kalerkantho


সাদাকালো

হুমকিতে নয়, আলোচনায়ই সমাধান

আহমদ রফিক

১৯ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



হুমকিতে নয়, আলোচনায়ই সমাধান

চীনা বিপ্লবের পর সে দেশে রাষ্ট্র পরিচালনায় ও রাজনৈতিক সংগঠনের ক্ষেত্রে আদর্শিক ঝাঁজ ছিল খুব প্রখর। সোভিয়েত ইউনিয়নের শক্তিমান রাষ্ট্রনায়ক জোসেফ স্তালিনের মৃত্যুর (১৯৫৩) পর সেখানকার নব্য নেতৃত্বের আদর্শিক খাতে ভিন্নধারায় শিথিলতার প্রকাশ ঘটতে থাকে, যা চিহ্নিত হয় সংশোধনবাদরূপে। শুরু হয়ে যায় মস্কো-পিকিং দ্বন্দ্ব, প্রথমে নিঃশব্দে, পরে প্রকাশ্যে। রুশি প্রভাবের সম্প্রসারণেও ছিল চীনের আপত্তি।

দ্বন্দ্বের এ ধারা একালে শেষ হলেও এর অন্তর্নিহিত জের মেটেনি, আদৌ মিটবে কি না সন্দেহের বিষয়, বিশেষ করে ত্রিধাবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশে। আমাদের আদর্শিক পরনির্ভরতা এমনই, যা এককথায় মননশীলতার খরার প্রতীক।  পঞ্চাশের দশক থেকে সূচিত এ দ্বন্দ্বের শক্তিমান প্রকাশ ছিল বিশ্বব্যাপী। সেখানে চীনা নীতি আদর্শ বিচারে কয়েক পা এগিয়ে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের তুলনায়।

তার নীতি ও আদর্শ সম্পর্কে প্রশ্নের মধ্যেও তখনকার  সোভিয়েত শাসন বিশ্বে তার প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরাশক্তিসুলভ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ। নিজস্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করেও চলেছে তার মহাকাশবিজ্ঞান প্রযুক্তি গবেষণা ও তারকাযুদ্ধের মহড়া ওয়াশিংটনের পাশাপাশি। ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনের অর্থনৈতিক উন্নতির তুলনায় আধিপত্যবাদী লড়াই বড় হয়ে উঠেছিল। হয়তো তাই তাদের সমাজজীবনে, ব্যক্তিজীবনে অসন্তোষ ধূমায়িত হচ্ছিল।  শাসনযন্ত্র সেসব আমলে নেওয়া প্রয়োজন বোধ করেনি। এ ছাড়া নীতিগত ও শাসনগত একাধিক কারণ মিলে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত শাসনব্যবস্থার পতন, ইউনিয়নে ভাঙন এবং দুর্বল পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নব্য রাশিয়ার আবির্ভাব। সমাজতন্ত্রী ভাবাদর্শের দুর্বল অবশিষ্ট শক্তির প্রতিবাদে শ্রমিক-জনতার সমর্থন ছিল সামান্য। তাই তাদের হার।

পঞ্চাশের দশকে সমাজতন্ত্রী ভাবাদর্শের বিশ্বব্যাপী প্রবলতার মধ্যে চীনা ধারার প্রভাব ছিল অধিকতর। পিকিং বেতার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার ‘পদলেহী কুকুরদের’ সমালোচনায় এ সময় ছিল তিক্ত ও সরব। মাওবাদী চিন্তাধারায় বিশ্ব তারুণ্য উদ্বেল। এমনকি উদ্বেল ভারতীয় সমাজতন্ত্রীদের একাংশ। এ ক্ষেত্রে আদর্শগত দ্বন্দ্ব কেন্দ্রীভূত  হতে থাকে যতটা মার্কিন পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একই ধারায় দ্বন্দ্ব মস্কো বনাম চীন, তথা মস্কোবাদী সমাজতন্ত্র বনাম মাওবাদী জনগণতন্ত্র নিয়ে। আদর্শবাদী অন্তর্লীন দ্বন্দ্ব ক্রমেই প্রকাশ্যে আসে সমাজতন্ত্রী ভুবনে প্রভাব প্রতিযোগিতায় এবং অন্যদিকে সীমান্ত সংঘাতের মহড়ায়। মার্ক্সবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণি মর্মাহত। ক্ষেত্র বিশেষে সংকীর্ণতা তাদেরও কাউকে কাউকে গ্রাস করে।

