার্মানি। চীনও জানে, ইইউর পথ বার্লিনের ওপর দিয়ে গেছে, ব্রাসেলসের ওপর দিয়ে নয়। তবে একজন অংশীদার সেরা বন্ধু না-ও হতে পারে। সেরা বন্ধুর আসনটি বরাবরই যুক্তরাজ্যের জন্য বরাদ্দ। অবশ্য ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে আর যুক্তরাষ্ট্রের সেরা বন্ধু থাকবে না।

ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের এই দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তনে মিত্র ও অংশীদাররা আহত বোধ করতে পারে, প্রত্যাখ্যাত বোধ করতে পারে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এটি অনুধাবন করা যে ট্রাম্প গ্লোবালিস্ট নন, তিনি বরং ‘মার্কিন বিশেষত্ববাদী’। একসময় যুক্তরাষ্ট্র এ নীতিতেই চলত। এ নীতির উপকরণগুলোর মধ্যে রয়েছে ইঙ্গো-মার্কিন বিশেষ সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল মিত্রতা ও ইংরেজিভাষীদের সংহতি। গত ফেব্রুয়ারিতে ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রবন্ধে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চার্লস কুপচান বলেন, ট্রাম্পের ‘প্রথমেই যুক্তরাষ্ট্র’ নীতি আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী ‘মার্কিন বিশেষত্ব’ নীতির রূপভেদ মাত্র।

মার্কিন বিশেষত্ব নীতিতে আগে প্রাধান্য পেত গণতন্ত্রের উদাহরণমূলক বিস্তার, এখন প্রাধান্য পাচ্ছে গণতন্ত্রের অনুপ্রবেশমূলক ও আগ্রাসনমূলক বিস্তার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে মার্কিন নীতি ছিল রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড ও অভিজ্ঞতাকে বৈদেশিক হুমকি থেকে আগলে রাখা, বৈদেশিক বিষয়াদি থেকে দূরে থাকা, উদাহরণমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের বিস্তার, সংরক্ষণবাদ ও সুষ্ঠু বাণিজ্য এবং নাগরিক সমরূপতা রক্ষা করা। এটা বিশেষত্ব নীতির প্রথম পর্ব। পার্ল হারবারে হামলার ঘটনার পর এ পর্বের অবসান হয়, শুরু হয় বিশেষত্ব নীতির দ্বিতীয় পর্ব। এ পর্বের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বৈদেশিক বিষয়াদিতে সংশ্লিষ্ট হওয়া এবং আগ্রাসনমূলক অভিযান পরিচালনা করা। তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তার পরিবর্তিত বিশেষত্ব নীতিরই অংশ। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সরকার বদলে ফেলতে হবে—একে বলা হয় রেজিম চেঞ্জ পলিসি। 

ভ্রান্ত রেজিম চেঞ্জ পলিসির ফল কী? মধ্যপ্রাচ্যে বেশ কয়েকটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে, সন্ত্রাসবাদ ও ইসলামী জঙ্গিবাদ বেড়েছে, খাদ্য সংকট ও ইউরোপমুখী অভিবাসীর ঢল নেমেছে। ফলে ইউরোপ অস্থিতিশীলতার হুমকিতে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রসারণবাদী কর্মকাণ্ডও প্রশ্নবিদ্ধ। অধ্যাপক কুপচানের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এখন বিশেষত্ব নীতির তৃতীয় পর্ব দরকার। এতে সংরক্ষণবাদ, ক্ষেত্র বিশেষে বিস্তারমুখিতা ও নিরাপত্তা বিষয়ে সমন্বিত সহযোগিতার বিষয়গুলো থাকা দরকার। যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্ব-পুলিশের ভূমিকা ছাড়তে হবে।

পাশ্চাত্য উপকরণগত ও আদর্শিক নেতৃত্ব হারাতে বসেছে। নেতৃত্ব এখন পাশ্চাত্যের হাত থেকে বিভিন্ন অঞ্চলের হাতে বা বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর হাতে যাচ্ছে। সম্ভবত এ প্রবণতাই ভবিষ্যৎ বিশ্বের নিয়ামক বৈশিষ্ট্য হবে। বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব গড়ে উঠতে যাচ্ছে। এই বিশ্বই যদি নিয়তি হয়ে থাকে তাহলে বলা যায়, আমেরিকা (উভয় মহাদেশীয়) এক পক্ষে থাকবে, জার্মানি বা মহাদেশীয় ইউরোপ আরেক পক্ষে, চীন ও রাশিয়া থাকবে ইউরেশীয় পক্ষে, ইরান ও উত্তর মধ্যপ্রাচ্য থাকবে এক পক্ষে, আরেক পক্ষে থাকবে সৌদি আরব ও দক্ষিণ মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকাও এক পক্ষ হয়ে উঠবে। আরো কিছু পক্ষ থাকবে। সেই বিশ্বব্যবস্থায় একক আধিপত্য থাকবে না। পক্ষগুলোকে সমঝোতা করে ভারসাম্যমূলক নীতি অবলম্বন করে চলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র এ বাস্তবতার কথা যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করবে, তত মঙ্গল। আন্ত আটলান্টিক বিরোধের নিরিখে এ বিবেচনা থেকেই ‘বিশেষত্ব নীতি’ অবলম্বন করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে।

লেখক : জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ট্রান্স আটলান্টিক রিলেশনসের ফেলো

সূত্র : দি এশিয়া টাইমস অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক



মন্তব্য