এ কথাও অস্বীকার করা কঠিন যে সমাজতন্ত্রী সোভিয়েত রাষ্ট্র গঠনে, পরবর্তী সমাজ গঠনে যেমন মূল নেতৃত্বে ছিল চিন্তার ভিন্নতা, তেমনি ছিল চীনেও অপ্রকাশ্যে—পরে প্রচ্ছন্ন ধারায়। সংগ্রাম চলাকালে যা থাকে সুপ্ত, ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তা ধীরে-সুস্থে হলেও অনুকূল বাতাসে বিকশিত হতে থাকে—সংগ্রামীদের মধ্য থেকে পরে প্রজন্মান্তরে তার প্রকাশ।

যেমন লেনিন বনাম প্লেখানভ, স্তালিন বনাম ট্রটস্কি কিংবা বুখাবিন, জিনোভিয়েভ প্রমুখ। এমনকি ক্রুশ্চেভ। তেমনি মাও এবং চৌ কি একই ধারায় ভাবতেন নীতি ও কৌশলের ক্ষেত্রে, সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে কিংবা চুতে ও লিউ শাও চি? রাষ্ট্রশক্তি ও সমাজশক্তি গঠনের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময় দেং জিয়াও পিং তো একেবারে ভিন্ন ডালের বাসিন্দা।

চীনা রাষ্ট্রকে আপন স্বাতন্ত্র্যে বিশ্বে শক্তিমান করে তুলতে হবে, প্রয়োজন হলে আদর্শবাদী সংস্কারে। সেখানে জাত্যভিমান (সোভিনিজম) নেপথ্যে কাজ করে তো করুক (এমন বিশ্বাস কি ছিল না রুশি বা চীনা ক্ষেত্রে?)। সর্বোপরি শক্তির উৎস যতটা জনগণ, বিশেষ স্থানকালে তা আসলে অর্থ ও অস্ত্র—অর্থশক্তিরই প্রাধান্য। প্রাক নব্বই পর্বে সোভিয়েত নেতৃত্ব যদি সমরাস্ত্র শক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে তো একই সময়ে চীন অপেক্ষাকৃত বেশি গুরুত্ব দিয়েছে অর্থশক্তিকে—‘বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী’ এমন ধারণাকে। তাই চীনে গড়ে উঠতে পেরেছে নেতৃতান্তরে কমিউনিস্ট শাসনে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকাশ, বিশ্ববাণিজ্যে প্রাধান্য ও শক্তির সঞ্চয়।

আরো একটি চীনা নীতি এই লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর—যথাসম্ভব রাষ্ট্রিক সংঘাত পরিহার, আদর্শিক সৌভ্রাতৃত্বের ক্ষেত্রে আপন রাষ্ট্রিক স্বার্থনির্ভরতা। নিজেকে যথাসম্ভব মুক্ত রাখা মূল লক্ষ্য অর্জনের স্বার্থে। সেই লক্ষ্য বিশ্বে প্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক শক্তি হয়ে ওঠা। তাতে যদি মৌল রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে আপস করতে হয় তাও সই। না-ই বা অর্জিত হলো মাও-চিন্তার নতুন মানুষ, আদর্শ মানুষ গড়ার লক্ষ্য। সেটা পরে বিবেচ্য।

চীনা বিদেশনীতি এমনই এক নিজস্ব ধারায় বিকশিত হওয়ার কারণে তার রাজনৈতিক আদর্শের মধ্যে আপসবাদী ধারা সঞ্চারিত হতে পেরেছে। যেকোনো মূল্যে অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক শক্তি অর্জন যদি প্রাধান্য পায়, তাহলে সেখানে সুবিধাবাদেরও অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে। ঘটেছেও। সংক্ষিপ্তভাবে বলতে হয়, তা না হলে চিরশত্রু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পিং পং কূটনীতি সম্ভব কিভাবে, তাও আবার পাকিস্তানি  দৌত্যে। শত্রুর শত্রু মিত্র—মতাদর্শ সেখানে বিবেচ্য নয়। তাই মার্কিন-চীনা মৈত্রী। ভিন্ন নিরিখে একদা ছিল ‘হিন্দি-চীনা ভাই ভাই’—সীমান্ত বিতর্কে যার মৃত্যু।

দুই.

সাম্রাজ্যবাদী ও কট্টর কমিউনিজমবিরোধী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনা কূটনীতির এই মৈত্রী উদারনৈতিক বিশ্বের জন্য পরম বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবু চলেছে পক্ষ বিশেষে যুক্তিতর্কের সাফাই। অন্য পক্ষে প্রশ্ন : একটি সমাজতন্ত্রী দেশ, যতই বিভ্রান্ত হোক একটি পুঁজিবাদী, আধিপত্যবাদী দেশের তুলনায় নিকৃষ্ট হতে পারে? নাকি গোটা বিষয়টিই বৈশ্বিক ক্ষমতা-প্রতিষ্ঠার লড়াই?

সমাজতন্ত্রী বিশ্বের ওই অবাঞ্ছিত বিভাজন, তবু তাদের বোধোদয় ঘটায়নি। চীন তার নিজস্ব পথ ধরেই চলেছে। এশিয়ায় তার সবচেয়ে বড় শত্রু ভারত, সীমান্তবিরোধ নিয়ে, পাকিস্তানের মতো ধর্মীয় রাজনীতির প্রতিক্রিয়াশীল দেশ তার সবচেয়ে বড় মিত্র। আসলে সিল্করুটসহ সীমান্ত স্বার্থ, বাণিজ্য স্বার্থের কাছে আদর্শের ভরাডুবি। সত্তরের দশকের পর থেকে এমন রাজনৈতিক পথ ধরেই চলেছে চীন তার অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রসার ঘটিয়ে। আদর্শিক দিক থেকে সমমনাদের লড়াইয়ে তার অংশগ্রহণ ছিল না—যেমন অন্যায় ইরাক-আগ্রাসন ইঙ্গ-মার্কিনদের, চীন সে ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ নীরব দর্শক। যেমন একালে সিরিয়া ইস্যু।

যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু চুপচাপ বসে থাকেনি বিশ্বমঞ্চে নীরব দর্শক হয়ে। সে তার আগ্রাসী নীতি—‘নতুন বিশ্ববিধান’ প্রতিষ্ঠার নীতি নিয়ে আঞ্চলিক যুদ্ধের আবহ তৈরি করে এগিয়ে চলেছে। নিকারাগুয়া থেকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশে দেশে চলে সিআইএর গোপন তৎপরতা এবং সেই সঙ্গে আফ্রো-এশিয়ায় সম্প্রসারণ আধিপত্যবাদী লড়াকু নীতি—ইরাক-পরবর্তী লিবিয়া-সিরিয়ায় বিদ্রোহী সমর্থনে, এর আগে যেমন চলেছে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত শক্তির বিতাড়নে, পাকিস্তানে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী তালেবান শক্তির উত্থান ও প্রতিষ্ঠায় গোপন ও প্রকাশ্য সহযোগিতায়। শেষোক্ত ক্ষেত্রে চীন তার সহযোগী সোভিয়েত-বিরোধিতায়।

এমন এক বিচিত্র রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবেশে ইঙ্গ-মার্কিন শক্তির নেপথ্য ও সক্রিয় সমর্থনে কট্টর ইসলামী মৌলবাদী শক্তির নিষ্ঠুর প্রকাশ ও বিকাশ এক বৈশ্বিক উপদ্রব হয়ে দাঁড়ায়। এবং তা মানবিক বিশ্বেরও বিরোধী। এ অশুভ শক্তি তার জঙ্গিবাদী নিষ্ঠুরতায় তুলনাহীন; বিশ্ব এমন উদাহরণ দেখেছে শুধু ফ্যাসিস্ট শক্তির নির্মম হত্যাকাণ্ডে।

রাজনীতির এ রক্তাক্ত ডামাডোলে পুঁজিবাদী রাশিয়া ধীরেসুস্থে আপন শক্তির বিকাশে, তার শিল্পোন্নত ও সামরিক শক্তির পুনরুত্থানে সচেষ্ট। অন্যদিকে চীন ব্যস্ত মূলত তার বাণিজ্যিক ভুবন বিস্তারে। এমন এক বৈশ্বিক রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে চীন-রাশিয়ার দ্বন্দ্ব ততটা প্রকাশ্যে নয়; উভয়ে নিজ নিজ পথে তাদের পরাশক্তির মর্যাদা অর্জনে ব্যস্ত।

একুশ শতকে চীনা নীতির সাফল্য তাদের বিশ্ববাজার দখলের প্রতিযোগিতায়। এর আগে মার্কিন রক্ষণশীল নীতিবাগিশরা দুর্বল রাশিয়াকে নয়, চীনকেই আবার প্রধান শত্রু বিবেচনা করে চলেছে, তবে সতর্ক পদক্ষেপে। তার তাত্ত্বিক প্রকাশ বিশ্ববিধান নীতিতে এবং ‘সভ্যতার সংঘাত’ বিচারে নতুন নতুন মিত্র দেশ তৈরির মাধ্যমে চীনকে ঘিরে রাখার নীতির প্রকাশ ঘটিয়ে।

এদিক থেকে একুশ শতকে তাদের সর্বশেষ সাফল্য ভারত ও মিয়ানমারকে রাজনৈতিকভাবে হাতের মুঠোয় এনে বিপর্যস্ত-বিধ্বস্ত পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে মাঝপথে দাঁড় করিয়ে রেখে। রাশিয়া এখন তার দুর্ভাবনা নয়, দুশ্চিন্তা চীনকে নিয়ে, চীনা পণ্যের বিশ্ববাজার দখল নিয়ে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিজয়ের রথযাত্রা অক্ষুণ্ন্ন রাখতে গিয়ে অর্থনৈতিক বিশ্বে ক্রমেই পিছু হটা ও সংকটের মোকাবেলা করতে গিয়ে ক্ষুব্ধ যুক্তরাষ্ট্র। এ ক্ষোভ যথারীতি চীনা সাফল্যের বিরুদ্ধে। চীন এখন বিশ্বে দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি, সম্ভাবনার হাতছানি, এদিক থেকে এক নম্বরে উত্তীর্ণ হওয়ার।

এ অবস্থা কি মানা যায় আধিপত্যবাদী যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে। কে চায় তার এক নম্বর অবস্থান হারাতে।

তিন.

এবার সত্যি সত্যি থলে থেকে বিড়াল বেরিয়ে এলো যুক্তরাষ্ট্রে নতুন এক রক্ষণশীল প্রেসিডেন্টের বিজয় উপলক্ষে। অপেক্ষাকৃত উদারনৈতিক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দুই দফা শাসনকালে বিষয়টি নরম পন্থায় বিবেচিত হচ্ছিল, কট্টর প্রশাসনিক আমলা ও বুদ্ধিজীবীদের একপাশে রেখে। আধা উন্মাদ ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশ্নবিদ্ধ বিজয় বিশ্বের সর্ব খাতে যেন এক অশুভ শক্তির ঘোষণা। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইসরায়েল-গাজা ভূখণ্ড পর্যন্ত। বাদ নেই বাকি বিশ্ব।

নিজ দলেও অপ্রিয় ট্রাম্পের রাজনীতি চলছে তাঁর মর্জিমাফিক। এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তাঁর মতভেদ ও মনোমালিন্য, ন্যাটো নিয়ে তাঁর ভিন্নমত, জলবায়ু সম্মেলন তাঁর পছন্দসই নয়, তাঁর চলা আপন মর্জিতে।

এর আগে বহু প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তের জনক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবার সত্যিই লাল তাস বের করলেন তাদের বাণিজ্য ঘাটতি পূরণের উপলক্ষ নিয়ে। গোটা বিশ্বে এখন সর্বাধিক আলোচিত বিষয় চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধ—উৎস মার্কিন প্রেসিডেন্টের একতরফা সিদ্ধান্ত। চীনা পণ্যের অভিযান ঠেকাতে, বিশেষ চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক (কর) আরোপ। সারা বিশ্বে অশুভ ঘণ্টাধ্বনি। চীন কি এ আঘাত মেনে নিতে পারে? পারেনি চীন, পারার কথাও নয়।

তাই তার একই রকম প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ, পাল্টা হুমকি বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার। মার্কিন পণ্যে কর আরোপ ছাড়া আর কী সে ব্যবস্থা তা স্পষ্ট করেনি চীন। এ নিয়ে চলছে আলোচনা বিশ্ব গণমাধ্যমে, সংবাদপত্রে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঘাটতির হিসাব-নিকাশে। আমরা অর্থনীতির সূক্ষ্ম কাটা-ছেঁড়ায় যাচ্ছি না। আমাদের আলোচ্য এর রাজনৈতিক তাৎপর্য, পরিপ্রেক্ষিত ও পরিণাম। কারণ অর্থনীতি তো রাজনীতিবহির্ভূত বিষয় নয়।

আমাদের প্রশ্ন : বাণিজ্য ঘাটতি তো রাতারাতি আকাশ থেকে নেমে আসেনি? ধীরেসুস্থেই ঘটেছে। সংঘাতহীন তথা শান্তিপূর্ণ প্রথাসিদ্ধ নিয়মে এর মোকাবেলায়ই তো কাম্য। নিজের ও অন্যের প্রয়োজন মেটাতে উত্পাদন বৃদ্ধি, নতুন বাজার সন্ধান, তুলনামূলক মুনাফা হ্রাস ইত্যাদি বিরোধহীন পদ্ধতির তো অভাব নেই, বাড়তি কর আরোপের বিপরীতে। কিন্তু ট্রাম্প শান্তির পথিক নন, তিনি উগ্রবাদী, ভিন্ন মেজাজের মানুষ। তাই প্রতিরোধ নয়, আক্রমণই তাঁর পক্ষে প্রতিরোধের সর্বোত্কৃষ্ট নীতি।

স্বভাবতই ব্যক্তিটি ট্রাম্প বলেই বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ নিয়ে। তাদের বক্তব্য এতে শুধু সংশ্লিষ্ট দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, এর প্রভাব পড়বে সর্বত্র, যা মোটেই কাম্য নয়। সর্বোপরি খোদ যুক্তরাষ্ট্রের সস্তা চীনা পণ্য ব্যবহারকারী ভোক্তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নয়, হবে আমদানিকারক কম্পানিগুলো, এমনকি চীনে রপ্তানিকারকরাও বর্ধিত চীনা কর আরোপের পরিপ্রেক্ষিতে। তারা কি ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত মেনে নেবে?

একই কথা ঘটে চীনের ক্ষেত্রেও। ট্রাম্প যত তপ্তমস্তিষ্কের মানুষ হোন না কেন, মূলত ব্যবসায়ী এ মানুষটি তো ব্যবসার ভালো-মন্দ বোঝেন; দ্বিতীয়ত বর্তমান চীনা প্রেসিডেন্ট ধীরস্থির চিন্তার মানুষ, তিনি বুঝেশুনে হিসাব-নিকাশ করেই চাল দেবেন। এই খানেই ভরসা উদ্বিগ্ন বিশ্বের। বিশ্লেষকরা এমন ভরসায়ই আছেন যে আলোচনার টেবিলে বসে যেন বিষয়টির মীমাংসা হয়—উগ্র চালে ও তেমন পাল্টা-চালে নয়। এমন প্রত্যাশা বিশ্বের সব শুভশক্তির।

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

 



মন্তব্য